একুশে আগস্ট। গ্রেনেড হামলার ১১তম বার্ষিকী আজ। ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট বিকালে রাজধানীর ২৩, বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের ঘটনা। দলের সভাপতি, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। ভয়াবহ এ হামলায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে প্রাণে রক্ষা পেলেও মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী নিহত হন।

দলের কেন্দ্রীয়, মহানগর, থানা ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মী, সাংবাদিকসহ আহত হন শতাধিকেরও বেশি। এদের মধ্যে পঙ্গুত্ববরণ করেন অনেকে। এখনও অনেক নেতাকর্মী সেদিনের সেই গ্রেনেডের স্প্লিন্টার শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন। ঘটনার পর পরই অনেক নেতাকর্মীকে দেশ-বিদেশে চিকিৎসা করালেও তারা এখনও পর্যন্ত পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন নি। গ্রেনেড হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বিভিন্ন সময়ে তদন্তে বেরিয়ে আসে নিষিদ্ধ সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি) নৃশংসভাবে একুশে আগস্ট এ হত্যাযজ্ঞ চালায়। ধারণা করা হচ্ছে হামলাকারীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাসহ পুরো আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা। গ্রেনেড হামলা চালানো হলেও অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান শেখ হাসিনা। দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগরের নেতারা মানবঢাল তৈরি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজেরা গ্রেনেডে ক্ষতবিক্ষত হয়ে তাদের প্রিয় নেত্রীকে রক্ষা করেন।

তবে এক কানের শ্রবণশক্তি হারান তিনি। সে সময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সরকার ক্ষমতায় ছিল। আওয়ামী লীগের তরফে অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগকে পুরোপুরিভাবে নিশ্চিহ্ন করতেই এ ভয়াল গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। হত্যাযজ্ঞে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শীর্ষপর্যায়ের গোপন ইন্ধন ছিল।

কিন্তু সে সময় জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হয়। ঘটনার পর মামলা করা হলেও দীর্ঘদিন তদন্ত ও মামলার কার্যক্রমের গতি ছিল স্লথ। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে তদন্তকাজ শুরু হয়। ২০০৮ সালের ১১ই জুন আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। তবে ওই তদন্তে গ্রেনেডের উৎস ও হামলার পরিকল্পনার নেপথ্যে কারা জড়িত, তা উদ্ঘাটন করা যায়নি।

পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলাটি পুনঃতদন্ত করা হয়। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দকে নিয়োগ করা হয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। ২০১১ সালের ২রা জুলাই তিনি আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সম্পূরক অভিযোগপত্রে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এ ছাড়া জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরীসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। এতে মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২। এরপর ২০১২ সালের ১৯শে মার্চ দুটি মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। বর্তমানে ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর আদালতে চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচারকাজ চলছে। এখন পর্যন্ত সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে মামলাটি। মোট ৪৯১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৭৬ (২০ আগস্ট পর্যন্ত) জনের সাক্ষ্য নেয়া হলেও এখনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষ্যগ্রহণ বাকি রয়েছে। এরপর নেয়া হবে আসামিদের সাফাই সাক্ষ্য। উভয় পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য দিন ধার্য করবেন বিচারক।

প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী: ২১শে আগস্ট উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২১শে আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট তার বাণীতে বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে ২১শে আগস্ট একটি কালো দিবস।

তিনি বলেন, অগণতান্ত্রিক শক্তি গণতন্ত্রকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ওপর প্রথম আঘাত আসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এদিন স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকচক্রের হাতে অকালে জীবন দিতে হয়েছে স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের। এরপরও ঘাতকচক্র থেমে থাকেনি উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট বলেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসভা চলাকালীন ঘাতকরা ইতিহাসের বর্বরতম গ্রেনেড হামলা চালায়।

তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বহীন করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে রুখে দিয়ে দেশে জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ তা হতে দেয়নি এবং ভবিষ্যতেও দেবে না। প্রেসিডেন্ট বলেন, গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতার পাশাপাশি পরমতসহিষ্ণুতা অপরিহার্য। আমার দৃঢ়বিশ্বাস ও প্রত্যাশা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে সব রাজনৈতিক দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গণতন্ত্রকামী জনগণ একটি আত্মমর্যাদাশীল ও সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে ২১শে আগস্টের শোককে শক্তিতে পরিণত করে একটি শান্তিপূর্ণ নিরাপদ স্বদেশ ও সন্ত্রাসমুক্ত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ অব্যাহত রাখতে দেশের সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, শান্তি ও উন্নয়নের ধারাকে স্তব্ধ করে দেয়া। হত্যা, ষড়যন্ত্র, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও দুঃশাসনকে চিরস্থায়ী করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করা। বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করা। তিনি বলেন, এ ধরনের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।

কিন্তু তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার হত্যাকারীদের রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। অনেক আলামত ধ্বংস করে। তদন্তের নামে এই নারকীয় ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, ২১শে আগস্টের হামলাকারী, পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা এবং তাদের মদতদাতাদের সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দেশ থেকে হত্যা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের চির অবসান হবে। আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। বাণীতে প্রধানমন্ত্রী ২১শে আগস্টের সব শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে তাদের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা এবং আহতদের গভীর সমবেদনা জানান।

একুশে আগস্টের স্মরণে কর্মসূচি: প্রতিবারের মতো এবারও আওয়ামী লীগ দিবসটি স্মরণে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আজ একুশে আগস্ট বিকাল সাড়ে ৪টায় ২৩, বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে স্থাপিত অস্থায়ী শহীদ বেদীতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করবেন, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে অংশ নেবেন। এ সময় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠনের নেতারাও একই কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।

এরপর একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত শহীদ পরিবারের সদস্যরা ও আহতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পালন করার জন্য আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডসহ সব শাখার নেতাদের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ করে দিবসটি স্মরণ ও পালন করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এদিকে গ্রেনেড হামলায় আহতদের সংগঠন একুশে আগস্ট বাংলাদেশও দিনটিকে সামনে রেখে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

এএইচ