রাজধানী ঢাকা, নারায়নগঞ্জ এবং চট্টগ্রামসহ সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজে বাধা সৃষ্টি করছে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তরা। দুদকের অনুসন্ধানী কার্যক্রম মারাত্মক ভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান দুদক কর্মকর্তারা।
সোনালী ব্যাংকের  এ ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত শতাধিক প্রতিষ্ঠানের  সংরক্ষিত নথিপত্র  চেয়ে বার বার চিঠি দেয়া সত্বেও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সরবরাহ করছে না ওই সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
দুদকের কাছে অভিযোগ রয়েছে সোনালী ব্যাংকের শাখাগুলো হচ্ছে; ঢাকায় লোকাল অফিস,বৈদেশিক বাণিজ্য কর্পোরেট শাখা,বঙ্গবন্ধু এভিনিউ কর্পোরেট শাখা, হোটেল রুপসী বাংলা (শেরাটন) কর্পোরেট শাখা,আগারগাঁও শাখা,গুলশান শাখা, নারায়ণগঞ্জ কর্পোরেট শাখা, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখা ও লালদীঘি কর্পোরেট শাখা থেকে প্রায় ৭  হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি হয়েছে।
দুদকের তদন্ত ও অনুসন্ধানী টিমের একাধিক কর্মকর্তা টাইমনিউজবিডি'কে জানান, বহুল আলোচিত সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক,পারটেক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতির ঘটনা তদন্তকালে আরও শতাধিক প্রতিষ্ঠানের  জালিয়াতি ও বিদেশে অর্থপাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন দুদক।
দুদকের উপ-পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর স্বাক্ষরিত  চিঠিতে গত বছর ২ ডিসেম্বর সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক ঢাকা,চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের ৫টি শাখা থেকে  ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় নথি সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু সোনালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে দুদকের পাঠানো ওই চিঠির আলোকে কোনো নথিপত্র পাঠানো হয়নি। এমনকি অফিসিয়াল ভাবে সোনালী ব্যাংক থেকে দুদকের সঙ্গে যোগাযোগ পর্যন্ত করা হয়নি।
পরে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দুদকের অনুসন্ধানী টিমের পক্ষ থেকে মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর স্বাক্ষরিত দ্বিতীয় দফা নথিপত্র চেয়ে সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সোনালী ব্যাংক এবারও কোনো ধরনের সাড়া দিচ্ছে না বলে জানায় দুদক কর্মকর্তারা।  
দুদকের  পৃথক নোটিশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকায় মতিঝিল সোনালী ব্যাংক লোকাল অফিসের গ্রাহক ‘অল টেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লি: কেএনএস ইন্ডাস্ট্রিজ লি:,ক্যাংসান ইন্ডাস্ট্রিজ লি:,থারমেক্স  টেক্সটাইল, ইকো কটন মিল্স, রহিমা ফুড কর্পোরেশন, এপেক্স উইভিং এন্ড ফিনিশিং মিল্স লি:, পদ্মা পলিকটন নীট ফেব্রিক্স লি:,কেএসএস নীট কম্পোজিট লি:,পিলুসীড টেক্সটাইল লি: প্রতিষ্ঠানের নামে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ঋণের আবেদন, ঋণ প্রদান,ব্যাংক কর্মকর্তাদের  সুপারিশ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন, অডিট রিপোর্ট,আমদানি, রফতানি সংক্রান্ত নথিপত্র সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।
নোটিশে ঢাকার মতিঝিলে সোনালী ব্যাংক বৈদেশিক বানিজ্য কর্পোরেট শাখার গ্রাহক; মের্সাস বেরিল এপারেল্স লি: এবং মের্সাস ইউসুফ এন্ড কোম্পানীর ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত  ওই ব্যাংকের ঋণ উত্তোলন,এলসি, আমদানি ও রফতানি সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের পরিদর্শন রিপোর্টসহ যাবতীয় নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।
নোটিশে নারায়নগঞ্জ সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখার গ্রাহক; মের্সাস রুপসী গ্রুপের প্রতিষ্ঠান- রুপসী নীট ওয়্যার লি:, রুপসী ফেব্রিক্স লি:, রুপসী এমব্রয়ডারী, রুপসী ডিজাইন এন্ড প্রিন্টিংস ও  মের্সাস সালমান নীট কম্পোজিট লি: এর নামে ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ঋণ উত্তোলন,এলসি,আমদানি,রফতানি, অডিট রিপোর্ট, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের পরিদর্শন রিপোর্টসহ যাবতীয় নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।
নোটিশে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখার গ্রাহক;ইমাম ট্রেডার্স,জামমির ভেজিটেবল ওয়েল লি:,একে এন্টারপ্রাইজ, মহিউদ্দিন কর্পোরেশন, কামাল এন্টারপ্রাইজ এবং অর্কিড ফ্যাশনের নামে ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত   সোনালী ওই শাখায় ঋণের আবেদন, ঋণ উত্তোলন,এলসি, আমদানি, রফতানি সংক্রান্ত বিষয়ে অডিট রিপোর্ট, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের পরিদর্শন রিপোর্টসহ যাবতীয় নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের লালদীঘি সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখার গ্রাহক; মের্সাস সিদ্দিক ট্রেডার্স, মের্সাস বেঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিজ লি:,এভারেস্ট প্রাইভেট লি:,ইউরো এ্যাপারেলস লি:,এ্যাপারেল ফেয়ার লি:,মুক্তা এ্যাপারেলস লি:,লিবরা ফ্যাশন ওয়্যার লি:,বিউমন্ড গার্মেন্টস লি:,হোসেন এ্যাপারেলস লি:, মের্সাস একমি টেক্সটাইল এন্ড গার্মেন্টস লি: ইমন এ্যাপারেলস লি:, মডেল এ্যাপারেলস লি: ইউনাইটেড ফ্যাশন লি:,ডিউড্রপস এ্যাপারেলস লি:, রোজেন্ট গার্মেন্টস লি:,কোব এ্যাসোসিয়েটস লি:,এমাইকো ফেব্রিক্স লি:,তন্নী নীট ওয়্যার লি:, মৌসুমী টাওয়েল লি:এর নামে ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের ওই শাখায় ঋণের আবেদন, বন্ধকী জমি,ঋণ উত্তোলন, এলসি,অপিট রিপোর্ট, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের পরিদর্শন রিপোর্টসহ যাবতীয় নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।
এদিকে দুদক কর্মর্তারা জানান,ইতোমধ্যে দুদকের এ টিমের সদস্যরা হলমার্ক গ্রুপের সোনালী ব্যাংক হোটেল রুপসী বাংলা শাখা ও পারটেক্স গ্রুপের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ শাখা থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি সংক্রান্ত পর্যাপ্ত নথিপত্র জব্ধ করেছে ।
দুদকের উপপরিচালক বেনজির আহমেদের নেতৃত্বাধীন অপর দলের সদস্যরা সোনালী ব্যাংক আগারগাঁ ও গুলশান শাখার ১৪১ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ঘটনায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র জব্ধ করে  এ বিষয়টি তিনি অনুসন্ধানী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
দুদক কর্মকর্তরা আরও জানান তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানেই সোনালী ব্যাংকের ঢাকার লোকাল অফিসে  ১৬'শ কোটি টাকা, বৈদেশিক বাণিজ্য করপোরেট শাখায় ১০০ কোটি টাকা, চট্টগ্রামের লালদিঘি করপোরেট শাখায় ৯০ কোটি টাকা, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ করপোরেট শাখায় ৩০০ কোটি টাকা এবং নারায়ণগঞ্জ করপোরেট শাখায় ৩৫০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে।
ঢাকা,একে, ১০ মার্চ (টাইমনিউজবিড.কম)// এসআর