স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ যখন পুনর্গঠন নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখন এখানে আত্মপ্রকাশ ঘটে বিচ্ছিন্নতাবাদি ‘শান্তি বাহিনী’র।

দেশের এক দশমাংশের পার্বত্য জনপদকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে ১৯৭৩ সালে এ সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)।

সরকারের বিরুদ্ধে শুরু করে সশস্ত্র বিদ্রোহ। বেপরোয়া খুন, গুম, অপহরণ, চাঁদাবাজির শিকার হয় নিরীহ পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠি। এ সশস্ত্র বাহিনীর হামলায় নির্মমভাবে নিহত হয় ১৫ হাজারেরও বেশি নিরীহ বাঙালি। এর মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয় দেড় শতাধিক। এছাড়া আড়াই শতাধিক নিহত হয় উপজাতি।

প্রায় দু’যুগের সংঘাত শেষে পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সম্পাদিত হয় ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’। যদিও এ চুক্তিতে বাঙালি জনগোষ্ঠির প্রতি ব্যাপক বৈষম্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

চুক্তির প্রধানতম দিক ছিল অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ ও বিচ্ছিন্নতাবাদি শান্তিবাহিনীর সকল কার্যক্রম বিলুপ্ত করা। ১৮ বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হয়েছে চুক্তির আশি ভাগ শর্ত। বাকিগুলোও বাস্তবায়নের পথে। এরই মধ্যে পাহাড়ে উল্লেখযোগ্যভাবে হয়েছে ভৌত অবকাঠামোসহ যোগাযোগ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। চুক্তি পরবর্তী মন্ত্রীসহ আঞ্চলিক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছে উপজাতিদের বিচ্ছিন্নতাবাদি নেতৃবৃন্দ।

আঞ্চলিক পরিষদের স্থায়ী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জেএসএস চেয়ারম্যান সন্তু লারমা। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে ভোগ করছেন সরকারি সুযোগ সুবিধা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চুক্তি পরবর্তী বিচ্ছিন্নতাবাদি গোষ্ঠি এ সরকারি সুযোগ সুবিধায় থেকে এবার গোপনে নতুন নতুন কৌশলে চালিয়ে যাচ্ছে প্রপাগান্ডা। বজায় রাখছেন আন্তর্জাতিক কুচক্রি মহলের সঙ্গে যোগাযোগ।

অপরাধ, অপপ্রচার ও বাঙালি বিদ্বেষ ছড়ানোর মাধ্যমে ক্রমেই সংগঠিত হচ্ছে তারা। পাহাড়কে অস্থিতিশীল করতে পূর্বের ন্যায় আবারও শুরু করেছে খুন, গুম, অপহরণ, চাঁদাবাজি। এমনকি সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার সদস্যদের টার্গেট করে হামলা চালানো হচ্ছে। গত বছরের মার্চ মাসে খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের ওপর হামলা করে সন্ত্রাসীরা।

একই এলাকায় এর আগের বছর জুন মাসে এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া বিভিন্ন সময় নিরাপত্তা বাহিনীর কর্তব্যরত সদস্যদের ওপর আশঙ্কাজনক হামলা হয়েছে। পাশাপাশি দিনদিন মজুদ গড়ে তোলা হচ্ছে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের, যা ক্রমেই উদ্বিগ্ন করছে আইনশৃঙ্খলা

বাহিনীকে। এ অবস্থায় পাহাড়ে অবিলম্বে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেনা ক্যাম্প স্থাপনের জোরালো দাবি উঠেছে। পাশাপাশি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা উপজাতি ব্যক্তিবর্গের কার্যক্রম নজরদারির গুরুত্ব উঠে এসেছে।

সম্প্রতি পলাতক সেনা কর্মকর্তা উদ্ভাস চাকমার গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদি শান্তিবাহিনীর কার্যক্রম এখনও বিদ্যামান থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। উদ্ভাস বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০১৫ সালের ১২মে সিলেট সেনানিবাস থেকে মিজোরামে পালিয়ে যান।

পলায়ন পরবর্তী সময়ে দুর্গম পাহাড়ে উপজাতি সন্ত্রাসী দলগুলোকে তিনি সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতেন বলে জানা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বাঘাইহাটি এলাকায় অপারেশন করে পালিয়ে যেতেন তিনি।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি পৃথক রাষ্ট্রের মত করে নিয়ন্ত্রণ করছে বিচ্ছিন্নতাবাদি শক্তি। আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস ও ইউপিডিএফের ১০ হাজারের বেশি সন্ত্রাসী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তিন পার্বত্য জেলা।

এসব বিচ্ছিন্নতাবাদিদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। এরা সবাই নিজ নিজ সংগঠনের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারি। একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে যেরূপ পদ-পদবি রয়েছে এই সংগঠন দুটোর কর্মকর্তা-কর্মচারিদেরও তেমনি পদ-পদবি রয়েছে।

তাদের বেতন স্কেলও রয়েছে। প্রত্যেকের রয়েছে ঝুঁকি ভাতা। শুধু পাহাড়ি সন্ত্রাসীরাই নয়, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে আগত কিছু সন্ত্রাসীও জেএসএস ও ইউপিডিএফের হয়ে কাজ করছে।

সম্প্রতি ঢাকার গুলশানে ঘটে যাওয়া জঙ্গি হামলার ঘটনায় অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশের বিষয়টি সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও মনে করছেন, জঙ্গিরা পাহাড়ের সন্ত্রাসী দলগুলো থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করছে এবং অস্ত্র পাচারের জন্য এ দুর্গম এলাকাকে ট্রানিজট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, উপজাতিদের বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলো উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভিন্ন প্রাণঘাতি অপরাধ সংগঠিত করছে এবং এর দায়ভার চাপিয়ে দিচ্ছে বাঙালি জনগোষ্ঠি ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর।

সরকারকে বিব্রত করতে চালাচ্ছে নানা অপপ্রচার। পাহাড়ের ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বাঙালি ও বাংলাদেশ বিদ্বেষ। নষ্ট করা হচ্ছে বহুদিনের চলে আসা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এছাড়া বাঙালি জনগোষ্ঠিকে পাহাড় ছাড়া করতে অব্যাহত রেখেছে নির্যাতন-নিপীড়ন।

সন্ত্রাসীদের তথাকথিত ‘জুম্মু রাষ্ট্র’ গঠন করার তৎপরতায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন অপকৌশল। এর মধ্যে রয়েছে গুম, খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, মুক্তিপণ আদায়, সশস্ত্র ডাকাতি, চাঁদাবাজি, বাঙালি বিদ্বেষি কর্মকান্ডের বিস্তার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের বিরোধিতা ইত্যাদি।

এছাড়াও পার্বত্য অঞ্চলের নিরবিচ্ছিন উন্নয়ন ও শান্তি শৃঙ্খলায় নিয়োজিত থাকা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও পাহাড়ে এর ভূমিকাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা, বিদেশি গণমাধ্যম ও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের দিয়ে পাহাড়ের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভুয়া প্রতিবেদন করানোর কাজে লিপ্ত রয়েছে তারা।

মাহমুদ