পাকিস্তান দিবসে ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া সর্বত্র বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে কার্যত ওই দিন থেকেই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটে। ঢাকা শহরে থইথই মানুষের হাতে হাতে শোভা পায় বাংলাদেশের পতাকা। লাল-সবুজের মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত এই পতাকায় মুক্তিকামী প্রতিটি মানুষের মনে আগুন ধরে যায়। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতিও সম্পন্ন হতে থাকে। অসহযোগ আন্দোলনের এ পর্যায়ে এসে দেশের সর্বস্তরের পেশাজীবী-কর্মজীবী মানুষ ও সংগঠন বঙ্গবন্ধুর দেয়া কর্মসূচি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। এতদিন যারা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন, তারাও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও সমর্থন ব্যক্ত করতে শুরু করে।
একাত্তরের ২৪ মার্চ সমগ্র বাংলাদেশ একটি বিস্ফোরণোন্মুখ গ্রেনেডের মতো উত্তপ্ত অবস্থায় এসে দাঁড়ায়। পাকবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য কারও যেন তর সইছিল না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্বিচারে গুলি, আন্দোলনরত বাঙালির ওপর নির্যাতন, চরম দুর্ব্যবহার ও পাকিস্তানের পক্ষে অনুষ্ঠান প্রচারের চাপের ফলে ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্রের সর্বস্তরের বাঙালি শিল্পী-কলাকুশলী কাজ বর্জন করে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। টিভির বাঙালি শিল্পী-কলাকুশলীদের বর্জনের ফলে আজকের দিনের সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকা টিভির সম্প্রচারও বন্ধ হয়ে যায়।
পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের সদর দফতর যশোরে বাঙালি অফিসাররা সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করেন। রাইফেলসের জওয়ানরা ‘জয় বাংলা-বাংলার জয়’- গান গাইতে গাইতে ফ্ল্যাগস্ট্যান্ডে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন এবং তারা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার প্রতি পূর্ণ সামরিক কায়দায় গার্ড অব অনার জানিয়ে ফ্ল্যাগ স্যালুট করেন। ভোলা এবং বগুড়ায়ও রাইফেলসের জওয়ানরা নিজ নিজ ছাউনিতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
এদিন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন, সংবাদপত্র হকার্স ইউনিয়ন, ইপিআইডিসি, খাদ্য পরিদর্শক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্পৃক্ততা ব্যক্ত করে বলেন, চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত তারা আর কেউই নিজ নিজ অফিসে ফিরে যাবেন না। দেশকে শত্র“মুক্ত করেই কেবল তারা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে কর্মস্থলে যোগদান করবেন।
দেশের বিভিন্ন স্থানের রাইফেলস ব্যাটালিয়নে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের খবর দ্রুত পৌঁছে যায় সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে। নরঘাতক ইয়াহিয়া প্রতিশোধ আগুনে জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে গোপনে দেশের প্রতিটি সামরিক ছাউনিতে নির্দেশ পাঠায় যে, আর সময় দেয়া যাবে না। সুযোগ বুঝে বাঙালি নিধন কর্মসূচি ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। ক্রুদ্ধ ইয়াহিয়া-টিক্কারা গোপন বৈঠক করে প্রতিটি ক্যান্টনমেন্টেও অপারেশন শুরু করার নির্দেশ জারি করে। গোপনে তারা যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকে দেশ বিরোধী চক্রের কিছু নেতার সঙ্গে।
এরই মধ্যে এ চক্রটি রাজাকার-আলবদর বাহিনী গঠনের প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি দেশজুড়ে প্রচারণা চালাতে থাকে যে, ভারতীয় হিন্দুবাদীরা ষড়যন্ত্র করে মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করতেই পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুশমনি শুরু করেছে। আর আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব ওই ষড়যন্ত্রের হোতা হিসেবে দেশবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছে।
এদিন বঙ্গবন্ধুর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টাদের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন। প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক শেষে তাজউদ্দীন আহমদ প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে তারা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে অবিলম্বে সংসদ অধিবেশন ডেকে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন।
এআইজে





