সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কজনকে দেখা গেলো একমনে পেন্সিল চালাচ্ছেন। সামনের টুলে বেশ ভাবসাব নিয়ে একজন বসে আছেন। আর তার পাশে ভীড় করে আছে উৎসাহী লোকজন।
কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো। যিনি পেন্সিল চালাচ্ছেন তিনি একজন স্কেচ আর্টিস্ট। এরা ছবিওয়ালা বা আর্টিস্ট নামেই পরিচিত। আর সামনের জন সাবজেক্ট। অর্থাৎ, তার ছবিই আঁকা হচ্ছে। আর বাকিরা কেবলই উৎসাহী জনগন।
মাত্র ১০ মিনিটে ছবি থেকে ছবি প্রিন্ট করা হয় এরকম বিজ্ঞাপন হরহামেশাই স্টুডিওগুলোর দেয়ালে ঝোলানো থাকে। কিন্তু মাত্র ১০ মিনিটে একেবারে স্কেচ! অসম্ভব মনে হলেও এই পথশিল্পীরা সেটাকে সম্ভব করেছেন। ক্ষেত্র বিশেষে সময় বেশিও লাগে। বড়জোর ৩০ মিনিটেই তৈরী হয়ে যায় হুবুহু প্রতিচ্ছবি।
শুধুমাত্র কয়েক ধরনের পেন্সিল ব্যবহার করেই স্কেচ করে থাকেন শিল্পী। রাস্তার পাশেই দুটি টুল সম্বল করে এই জীবিকার রুপায়ন চলছে। যাদের পসরা একটু বেশি তারা চেয়ারের ব্যবস্থাও করেছেন। আর যারা এ পেশায় একেবারেই নতুন তাদের দেখা যাচ্ছে ঘুরে ঘুরে মার্কেটিংয়ে ব্যস্ত থাকতে।
সকাল হতেই আর্টপেপার, মাউন্ট বোর্ড আর পেন্সিল হাতে চলে আসেন এ উদ্যানে। নেই কোন মায়াবী পরিবেশ, নেই কোন ধোঁয়াটে আবহ। জনবহুল রুক্ষ ধুলিময় পথেই চলছে শিল্পের বাহার।
বেশ কয়েকজন শিল্পীর সাথে কথা হলো। তারা জানালেন, তাদের কোন প্রফেশনাল ডিগ্রী নেই। শুধুমাত্র প্রকৃতিপ্রদত্ত প্রতিভাকে সম্বল বানিয়ে রুটিরুজির তাগিদে বেরিয়েছেন। এতে সংসার চলে কি না জিজ্ঞেস করতেই একজন শিল্পী হেসে উত্তর দিলেন, “চলেনা এটা ঠিক, তবে মনে শান্তি পাই। হালাল রুজিতে আছি। আর কাজটায় ভালোলাগে। আমাদের ডিগ্রী না থাকলেও শিল্পীসত্তাতো আছে।”
আর কোথাও এরকম পেশাজীবিদের দেখতে না পাওয়ার কারন হিসেবে জানালেন, পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা, বাংলা একাডেমী হওয়াতে এখানে মোটামুটি শিক্ষিত ও সমঝদার লোকেরা আসেন। তাই ব্যবসা ভালো হয়। যদিও শিল্পীদের কোন সাবজেক্টকেই তেমন সমঝদার মনে হলোনা।
স্কেচ আকাঁর দরদাম বিষয়ে জানতে চাইলাম। ছবির ধরন অনুযায়ী দরদাম উঠানামা করে। যেমন একক বা দ্বৈত। অনেকে গ্রুপছবিও স্কেচ করান। একক স্কেচের চাহিদাই বেশি। মোবাইল ফোন থেকেও দেখে দেখে স্কেচ করা হয়। সেটার দাম কিছুটা কম। মোবাইল দেখে স্কেচে বেশিরভাগ বাচ্চাদের ছবিই করান লোকে। আবার সময়বিশেষেও দামের হেরফের হয়।
যেমন এখন একক স্কেচ ৩০০টাকা করে করছেন। দরদাম করে ২০০ পর্যন্ত আসে। ভ্যালেনটাইন ডে তে দাম আরো বাড়ে। তবে অন্যান্য সময়ে কিছুটা কমেই কাজ করে থাকেন।
আরেক শিল্পী বলেন, মাঝে মাঝে ৫০টাকায়ও স্কেচ করতে হয়। যখন উদ্যান খাঁ খাঁ করে, লোকজন পাওয়া যায়না। শিল্পীরা জানান, ফেব্রুয়ারি মাসে আয় ভালো হয়। এ সময় বই মেলা হওয়াতে প্রতিদিনই প্রচুর দর্শনার্থী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসেন। তাই কাস্টোমার ভালো পাওয়া যায়।
বছরের অন্যান্য কিছু দিবসেও একটু বাড়তি আয় হয়। তবে এমনও দিন যায় যেদিন কোন লোকই পাওয়া যায়না। সেদিন কি করেন জানতে চাইলে বললেন ‘কি আর করবো, বসে বসে প্রকৃতির ছবিই একে যাই।”
কেবি





