উদ্ভিদ তথা বনভূমি হচ্ছে পৃথিবীর প্রাণ। পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে হলে পৃথিবীর বনভূমি রক্ষা করা ছাড়া কোনো গতি নেই। এ সত্যকে সামনে রেখে প্রতি বছর ২১ মার্চ সারা পৃথিবীতে পালিত হয় ‘বিশ্ব বন দিবস।’

একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য সঠিক ভাবে বজায় রাখতে হলে ৩০ শতাংশ বনভূমি থাকা আবশ্যক। অথচ সারা পৃথিবীর মানুষ আজ বিভিন্ন ভাবে বনভূমি ধ্বংসের যজ্ঞে মেতেছে।

পথিবীতে প্রতিবছর গড়ে প্রায় এক শতাংশ ক্রান্তীয় বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে মানুষের হাতে। বিগত ৭০ বছরে পৃথিবীর মোট ক্রান্তীয় বনভূমির প্রায় ৫০ শতাংশ উজাড় হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে অপসৃত বনভূমির যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে তা বিশ্লেষণ করে বলা হচ্ছে যে, প্রতি বছর পৃথিবী থেকে পৌনে দুই কোটি থেকে দুই কোটি হেক্টর বনভূমি মানুষের ‘লোভ নামের’ প্রয়োজনের বলী হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে চিরতরে। এর ফলে শুধু বনভূমিই নয়, এর সাথে বনে বসবাসকারী হাজার হাজার প্রজাতীর কোটি কোটি জীব-জন্তুর জীবন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। আবাসস্থল হারিয়ে এদের অনেকেই ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

পৃথিবী ব্যাপী এই সর্বগ্রাসী বনভূমী ধ্বংসের প্রক্রিয়া প্রতিরোধে বিশ্ববাসিকে এক চেতনায় আনতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টন ১৯৭১ সালে তার ২৩ তম সাধারণ সভায় ২১ মার্চ কে বিশ্ব বন দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তখন থেকে প্রতি বছর ২১ মার্চ সারা পৃথিবীতে বিশ্ব বন দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ঘোষণায় বন সৃজন ও রক্ষার্থে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও সারা পৃথিবীতে উজাড় হয়েছে ২০টি বাংলাদেশের সমান আয়তনের বনভূমি। জলবায়ু এবং পরিবেশগত পরিবর্তন এবং এর প্রভাবে বিশ্বের নানান দেশ আজ সমস্যা সংকুল। পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে সুনামি, প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় এবং ভূমিকম্পের মতো নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ সমস্যার প্রধান কারণ বৃক্ষরাজি এবং বনভূমির পরিমাণ কমে যাওয়া। কারণ বৃক্ষ ছাড়া জলবায়ু এবং পরিবেশ বিপর্যয় রোধ সম্ভব নয়।

জাতিসংঘ পৃথিবীর ন্যূনতম প্রয়োজনে যে বনজসম্পদ জরুরি তা সৃজন ও রক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন রোধে এবং বিশ্বকে সঠিকভাবে বাস যোগ্য করে তুলতে বনের গুরত্ব সম্পর্কে UN Secretary-General Ban Ki-moon বলেন, "To build a sustainable, climate-resilient future for all, we must invest in our world's forests. That will take political commitment at the highest levels, smart policies, effective law enforcement, innovative partnerships and funding."

মানুষ বেঁচে থাকার প্রয়োজনে নষ্ট করে পরিবেশ ও প্রকৃতিকে। পরিবেশ বিপর্যয়গত সমস্যা বাড়তে বাড়তে তা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তখন সমস্যা সমগ্র রাষ্ট্রকেই গ্রাস করে ফেলে। এর বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। একটি দেশের জন্য বন বা বনভূমি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রত্যেকটি দেশে অন্ততঃ ২৫ ভাগ ভূমি বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন।

পরিবেশ রক্ষায় এ বনভূমি অত্যন্ত প্রয়োজন। সাথে সাথে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব ব্যাপক। সবুজ বনবনানী আর পাখপাখালির দেশ আমাদের বাংলাদেশ। নগরায়ণের ফলে আজ বনবনানী, গাছপালা কমে যাচ্ছে। ফলে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটছে। দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। পঞ্চাশের দশকেও এ অঞ্চলে শতকরা ২৪ ভাগ বনভূমির অস্থিত্ব ছিল। কিন্তু ক্রমেই মানুষ বনভূমি ধ্বংস করে কঠিন মৃত্তিকার দেশে পরিণত করছে সুজলা-সুফলা এ বাংলাকে। বর্ধিত ফসল উৎপাদন, জনবসতির সমপ্রসারণ, নগরায়ন, শিল্প-কারখানার বিকাশসহ নানাবিধ কারণেই বনভূমি কেটে ফেলা হচ্ছে। উজাড় হচ্ছে বৃক্ষরাজি।

সরকারী হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে সব মিলিয়ে শতকরা ১৬ ভাগ বনভূমি। কিন্তু বাস্তবে এর পরিমাণ অনেক কম। যা আমাদের জন্য অত্যান্ত্য অপর্য়াপ্ত। সংরক্ষণের অভাবে ঘন অরণ্যও আজ বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তন এবং গ্রিনহাউস এফেক্টের কারণে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিসত্মীর্ণ এলাকা তলিয়ে যেতে পারে। ঘটতে পারে নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রয়োজনের তুলনায় ন্যূনতম আকারের এই বনভূমিও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে আজ ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন।

বন দিবসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, দেশের প্রতিটি নাগরীক কে উদ্বুদ্ধ করা, যেন প্রত্যেকে নিজ দায়িত্ব হিসেবে বনভূমি ধ্বংসে প্রতিবাদি হয়, এবং প্রত্যেকে সাধ্যামত বৃক্ষ রোপণে সক্রিয় হয়।

একই ভাবে বন আইনানুযায়ী একটি গাছ কাটতে হলে তার বিপরীতে ১০টি গাছ লাগাতে হবে এবং প্রাকৃতিক ভাবে জন্ম নেওয়া গাছের পরিচর্যা করতে হবে, এই আইন যথাযথ ভাবে পালিত হচ্ছে কি-না তা দায়িত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা, এবং আইনের ব্যত্যয় ঘটলে তার প্রতিকারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

তবে বাস্তব অবস্থা অত্যন্ত হতাসা ব্যাঞ্জক, যা শুধু প্রতিনিয়ত আমাদের ধ্বংসের কিনারায় ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃত চিত্র হ’ল গত দুই যুগে সারা পৃথিবীতে যে পরিমাণ বৃক্ষ নিধন করা হয়েছে রোপণ করা হয়েছে তার মাত্র এক শতাংশ!

বর্তমান বিশ্বে বিপুল শিল্পায়নের ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বন নিঃসরণের পরিমান ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রয়োজন পৃথিবী ব্যাপী ব্যাপক বনায়ন। অথচ তা না হয়ে বরং ব্যাপক ভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে বনভূমি। ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বৃদ্ধি পাচ্ছে আবহাওয়ার তাপমাত্রা। এর ফলে একদিকে যেমন সৃষ্টি হচ্ছে ঝড়-জলোচ্ছাস, অন্যদিকে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে বাড়ছে সমুদ্রের পানির উচ্চতা, যার ফলে উপকূলীয় অঞ্চল পানিতে ডুবে গিয়ে সৃষ্ট করছে জলবায়ু বিপর্যয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জলবায়ু বিপর্যয়ে সবচেয়ে বিপর্যস্ত দেশগুলির মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। তো বাংলাদেশের বনভূমির বাস্তব চিত্র কি ?

প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকতে প্রয়োজন বাংলাদেশের মোট আয়োতনের ৩০ শতাংশ বনভূমি, কিন্তু বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ মাত্র ৭ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রধান বনভূমি সুন্দরবন দেশের মোট বনভূমির ৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া আছে চট্টগ্রামের পাহাড়ী বনাঞ্চল এবং মধুপুর ও দিনাজপুরের শাল বন সহ কিছু বনাঞ্চল, যা সবই সরকারী বন বিভাগের নিয়ন্ত্রনাধীন।

দেশের মানুষের বেতন ভুক্ত বন বিভাগের এ সকল কর্মচারী, যাদের এই বনভূমি পাহারা দেওয়ার জন্য রাখা হয়েছে, তারাই আজ দেশের বনভূমির প্রধান শত্রু। তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে উজাড় হচ্ছে পাহাড়ের বনভূমি, মধুপুর-দিনাজপুরের শালবন এবং ভুবন বিখ্যাত সুন্দরবন! সুন্দরবন বিভাগের একমাত্র কাজ হ’ল বনভূমি পাহারা দেওয়া। তারা কোনো প্রকার গবেষণা, এমনকি উদ্ভিদ ও জীব-জন্তুর রোগ-বালাই’র চিকিৎসাও করে না। এ সকল কাজের জন্য তাদের কোনো ব্যবস্থাপনা নেই।

একমাত্র বৃক্ষ ও বন্যপ্রাণী পাহারা দেওয়াই তাদের চাকুরী। অথচ পাহারার নামে হাজার হাজার গাছ কেটে বন বিভাগের গনি মিয়ারা বেচে দিচ্ছে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে, যা এখনও চলছে। অন্যদিকে, এর ফলে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে বনের প্রাণীরাও, যাদেরকে হত্যা করে বিক্রি করা হচ্ছে। যার প্রমাণ, গত কয়েক মাসে বিপুল পরিমাণ বাঘের চামড়া ধরা পড়েছে, সাথে হরিনের চামড়াও! বনভুমি উজাড় করার ফলে সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতীর বিপুল সংখ্যক প্রাণী আজ বিলুপ্তির হুমকির মুখে, যার মধ্যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বা বাঘ, ইলশা হাঙ্গর, ইরাবতি ডলফিন, লবন পানির কুমি, মায়া হরিণ, সজারু, মেছো বাঘ, বন বিড়াল, বাঘডাস, ভোদড়, লাল মাছরাঙ্গা, মাস্কড্ ফিনফুটার, কালো গুই সাপ, জলপাই কচ্ছোপ, পিট ভাইপার, অজগর, সঙ্খচূড় সাপ, কালনাগিনী, মদনটাক, শুশুক, ধুষর মাথা মেছোচিল, নোনা বন সুমচা, খয়রি মাছরাঙা অন্যতম।

এ অবস্থায় বিশ্ব বন দিবসে আমাদের সিদ্ধান্ত হোক – বাংলাদেশের বনভূমি এবং বন্যপ্রাণীদের রক্ষা করতে হলে এখনই প্রয়োজন দেশে বিদ্যমান ক্ষয়িষ্ণু প্রাকৃতিক বনভূমির কোন কোন নির্দিষ্ট অংশকে জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বন ইত্যাদি নাম দিয়ে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা-বলয় তৈরি করে তথাকথিত বন বিভাগের পরিবর্তন করে একটি পরিশুদ্ধ বন বিভাগ গড়ে তোলা।

আর এ ব্যাপারে সরকার এবং সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয়সহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানকে জরুরী ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া অতি জরুরী।

এবং বৃক্ষ ও বন্যপ্রাণী হত্যা এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা, অন্যথায় বাংলাদেশের বনভূমি তথা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা আদৌ সম্ভব হবে না।

 

এআই