জ্ঞান অর্জন ছিল তার আজীবনের সাধনা। সরকারি চাকরি ও গবেষক থেকে রাষ্ট্রপতির গুরুদায়িত্বের সময়ও পড়াশোনার এক অনন্য জগতে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিলেন তিনি। অবসর জীবনেও থামেনি জ্ঞানচর্চা। সময় সুযোগ পেলেই যোগ দিতেন সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠানে। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতেন আগ্রহীদের মাঝে। জীবনের একেবারে শেষ মুহূর্তেও তার ব্যত্যয় ঘটল না।

সোমবার সন্ধ্যায় শিলংয়ে এক সেমিনারে বক্তব্য দিতে দিতেই মঞ্চে ঢলে পড়লেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হলো এই মহান জ্ঞানসাধকের। সোমবার এভাবেই হঠাৎ পুরো ভারতকে শোকস্তব্ধ করে দিয়ে বিদায় নিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও খ্যাতিমান বিজ্ঞানী এপিজে আবদুল কালাম (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

নৌকার মাঝি ও পত্রিকার হকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা আবদুল কালাম হয়ে উঠেছিলেন ভারতের পরমাণু সক্ষমতার এক স্বপ্নপুরুষ। পেয়েছিলেন ভারতের 'মিসাইলম্যান' খ্যাতি। দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এ ব্যক্তিত্বের প্রয়াণে সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে ভারত। এ খবরে বাংলাদেশসহ পুরো উপমহাদেশেই নেমে আসে শোকের ছায়া।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, বিশ্ব মহান এক পরমাণু বিজ্ঞানীকে হারাল। বিশ্ববাসী তার অবদানের কথা চিরদিন স্মরণ রাখবে। রাষ্ট্রপতি তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এ ছাড়া তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ।

অকৃতদার বিজ্ঞানী এপিজে আবদুল কালাম একাধিকবার বাংলাদেশ সফর করেন। সর্বশেষ গত বছর এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকায় আসেন তিনি। সেখানে তরুণদের উজ্জীবিত করতে এ জ্ঞানসাধক বলেন, 'সবগুলো স্বপ্ন অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত থামা যাবে না।' বলেছিলেন 'স্বপ্নকে হতে হবে বিশাল। জীবনে ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ একটি অপরাধ।' ভারতের মেঘালয় প্রদেশের রাজধানী শিলংয়ে গতকাল ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের এক সেমিনারে বক্তব্য দিচ্ছিলেন আবদুল কালাম। কথা বলার সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বুকের বাঁদিকে তীব্র যন্ত্রণা অনুভূত হলে মঞ্চেই পড়ে যান আবদুল কালাম। সঙ্গে সঙ্গে তাকে শহরের বেথানি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাত ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। হাসপাতালে নেওয়ার পর রাজ্য সরকার তার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছিল। সেনাবাহিনীও তাদের একটি মেডিকেল টিম হাসপাতালে প্রেরণ করে। তবে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বিশিষ্ট এই বিজ্ঞানী।

হাসপাতালের পরিচালক জন সাইলো রাইটাথিয়াং বলেন, 'সন্ধ্যায় একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। অবশ্য এর মধ্যেই মারা যান তিনি। আমরা ধারণা করছি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে তার।' গতকালই দিল্লি থেকে শিলং যান তিনি।

এপিজে (আবুল পাকির জয়নুল আবেদিন) আবদুল কালাম ১৫ অক্টোবর ১৯৩১ সালে তামিলনাড়ূর রামেশ্বারামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তিনিই ভারতে প্রথম পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ করেন। আবদুল কালাম গরিব পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং খুব অল্প বয়সেই তাকে জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। তবে প্রচণ্ড মেধাবী আবদুল কালাম সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যান। ছাত্রজীবনে তার পড়ার বিষয় ছিল অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং। চল্লিশ বছর ধরে তিনি ভারতের বিভিন্ন বিজ্ঞান ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ডিআরডিও) এবং ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনে (আইএসআরও) কর্তব্যরত অবস্থায় তিনি মহাকাশ গবেষণা ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে অবদান রাখেন। ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও তার উৎক্ষেপণযান তৈরিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ভারতের 'মিসাইলম্যান' হিসেবে খ্যাতি পান। ১৯৯৮ সালে ভারতের প্রথম সফল পরমাণু বোমার পরীক্ষা পোখরান-২-এর তিনি ছিলেন মুখ্য ব্যক্তি।

তিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব 'ভারতরত্নে' ভূষিত হন। এতই জনপ্রিয় ছিলেন যে, তাকে দ্বিতীয়বারের জন্য রাষ্ট্রপতি করার জোর দাবিও উঠেছিল। কিন্তু তিনি সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। কর্মে যেমন, জীবনযাপনেও ছিলেন অনুকরণীয়। রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রথম পা দিয়েই তিনি শিশুর মতো বলেছিলেন, এত বড় বাড়ি নিয়ে আমি কী করব? রাষ্ট্রপতি থাকার সময় তিনি গোটা রাষ্ট্রপতি ভবন সেখানকার সমস্ত কর্মচারীর সন্তানদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তারা সেখানে মনের আনন্দে খেলে বেড়াত। কেউ যেন তাদের না বকে সেদিকেও নজর রাখতেন আবদুল কালাম। রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ও পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত এসরাজ বাজাতেন তিনি। বৌদ্ধদর্শন চর্চা ছিল তার আরেক আগ্রহের বিষয়।

কেএইচ