আজ ২ মার্চ। ঐতিহাসিক পতাকা উত্তোলন দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় পতাকা উত্তোলনের মধ্যদিয়েই স্বাধীনতা অর্জনের পথে যাত্রা শুরু হয়েছিলো বাঙালি জাতির।

২ মার্চ সকাল থেকেই দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ ঢাকার রাজপথে অবস্থান নেয়। জনসমুদ্র হয়ে ওঠে রাজপথ। আর সব মিছিলের একটিই লক্ষ্য-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখানেই বেলা ১১টায় ডাকসুর তত্কালীন সহ-সভাপতি আ স ম আবদুর রব সংগ্রামী ছাত্রসমাজের পক্ষে প্রথম বাংলাদেশের মানচিত্রসহ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা (গাঢ় সবুজ জমিনের মাঝখানে লাল বৃত্তে অঙ্কিত বংলাদেশের মানচিত্র) উত্তোলন করেন।

ঐ দিন স্বাধীন বাংলাদেশের যে পতাকা উত্তোলন করা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের ৯ মাস এই পতাকাই বিবেচিত হয়েছে আমাদের জাতীয় পতাকা হিসেবে।

লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই পতাকা। সেকারণে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিবসের মতো এই দিনটির গুরুত্বও কিন্তু একেবারে কম নয়। কুমিল্লার আয়ুর্বেদ চিকিৎসক, সতীশচন্দ্র দাশের পুত্র, গীতশ্রী চৌধুরী স্বামী ও অর্ণব আদিত্য দাশের পিতা শিবনারায়ণ দাশ মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার প্রথম ডিজাইনার। তিনিও একজন ছাত্রনেতা ছিলেন।

১৯৭০ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হলের ৪০১ নং (উত্তর) কক্ষে রাত এগারটার পর পুরো পতাকার ডিজাইন সম্পন্ন করেন। এ পতাকাই পরবর্তীতে ১৯৭১ এর ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় উত্তোলিত হয়।

ইতিহাসটা বেশ পেছনের। ১৯৬৯ সাল। ঢাকা সেনানিবাসের ১৪ পদাতিক বাহিনীর সদর দফতরে স্থাপিত ট্রাইবুনালে তখন বিচার চলছিল তথাকথিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার’ আসামিদের। ’৬৯-এর চলমান ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানি সামরিকচক্র যখন বুঝতে পারল এই মিথ্যা প্রহসনের মামলা আর চালিয়ে যেতে পারবে না, তখনই তারা সামরিক ব্যারাকে বন্দি সার্জেন্ট জহুরুল হককে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। অজুহাত তিনি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সেদিন ছিল ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। ইতোমধ্যে ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের তোড়ে ভেস্তে যায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পাতানো বিচারের খেলা। এরপর বাংলার সংগ্রামী জনতা তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছিনিয়ে আনে কারাগার থেকে। পাকিস্তানি সেনা প্রশাসনের এ পরাজয়ের পটভূমিতে ক্ষমতার হাত-বদল হলো আর একবার।

১৯৬৯ এর ২৫ মার্চ আইয়ুব খানের স্থলাভিষিক্ত হলেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। জারি করলেন ফের মার্শাল ল’। সকল রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ হলো। এরপর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ১১ দফা আন্দোলনের মাধ্যমে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করে। ১৯৬৯-এর শেষের দিকে ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। তদনুযায়ী ’৭০-এর জানুয়ারি থেকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন ৭ জুন। ঐ দিন রেসকোর্স ময়দানে প্রথম নির্বাচনী সভার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্ত হয় ঐ দিন পল্টন ময়দানে (রেসকোর্সে সভার আগে) কুচকাওয়াজের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর হাত থেকে বাহিনী পতাকা (রেজিমেন্টাল কালার) গ্রহণ করে ‘ফেব্রুয়ারি ১৫ বাহিনী’ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করবে। প্রশ্ন হলো কেমন হবে বাহিনী পতাকা।

এই বাহিনীর সঙ্গে নেতৃস্থানীয় যারা জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে আ.স.ম আব্দুর রব, কাজী আরেফ আহমেদ, শেখ শহিদুল ইসলাম, মনিরুল ইসলাম (মার্শাল মনি), হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, চিশতি শাহ্ হেলালুর রহমান, মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ, শিবনারায়ণ দাস, আব্দুল্লাহ সানি, মইনুল ইসলাম চৌধুরী, গোলাম ফারুক, ফিরোজ শাহ্, মোঃ খসরু উল্লেখযোগ্য।

পতাকা তৈরি নিয়ে মিটিং হল ইকবাল হলের ১০৮নং কক্ষে। এ কক্ষটি বরাদ্দ ছিল তৎকালীন ছাত্রনেতা আ.স. ম. আব্দুর রবের নামে। কাজী আরেফ আহমেদের প্রস্তাব অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হলো পতাকায় সবুজ জমিনের ওপর থাকবে একটি লাল বৃত্ত, আর লাল বৃত্তের মাঝে থাকবে পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র। সবুজ জমিন বাংলার চির সবুজের প্রতীক, লাল সূর্য রক্তে রাঙা হয়ে উঠবে স্বাধীনতার সূর্য আর জন্ম নেবে একটি নতুন দেশ। সোনালি আঁশের রঙে হবে তার পরিচয়। লাল বৃত্তের মাঝখানে সোনালি রঙের মানচিত্র তারই প্রতীক।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হলের ১১৬নং কক্ষে রাত ১১টার পর শিবনারায়ণ দাশ পুরো পতাকা ডিজাইন সম্পন্ন করেন। সেই রাতেই নিউমার্কেট এলাকার বলাকা বিল্ডিংয়ের ৩ তলার ছাত্রলীগ অফিসের পাশে নিউ পাক ফ্যাশন টেইলার্সের টেইলার্স মাস্টার খালেক মোহাম্মদী পতাকার নকশা বুঝে কাজ শুরু করেন।

১৯৭১ এর ২ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হবার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় এক বিশাল সমাবেশ হয়। এ সমাবেশে আ স ম আবদুর রব যখন বক্তব্য রাখেন, তখন নগর ছাত্রলীগ নেতা শেখ জাহিদ হোসেন একটি বাঁশের মাথায় পতাকা বেঁধে রোকেয়া হলের দিক থেকে মঞ্চস্থলে মিছিল নিয়ে এগিয়ে আসেন। রব তখন সেই পতাকা উত্তোলন করেন।

২৩ মার্চ, ১৯৭১ ধানমন্ডির নিজ বাসভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বাংলাদেশের শিবনারায়ণ দাশের ডিজাইন করা পতাকা উত্তোলন করেন। বাংলাদেশের বাইরে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় ১৮ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে কলকাতার পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনে।

১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার শিবনারায়ণ দাশের ডিজাইনকৃত পতাকার মাঝে মানচিত্রটি বাদ দিয়ে পতাকার মাপ, রং ও তার ব্যাখ্যা সংবলিত একটি প্রতিবেদন দিতে বলে পটুয়া কামরুল হাসানকে। কামরুল হাসান দ্বারা পরিমার্জিত রূপটিই বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা সবুজ আয়তক্ষেত্রের মধ্যে লাল বৃত্ত। সবুজ রং বাংলাদেশের সবুজ প্রকৃতি ও তারুণ্যের প্রতীক, বৃত্তের লাল রং উদীয়মান সূর্য, স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারীদের রক্তের প্রতীক। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার এ রূপটি ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি সরকারিভাবে গৃহীত হয়। বাংলাদেশের পতাকা আয়তাকারের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ১০:৬ এবং মাঝের লাল বর্ণের বৃত্তটির ব্যাসার্ধ দৈর্ঘ্যের পাঁচ ভাগের এক ভাগ, পতাকার দৈর্ঘ্যের ২০ ভাগের বাম দিকের ৯ ভাগের শেষ বিন্দুর ওপর অঙ্কিত লম্ব এবং প্রস্থের দিকে মাঝখান বরাবর অঙ্কিত সরল রেখার ছেদ বিন্দু হলো বৃত্তের কেন্দ্র। এই পতাকা অর্জনের মাধ্যমেই পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি মাথা উঁচু করে রয়েছে।

কেএইচ