কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল পরিমান অর্থ হ্যাকড এই মুহুত্বে বাংলাদেশের সবচাইতে আলোচিত ঘটনা। ব্যাংকিং সেক্টরে সারা পৃথিবীতে এটাই সম্ভাবত সবচাইতে বড় হ্যাকিং। যা বাংলাদেশের মতো একটি দেশকে স্বাভাবিক ভাবেই মারাত্মক অর্থনৈতিক ঝুকিতে ফেলবে বলে মনে করছেন দেশী-বিদেশী বিশ্লেষকরা। 

পৃথিবীর বিখ্যাত বাটপারদের জুয়ার আসর ফিলিপাইনে আজ গড়াগড়ি খাচ্ছে বাংলাদেশের গণমানুষের রক্ত ঘামে অর্জিত কোটি কোটি টাকা। বিদেশীরা যখন ৮০৮ কোটি টাকা নিয়ে ফূর্তি করছে তখন আমরা উদ্ধার নিয়ে অপরাজনীতি করছি; দোষারোপ করছি একে অপরকে। পদত্যাগ করে দায়িত্ব আড়াল করার চেষ্টা করছি।
এ দৃশ্য আজ জাতির অংশ হিসেবে যখন অবলোকন করি তখন নিজেদের স্থির রাখার অবিরাম প্রচেষ্টা অস্ফুট আর্তনাদে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। যাদের কাছে রক্ষকের দায়িত্ব দিয়েছিলাম আজ তাদের দিকে তাকাতে গেলে গেলে একটি কুৎসিত ও বীভৎস চেহারা দেখতে পায়। এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দিশেহারা আমরা।
অন্যদিকে নিরাপত্তা ইস্যুতে অষ্ট্রেলিয়ার পর এবার ঢাকা থেকে যুক্তরাজ্যগামী সরাসরি ফ্লাইটগুলোতে কার্গো পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ব্রিটিশ পরিবহন দফতর। একই সাথে অতিদ্রুত নিরাপত্তা ব্যাবস্থা সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে যাত্রী বহনকারী বিমানও বন্ধ করে দেয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছে দেশটি।
সম্প্রতি চলমান হ্যাকড হওয়া অর্থ ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা হুমকির ঘটনা দু'টি অবশ্যই বাংলাদেশের জাতীয় প্রেক্ষাপটে অশুভ ইঙ্গিত বহন করছে। আর এ প্রেক্ষিতে পর্যালোচনার টেবিলে বসে হ্যাকিংয়ের এ ঘটনাকে দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা বলে উল্লেখ করছেন অর্থনীতি বিশারদরা।
কারন দেশের বেসরকারী সেক্টরের ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে চারশ কোটি টাকা সিকিউরিটি জামানত হিসেবে গচ্ছিত রাখে তা দেশের মানুষের জমানো সঞ্চিত অর্থ। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থার কাছ থেকে বিনা সুদে নেয়া ধারের টাকাও এর মধ্যে অর্ন্তভূক্ত। আর এই অর্থই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের একাউন্টে জমা রেখেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
যা ৪ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার, দিবাগত রাত প্রায় সাড়ে ১২টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফটের বার্তা বা সংকেত ব্যবহার করে ৩৫টি অর্থ স্থানান্তরের পরামর্শ বা অ্যাডভাইস পাঠানো হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে। ব্যাংলাদেশ ব্যাংকে সুইফট পদ্ধতি ব্যাবহারের ব্যাক অফিসে কর্মরত আট কর্মকর্তা ৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবারও কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য এসেছিলেন। ওই কার্যালয়ে এসে তাঁরা কম্পিউটার খুলতে পারেননি। কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত প্রিন্টারগুলোও অকেজো দেখতে পান। কিন্তু তাঁরা ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে এই ‘বিপদ সংকেতটি’ পৌঁছাননি। আর এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়ে চলে যায় শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে। এরপর ফিলিপাইনের ‘দ্য ডেইলি ইনকোয়ারার’ পত্রিকায় গত ২৯ ফেব্রুয়ারী এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় অঠে।
ঘটনার দায় কাধে নিয়ে গত ১৫ মার্চ বেলা সোয়া ১১ টায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের পর পরই পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। যাকে সাধুবাদ জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের মতো একটি নিন্ম মধ্যম আয়ের দেশে এতবড় অর্থ কেলেঙ্কারীর ঘটনা যখন অপূরনীয় ক্ষতি সাধন করবে বলে মনে করেছেন সংশ্লিষ্ঠ বিশেষজ্ঞরা ঠিক সেই মূহুত্বে অর্থমন্ত্রীর ‘সব ঠিক হয়ে গেছে মন্তব্য জাতির কাছে বোধগম্য মনে হয় না। তাহলে কি গভর্নরের পদত্যাগের সাথে সাথেই হ্যাকড হওয়া আটশো আট কোটি ডলার ফিরে এসেছে? এ প্রশ্ন উত্তর অর্থমন্ত্রী কি দিতে পারবে?
বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, অর্থ হাকডের এ ঘটনা বিদেশী চক্রের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যান্তরীন উচ্চপদস্থ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যাক্তির যোগসাজশে হতে পারে।
এছাড়া আরোও উল্লেখ করা হয় এই বিপুল পরিমান অর্থ পাচারে সরকারের দুই মেরু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রনালয় একে অপরকে দোষারোপ করে পাচার কারী গোষ্ঠীকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে ইতিমধ্যেই সাবেক গভর্নর ফরাস উদ্দিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। নতুন করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফজলে কবির। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। ১৮ মার্চ দেশে ফিরলে জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে তাকে নিয়োগ দেয়া হবে। এছাড়া অন্তর্বর্তী গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ব্যাংকের ডেপূর্টি গভর্নর আবুল কাশেমকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত টীম গঠন করেছে সরকার। এছাড়া র্েযাবের এ্যাডিশনাল ডিআইজি কর্ণেল জিয়াউদ্দিন আহসানের নেতৃত্ব আরো একটি তদন্ত দল কাজ করছে। কিন্তু কোন তদন্ত কমিটিই এখন পর্যন্ত জড়িত সন্দেহে দেশীয় কোন সংশ্লিষ্টতা খুজেঁ পায়নি। অথচ দেশী চোর ছাড়াই এত বিপুল পরিমান অর্থ বিদেশী চোররা নিয়ে চলে গেল এটি একটি নির্বোধ ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।
এমন একটি যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক আর একটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। হ্যাকড'র এ ঘটনা তদন্তে সরকারের পাশাপাশি নিয়োগ দেয়া হয়েছে ভারতীয় নাগরিক সাইবার বিশেষজ্ঞ রাকেশ আস্তানা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ফায়ারআইকে। আর এই নির্দেশনা গত ৭ মার্চ সদ্য বিদায়ী গভর্নর আতিউর রহমান একটি অফিস আদেশ জারি করেন। যেখানে উল্লেখ করা হয় রাাকেশ আস্তানার মৌখিক নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সকল বিভাগ, ইউনিটে ও সার্ভারসমূহে তার সরবরাহকৃত সফটওয়্যার (সিকিউরিটি প্যাচ) ইনস্টল করা হোক।
আর এ আদেশের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান বাংলাদেশের খ্যাতিমান অর্থনীতি বিশারদরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন ওনার (রাকেশ আস্তানা) মৌখিক পরামর্শে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সকল পিসিতে ও সার্ভারে সফটওয়্যার বসানো হয়েছে। ভিনদেশি একজন নাগরিকের কাছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দেশের আর্থিক খাতের সকল নিরাপত্তা তুলে দেওয়া হচ্ছে। এটা দেশের আর্থিক খাতের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।’
এদিকে সরকারী ভাষ্য অনুযায়ী ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবমতে, নিউইয়র্কের রিজার্ভ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির চেষ্টা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৮৫ কোটি ডলার ঠেকানো গেছে। তবে হদিস মিলছে না চুরির সিংহভাগ অর্থের।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি সুইফট ম্যাসেজিং সিস্টেম হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের একাউন্ট থেকে হ্যাকডের মাধ্যমে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার প্রসেস হয়ে ফিলিপাইন ও শ্রীলংকায় চলে যায়। এর মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের একটি ব্যাংকে সরিয়ে ফেলা হয়।
সামগ্রিকভাবে সংশ্লিষ্ঠ ব্যক্তিরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি নিরাপত্তার ঘাটতির কারণেই রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা ঘটেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলম নিজেও এই অদক্ষতার কথা সাংবাদিকদের বলেছেন। (দৈনিক যুগান্তর, ১৪ মার্চ ২০১৬)
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা যেমন বিষয়টি সময়মতো জানাননি, তেমনি বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ লুকিয়ে রেখেছে সরকারের প্রায় সব পক্ষের কাছ থেকেই। অর্থমন্ত্রীকে জানানো হয়নি, জানতেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরাও। ফলে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় মুখোমুখি অবস্থানে। শুদ্ধ ভাষায় দুই সরকারের যুদ্ধ।
হ্যাকিংয়ের ঘটনায় যখন কাঁদছে গোটা দেশ সেই মূহুত্বে সংবাদ এল বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ৪,১৫১ কোটি টাকা।
এছাড়া দীর্ঘদিন লাভে থাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সময়ে নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২,৬২২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৪-১৫ এর বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির শ্লথগতি ও ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে এমনটি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বিপুল অর্থ লোকসানের খবর এমন সময় প্রকাশ হলো যখন নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কোটি ডলারের বেশি অর্থ লোপাটের ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে।
ফরেক্স রিজার্ভ হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিদেশি মুদ্রার অবমূল্যায়নের ফলে বেচাকেনা থেকে লোকসান হয়েছে ৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা। বিদেশি মুদ্রার অবমূল্যায়নের ফলে অর্থবছর শেষে লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। স্বর্ণ ও রৌপ্যের পুনর্মূল্যায়নের ফলে লোকসান হয়েছে যথাক্রমে ৪৮২ কোটি ও ৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ফলে রিজার্ভ থেকে লোকসান দাঁড়িয়েছে মোট ৪,১৫১ কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, মুদ্রার অবমূল্যায়নে এমনটি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে ডলারের দাম তো সেভাবে কমেনি। বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন অনেক হয়ে গেছে, অর্থনীতিও বড় হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের অফিস সময়ে ট্রেড করে তো ভালো কিছু করা যাবে না। সপ্তাহের সাতদিনই ২৪ ঘণ্টা ফরেক্স ট্রেড খোলা থাকা উচিত। এজন্য পৃথক প্রশিক্ষিত জনবলও থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে যে ধরনের ব্যাবস্থাপনা চলছে, তা দিয়ে তো ভালো কিছু আশা করা যায় না। ফলে লোকসান হবেই। তবে বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতেই হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট মুনাফা হয় ৫৯৮ কোটি টাকা। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে ৫৩০ কোটি, ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে ৬৩৪ কোটি, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে ৭৭০ কোটি, ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে ৭৮৬ কোটি ও ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে ৭৯৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়। ২০০০-০১ অর্থবছরে ৭১৫ কোটি, ২০০১-০২ অর্থবছরে ৯৪৯ কোটি, ২০০২-০৩ অর্থবছরে ৭৬০ কোটি, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ৯৩৯ কোটি, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১,৮৯১ কোটি, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৪০৪ কোটি, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ৩,৪৬০ কোটি, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৩,১৫২ কোটি, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ২, ৫০৫ কোটি, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১,২৮৭ কোটি, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৮,৮৪২ কোটি, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৭,০৩১ কোটি, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩০৪ কোটি, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩, ৩৫১ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়।
তবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে নিট লোকসান দাঁড়ায় ২,৬২২ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নিট মুনাফা হিসাব করা হয় রিজার্ভের মুনাফা বা লোকসান ধরে। তবে চূড়ান্ত হিসাবে রিজার্ভের হিসাব থাকে না। ফলে সরকারকে মুনাফা ও কর্মকর্তাদের বোনাস দেয়া সম্ভব হয়। চূড়ান্ত হিসাবে রিজার্ভের হিসাব থাকলে মুনাফা বা বোনাস দেয়া সম্ভব হতো না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে ফরেক্স ট্রেড হয় শুধু অফিস সময়ে। এ সময় পৃথিবীর বড় অর্থনীতির দেশগুলোয় ট্রেড বন্ধ থাকে। ফলে লোকসান আরো বেড়েছে।
ওই কর্মকর্তারা জানান, ২৪ ঘণ্টা ট্রেডিং চালু থাকলে রিজার্ভে হ্যাকিংয়ের ঘটনাও রোধ করা যেত। কারণ বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক থেকে আসা অ্যালার্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানতে পেরেছে রবিবার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন অবশ্য বলেছেন, যখন রিজার্ভ থেকে ভালো মুনাফা হয়েছিল, তখন তো ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার বিষয়টি আসেনি। কর্মকর্তাদের দক্ষতা নিয়েও কোনো প্রশ্ন নেই। বিশ্বব্যাপী সুদের হার কমছে, অনেক দেশে মাইনাসও হয়ে গেছে। স্বর্ণের দামও কমছে, বিনিয়োগে থাকা অন্যান্য মুদ্রার মানও কমছে। ফলে রিজার্ভ থেকে লোকসান হয়েছে। তবে বিশ্বের সঙ্গে সময় মিলিয়ে ফরেক্স ট্রেড অফিস সময়ের বাইরেও চালু থাকা প্রয়োজন।
হ্যাকিং এর ঘটনায় যখন শোকে আচ্ছন্ন গোটা দেশ সেই মুহুত্বে ঘোষনা এল যুক্তরাজ্য তাদের দেশে বাংলাদেশের পণ্যবাহী কার্গো বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর ফলে যুক্তরাজ্যের বাজারে পণ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে জানিয়েছেন দেশী তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান। গত ১০ মার্চ জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এমন শঙ্কার কথা জানান তিনি।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, যুক্তরাজ্য আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার। এ বাজারে কোন রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়–ক তা কাম্য নয়। যখনই আমরা নতুন নতুন বাজারে অনুপ্রবেশ করছি, তখনই একটি তৈরি হওয়া বাজার পেছনের দিকে হাটবে তা কখনই কাম্য নয়।
তবে এর মধ্যেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যাবস্থা পর্যবেক্ষন করে গেছে ব্রিটিশ প্রতিনিধি দল। যার প্রেক্ষিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার ইস্যুতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে বদলির পরদিনই বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও সরিয়ে দেওয়া হলো।
এদিকে নিজের দেশের বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দিতে ব্যার্থ হয়ে একটি ব্রিটিশ কোম্পানিকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়ার ব্যাপারে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যা দেশের নিরাপত্তা ব্যাবস্থাকে আরো বেশী হুমকির মূখে ফেলছে বলে মনে করেন সুশীল সমাজের বোদ্ধারা।
তাছাড়া রাজনৈতিক সংঘাত, হানাহানি, বিভক্তি, দুর্বল অর্থনীতি প্রভৃতি অভ্যন্তরীণ সমস্যা বাংলাদেশকে অনেকবেশী নিরাপত্তাহীন করে তুলছে। আর এগুলো থেকে মুক্ত হওয়ার একটাই পথ গনতন্ত্রের পথে হেটে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। কারন একটি অগনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যাবস্থা কখনই দেশের মানুষের জন্য কল্যান সাধন করতে পারেনা।
লাল সবুজের পতাকা যেমন ছিনিয়ে এনেছিল এদেশের সূর্য্য সন্তানেরা ঠিক তেমনি ২৫ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা এদেশের পতাকার নিরাপত্তা বিধান করা সরকারসহ প্রতিটি নাগরিকের একান্ত কর্তব্য।
পরিসমাপ্তি দেওয়ার আগে একটি কথা উল্লেখ করতে হবে, ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ান বোনার্পোট মিশর আক্রমন করতে আসার পিছনে তার কারন হিসেবে বর্ননা করেছিলেন এভাবে, আমি মিশরের সিনাই পর্বতের উপর দাড়িয়ে সমগ্র মধ্যপাচ্যকে দেখতে চাই। অর্থাৎ মিশর এমন একটি রাষ্ট্র যার চতুর্দিকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের অবস্থান। সুতরাং ভৌগলিক ও পারিপাশ্বিক কারনে মিশরের ক্ষমতা গ্রহন করা ছিল নেপোলিয়ানের সুপরিকল্পিত মিশন।
ঠিক তেমনি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে নিরাপত্তার অযুহাতে কেউ যেন গ্রাস করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। একই সাথে এই বিপুল পরিমান অর্থ হ্যাকিংয়ে দেশী বিদেশী চক্র যেই জড়িত থাক তাদেরকে আইনের আতায় নিয়ে এসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।