নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবীতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও পরবর্তীতে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন গুলোতে বিএনপি অংশগ্রহণ করে আসছে। সে ধারাবাহিকতায় আসন্ন পৌর নির্বাচনেও বিএনপির অংশগ্রহণ করা নিয়ে কোন জল্পনা-কল্পনা থাকার কথা নয়।

তবে এই প্রথম দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিয়ে শুরুতে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা ছিল। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিএনপি দীর্ঘ ৭ বছর পর ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এবার ভোটযুদ্ধে নামছে। তবে আসন্ন নির্বাচনে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি কী অর্জন করতে পারবে সেই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিএনপির সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এখনো দলটির শীর্ষ সারির বেশ কয়েকজন নেতা বিভিন্ন মামলায় কারাগারে আটক রয়েছেন। মামলার হুলিয়া নিয়ে আত্মগোপনে আছেন কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূলের কয়েক হাজার নেতাকর্মী। এছাড়াও সম্প্রতি নতুন করে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিএনপিসহ বিরোধী জোটের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রায় ১০ মাস আগে দল পুনর্গঠনে হাত দিলেও এখনো তার সিঁকিভাগও শেষ হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে অনেকটা হঠাৎ করেই ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ি সম্পূর্ণ বৈরি পরিবেশেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি।

দেশের সার্বিক রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি কী অর্জন করতে পারবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির অন্যতম পরামর্শদাতা ও শুভানুধ্যায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ টাইমনিউজবিডিকে বলেন, দেশের রাজনৈতিক আকাশ দুর্যোগে ঘনঘটা। সব কিছু মিলিয়ে বললে, এই নির্বাচনে অংশ নেয়ায় বিএনপির ক্ষতির চেয়ে লাভের পাল্লাই ভারি হবে।

প্রথমত, নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত হলে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী অধিকাংশ এলাকায় জয়ী হবে।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সক্রিয় হবেন। তৃণমূল পর্যায়েও সংগঠন শক্তিশালী হবে।

তৃতীয়ত, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে বিএনপি সমর্থকদের ওপর পুলিশি হয়রানি এবং গণগ্রেফতারও অনেকটা কমে আসতে পারে বলে মনে করছেন এই রাস্ট্রবিজ্ঞানী।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ তথা সরকার যদি এই নির্বাচনকে প্রভাবিত করে এবং গায়ের জোরে ফল নিজেদের পক্ষে নেয়, তাহলে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। এতে আবারও প্রমাণিত হবে এই সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন কখনই সম্ভব নয়।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে বিএনপির সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। এছাড়াও পৌর নির্বাচনে কারচুপি হলে কিংবা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের মতো পুলিশি প্রহরায় কেন্দ্র দখল করে সরকারদলীয় প্রার্থীদের জেতানো হলে বিদেশিদের কাছেও ফের নেতিবাচক বার্তা যাবে।

আসন্ন পৌর নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে যাচ্ছি আমরা। সারা দেশে নৌকা ও ধানের শীষের এ লড়াইকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবকিছুই করা হবে।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে কোনো ধরণের অনিয়ম বা কারচুপির আশ্রয় নিয়ে ইসি যদি ক্ষমতাসীনদের মনোনীত প্রার্থীদের বিজয়ী করার চেষ্ঠা করে, তাহলে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তৃণমূল থেকেই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

অন্যদিকে পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণকে বিএনপির চলমান গণতন্ত্র পুনোরুদ্ধারের আন্দোলনের অংশ বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রোববার (৬ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে।’

তবে দলীয় একটি সুত্রের দাবী, তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রাণচাঞ্চল্য করতে পৌর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি এবার তাদের সব চেয়ে বড় হাতিয়ার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য পৌরসভা নির্বাচনে গণসংযোগে নামতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া।

নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, খালেদা জিয়া নির্বাচনী মাঠে নামলে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। মামলা-হামলার কারণে যেসব নেতাকর্মী এলাকাছাড়া, তারা নির্বাচনী মাঠে ফিরে আসার সাহস পাবেন। তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের মাঝে চাঙ্গাভাব ফিরে আসবে।

কারণ নির্বাচনী আচরণবিধিতে খালেদা জিয়ার প্রচার চালানোর ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তিনি এই সুযোগটি কাজে লাগাবেন। যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে সম্ভব হবে না। তাই খালেদা জিয়া ভোটের মাঠে নামলে সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে।

অন্যদিকে বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবী, ৩০ ডিসেম্বর দেশে প্রথমবারের মত অনুষ্ঠিতব্য দলীয় প্রতীকে পৌরসভা নির্বাচনকে বিএনপি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।

এ লক্ষে সুপরিকল্পিতভাবে কাজও শুরু করেছে দলটি। বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশে নির্বাচনে জিততে সব কৌশল প্রয়োগ করবে দলটি।

এই সূত্রটি আরও জানিয়েছে, তবে নির্বাচনে ভোট ডাকাতির আশঙ্কাও করছে দলটির। আর নির্বাচন শুরুর আগেই পরিকল্পিতভাবে দলটির অর্ধশতাধিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়াকে একদলীয় ও একপেশে নির্বাচন হওয়ার পূর্বলক্ষণ বলে মনে করছে বিএনপি।

তাই পৌরসভা নির্বাচনেও যদি ক্ষমতাসীনরা গত উপজেলা নির্বাচন ও সিটি নির্বাচনের মতো একদলীয় নির্বাচন করে দলীয় প্রার্থীদেরকে জয়ী করে তাহলে সরকারের সব অনিয়মকে পুঁজি করে ফের আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনাও করছে বিএনপি।

আর এজন্য পৌর নির্বাচনের অনিয়ম ও ৫ জানুয়ারি সরকারের দুই বছর পুর্তিতে নতুন করে রাজপথে নামার ছক করছে দলটি। টার্গেট করা এই আন্দোলনে সফলতার মুখ দেখতে ইতিমধ্যে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া কাজও শুরু করেছেন বলে জানিয়েছে গুলশান কার্যালয়ের একটি সূত্র।

এমএইচ/এমকে