ধারাবাহিকের এই পর্বের শুরুতেই বিদগ্ধ পাঠকদের আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমার এই লেখার দ্বিতীয় কিস্তির শেষে বলেছিলাম ইহুদীরা তাদের কার্যসিদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। কখনও কখনও তাদেরই ভেতরের একটি অংশ আরেক অংশের বিরোধীতাও করে।

এসবই তাদের কুটকৌশলের অংশ, মানুষকে ধোকা দিয়ে বোকা বানানোর ফর্মূলামাত্র। 

আর হিটলার তার যৌবনের শুরুতেই বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং তখনও পর্যন্ত ইহুদীদের এই চাল ধরার মতো কেউই ছিলনা। বিষয়টি হিটলারের মাইন ক্যাম্পফ বইয়ে তিনি স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন।

হিটলারের এই উপলব্ধি যে কতটা সত্য ছিল তা বর্তমান ইহুদীদের কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে দিবালোকের মতো পরিস্কার হয়ে গেল বিশ্ববাসীর সামনে। তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তি দিয়ে আমি এই বিষয়টি আমার তৃতীয় কিস্তিতে তুলে ধরারই অঙ্গীকার করেছিলাম।

এবার সেই কাজটিই শুরু করছি। প্রথমেই আমি গত ৮ জুলাই ২০১৪ থেকে অদ্যাবদী (২৩ জুলাই ২০১৪ এই লেখার সময় পর্যন্ত) গত দুই সপ্তাহের অধিক সময় ধরে গাজায় যে গণহত্যা চালিয়েছে তার দিকে একটু সতর্ক দৃষ্টি দিতে অনুরোধ করবো।

প্রথমেই আমরা দেখলাম হামলা শুরুর পর থেকেই ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্চামিন নেতানিয়াহুর হুংকার। বিমান হামলা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি স্থল ও জলসীমা থেকে গাজায় হামলা জোরদারের কথা বলছিলেন তিনি বিশ্ব জনমতকে তোয়াক্কা না করে।

গাজায় বেসামরিক নাগরিক বিশেষ করে কোমলমতি শিশু ও নারীদের রক্তাক্ত লাশের মিছিল দেখে যখন বিশ্ব বিবেক হাহাকার করে উঠলো তখনও ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রীর চোখ রাঙানি এতটুকু থামেনি।

এমনকি বিশ্বের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ দেখেছেন কিভাবে গাজায় নারকীয় তান্ডবের দৃশ্য পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে আরাম কেদারায় বসে কোমল পানীয় খেতে খেতে উপভোগ করেছেন ইসরাইলের নাগরিকরা। এরইমধ্যে ইসরাইলের এক নারী সংসদ সদস্যসহ একাধিক যায়নবাদী ইহুদী ফিলিস্তিনের প্রতিটি মাকে জবাই করারও হুমকি দিয়েছেন। তারা ফিলিস্তিনের ছোট ছোট শিশুদেরকে বেড়ে উঠা সাপের সাথে তুলনা করেছেন। ইসরাইলের বোমায় নিহত ফিলিস্তিনের নাগরিকরা জাহান্নামে গিয়েছে এমনও মন্তব্য করেছেন যায়নবাদী ইসরাইলীরা।

পরবর্তীতে আমরা দেখলাম শত প্রতিকূলতার মধ্যেও পাহাড়সম মনোবল আর ঈমানী তেজে বলীয়ান ফিলিস্তিনের ইসলামী প্রতিরোধ যোদ্ধা হামাস মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার খরচে তাদের নিজস্ব তৈরি রকেট দিয়ে একের পর এক প্রতিরোধ গড়ে তুলছে ইসরাইলী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, হামাসের এ রকম এক একটি রকেট আকাশে থাকতেই ধ্বংস করে দিতে ইসরাইল যে ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবহার করছে তার প্রতিটি তৈরিতে খরচ হয় এক লাখ ডলারেরও বেশি। কিন্তু তাতেও খুব একটা সফলতার মুখ দেখতে পারছিল না ইসরাইলি সরকার। এদিকে ডোমের মজুদও শেষের দিকে চলে যাওয়ায় এই আমেরিকান প্রযুক্তির ডোমের পরিবর্তে ইসরাইল নিজস্ব তৈরি রকেট ধ্বংসকারী মিসাইল ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু তাতেও ইসরাইলের খরচ হচ্ছে প্রতি রকেটের বিপরীতে প্রায় ৫০ হাজার ডলার। অর্থাৎ ৫০০ ডলার বিপরীতে ইসরাইলের খরচ প্রায় ৫০ হাজার ডলার।

এদিকে, স্থল অভিযানে নেমে হামাসের হাতে যখন একের পর এক ইসরাইলি ট্যাংক ধ্বংস (২২ জুলাই পর্যন্ত ৬টি) হচ্ছিল, নিহত হচ্ছিল ইসরাইলি সৈন্য (ইসরাইলের স্বীকারোক্তি মোতাবেক ২৭ এবং হামাসের দেয়া হিসেব ২২ জুলাই পর্যন্ত ৪২) এবং আহত হচ্ছিল আরও অনেক ইসরাইলী সৈন্য, তখনই শান্তিচুক্তি নিয়ে শুরু হয়ে গেল জাতিসংঘসহ বিশ্ব মোড়লদের দৌড়ঝাপ। শেষ পর্যন্ত ইসরাইলি এক সৈন্যকে আটক করে হামাস নিয়ে যাওয়ায় ইসরাইলের যেন মাথা খারাপ হয়ে যায়।

অপরদিকে, হামাসের শক্ত প্রতিরোধের মুখে পুরোপুরি নাস্তনাবুদ হওয়ার আগেই যুদ্ধবিরতিতে যেতে মরিয়া হয়ে পড়ে ইসরাইল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনকেরি ও জাতিসংঘ মহাসচিব বানকী মুনসহ বিশ্ব মোড়লরা যেন ছুটাছুটি শুরে করে দিলেন। যদিও ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতাহিয়াহু এখনও বলছেন গাজায় হামলা অব্যাহত থাকবে। তবে, এটা স্রেফ লোক দেখানো হুংকার এবং তার গলা যে শুকিয়ে গেছে তা তার কথাতেই বোঝা যায়। ভয় না পেলে ওবামা, জন কেরি ও বানকি মুনদের দিয়ে ওভাবে যুদ্ধ বন্ধে হামাসকে চাপ দিতেন না।

সবচেয়ে মজার বিষয়টি হলো খোদ ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিবে বিক্ষোভ হলো গাজায় আগ্রাসন বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার দাবিতে। এতদিনে গাজায় নিরীহ শিশু ও মায়েদের রক্তের হলিখেলা দেখে যারা হাততালি দিচ্ছিলেন, পাহাড়ের চূড়ায় বসে পরম তৃপ্তিতে হত্যাযজ্ঞ দেখে হায়েনার হাসি হেসেছিলেন, তারাই এখন বিক্ষোভ করছেন। সত্যি অবাক হওয়ার মতো বিষয়। সেখানে বিক্ষোভ থামাতে ইসরাইলের পুলিশকেও তৎপর হতে দেখা গেছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবরটি বেশ গুরুত্বের সাথে ছাপা হয়েছে। আবার এমনও বলা হচ্ছে যে ইসরাইলের ভেতরে বিক্ষোভের খবরটি যাতে বেশি করে মিডিয়ায় আসতে না পারে সেজন্য ইসরাইল খুব সতর্ক রয়েছে।

বিষয়টির বিশ্লেষণে যাবার আগে হিটলারের কিছু কথা বলা এখন আবশ্যক। হিটলার তার মাইন ক্যাম্পফ বইয়ের “Years of Study and Sufferings in Vienna” অর্থাৎ “অধ্যয়ন ও ভিয়েনায় যন্ত্রনাময় বছরগুলো”-এই অধ্যায়ে লিখেছেন: “Thus there was no real rift in their internal solidarity. This fictitious conflict between the Zionists and the Liberal Jews soon disgusted me; for it was false through and through and in direct contradiction to the moral dignity and immaculate character on which that race had always prided itself”.

অর্থাৎ-“তাদের আভ্যন্তরীন বোঝাপড়ায় নিজেদের মধ্যে কোনই দ্বন্দ্ব ছিল না। উদার ইহুদী এবং জিয়োনিস্টদের মধ্যে বাইরে-বাইরে লোক দেখানো ঝগড়া আমাকে বিরক্ত করে তুলছিল। কারণ এই ধরনের মিথ্যাচার ও ধোকাবাজি মন –মানসিকতা শুধু নৈতিক মনোবৃত্তিগুলোকেই নিচু করে না, একটি জাতির চরিত্রে কালিমা লেপন করে”।

বইয়ের একই অধ্যায়ে হিটলার আরও লিখেছেন, “To outward appearances it seemed as if only one group of Jews championed this movement, while the great majority disapproved of it, or even repudiated it. But an investigation of the situation showed that those outward appearances were purposely misleading…”

অর্থাৎ “বাইরে থেকে দেখলে হঠাৎ মনে হবে যে, ইহুদীদের একটি দলই বোধহয় এই সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে চলছে। অন্যদিকে বেশিরভাগ ইহুদীই এর বিপক্ষে বা একে বর্জন করেছে। কিন্তু বিষদ পর্যবেক্ষণের পর বুঝতে পারি যে এই আচরণ সম্পূর্ণ ব্যাপারটাকে ধোঁকা দেয়ার জন্যে।”

হিটলারের এই উপলব্ধি হয়তো এতদিন মানুষের কাছে বোধগম্য না হলেও এখন তা অনেকটাই পরিস্কার। যখনই দেখা গেল হামাসের কৌশলী ও সাহসী প্রতিরোধের মুখে নাস্তানাবুদ হচ্ছে ইসরাইলী সন্ত্রাসীরা, তখনই যুদ্ধ বিরতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে খোদ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যদিও মুখে কৃত্রিম হুংকার অব্যাহত রেখেছেন। অন্যদিকে, খোদ তেলআবিবেই বিক্ষোভ হচ্ছে গাজায় আগ্রাসন বন্ধের দাবিতে।

বিষয়টি নিয়ে অনেকেই অনেক ধরনের ব্যাখ্যা দিতে পারেন। কিন্তু বিষয়টি যে একেবারে নাটক সে ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই। কারণ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মাঝে-মধ্যে লোক দেখানো দ্বন্দ্ব ইসরাইলের জন্মগত কুটকৌশলেরই একটি অংশ। যে বিষয়টি বিশ্বের অনেক জ্ঞানীদের চোখে ধরা না পড়লেও হিটলারের চোখে ধরা পড়েছিল এখন থেকে প্রায় ৮০ বছর আগেই।

একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, তেলআবিবে বিক্ষোভের মানে হচ্ছে ইসরাইল এখন বহি:র্বিশ্বের কাছে এটাই প্রমান করতে পারবেন যে, গাজায় হামলা চালাচ্ছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। হামাস কেন রকেট ছুড়ছে ইসরাইলের ভেতরে সাধারণ মানুষের ওপর, যাদের অনেকেই খোদ ইসরাইলি সেনাবাহিনীর হামলার বিপক্ষে।

এর মানে হচ্ছে ইসরাইলের মুহুর্মুহ বিমান হামলার জবাবে নির্যাতিত ফিলিস্তিনিরা নিজেদের হাতে তৈরি সামান্য রকেট দিয়ে যে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে তাকেও বিতর্কিত করে তুলতে চায় ইসরাইল। অথচ এই রকেট হামলায় ইসরাইলের হাতে গোনা দু একজন নাগরিক এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন। কারণ রকেট আঘাত হানার আগেই সংকেতের ব্যবস্থা রয়েছে ইসরাইলের সব শহরে। রকেট আঘাত হানার আগেই নাগরিকরা গ্রাউন্ড ফ্লোরে চলে যায়। তাছাড়া রকেটের অনেকগুলোই আবার আয়রন ডোম দিয়ে আকাশেই ধ্বংস করে দিচ্ছে ইসরাইল।

অপরদিকে, গত ৮ জুলাই ২০১৪ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বিমান দিয়ে নিক্ষিপ্ত ইসরাইলের কয়েক হাজার বোমায় অন্তত ৫০৮জন ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার। প্রতি ১০ সেকেন্ডে গাজায় ১বার বোমা হামলার বিশ্ব রেকর্ডও এখন যায়নবাদী ইসরাইলের ভান্ডারে।

হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল-যেই রকেট দিয়ে কোন ইসরাইলীকে মারা যাচ্ছেনা, খামাখা তা নিক্ষেপ করে ইসরাইলকে উস্কানি দেয়ার অর্থ কী? জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমরা যে বেঁচে আছি সেটা বুঝাতেই আমরা এই রকেট নিক্ষেপ করছি। যদি আমরা এতটুকু প্রতিরোধ গড়ে না তুলতাম, তাহলে ইহুদী নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় কোনই খবর হতো না। আমাদেরকে নিরবেই মেরে ফেলতো ইহুদীরা। বিশ্ববাসী টেরও পেত না।

যাই হোক ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইহুদীদের সম্পর্কে প্রায় ৭০/৮০ বছর আগে হিটলার যে মন্তব্য করেছিলেন এতদিনে তার সত্যতা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করতে পারলো। হয়তো কারো কাছে মনে হতে পারে হিটলার তার ইহুদী বিদ্বেষ থেকেই এমন ধারণা পোষণ করতেন। কিন্তু না, হিটলারের ইহুদী বিদ্বেষ তো ছিলই না; বরং ইহুদীদের প্রতি যারা বিদ্বেষী ছিলেন তাদের প্রতিই অনেক ক্ষেত্রে হিটলার বিরক্ত ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ইহুদীদের কার্যকলাপই হিটলারকে ধীরে ধীরে ইহুদী বিদ্বেষী করে তোলে। আশাকরি, ধারাবাহিকের ৪র্থ কিস্তিতে বিষয়টি তুলে ধরতে পারবো।

ঢাকা, ২৩ জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম, কেবি