ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিনটি আজ। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রায় পৌনে পাঁচশ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটি ধ্বংস করে উগ্রবাদী হিন্দুরা। ১৫২৭ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন মোঘল সম্রাট বাবর।

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের নিন্দা জানাতে আজ শনিবার ‘সংহতি দিবস’পালন করছে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে মূল অনুষ্ঠানটি হচ্ছে কলকাতার গান্ধী মূর্তির পাদদেশে। রাজ্যের পূরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের তত্ত্বাবধানে এই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

হিন্দু দেবতা রামচন্দ্রের জন্মস্থান, রাম মন্দির, নাকি মোগল সম্রাট বাবর শাহ-র আমলে নির্মিত একটি মসজিদ? এই বিষয়টি নিয়ে ১৮৫৩ সাল থেকে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ চলেছে, যা চরমে ওঠে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর।

রামায়ণ খ্যাত অযোধ্যা শহর ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের ফৈজাবাদ জেলায় অবস্থিত। তারই কাছে রামকোট পর্বত। ১৫২৭ সালে সেখানে বাবর শাহের আদেশে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়, যে কারণে মসজিদটির নাম জনমুখে বাবরি মসজিদ। আবার এ-ও শোনা যায়, গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের আগে এই মসজিদ 'মসজিদ-ই-জন্মস্থান' বলেও পরিচিত ছিল।

আওয়াধ অঞ্চলের বাবর নিযুক্ত প্রশাসক ছিলেন মির বকশি। তিনি একটি প্রাচীন রাম মন্দির বিনষ্ট করে তার জায়গায় মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে কথিত আছে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস হবার পর মসজিদের ধ্বংসাবশেষে যে সব শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়, তা থেকে সংশ্লিষ্ট বিচারকরা সিদ্ধান্তে আসেন যে, মসজিদের নিচে একটি হিন্দু মন্দির ছিল।

আবার 'জৈন সমতা বাহিনী'-র মতে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের নিচে যে মন্দিরটির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে, সেটি ষষ্ঠ শতাব্দীর একটি জৈন মন্দির। মুসলমান দৃষ্টিকোণ থেকে মসজিদের নিচে মন্দির থাকার কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই। ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাত্র দুই বছর পরেই- অর্থাৎ ১৯৪৯ সালের ২৩শ ডিসেম্বর- বেআইনিভাবে বাবরি মসজিদের অভ্যন্তরে রাম-সীতার মূর্তি স্থাপন করা হয়।

তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দ বল্লভ পন্থকে চিঠি লিখে হিন্দু দেব-দেবীদের মূর্তি অপসারণ করার নির্দেশ দেন, কেননা ''ওখানে একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা হচ্ছে''। সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস), বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং অন্যান্য হিন্দু সংগঠন আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া-র যে সব বিবরণের ওপর নির্ভর করে তাদের দাবি পেশ করে থাকে, মুসলিম দৃষ্টিকোণ থেকে সেই সব রিপোর্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

বাবরি মসজিদ নিয়ে সংঘাত ঘটেছে বার বার। অথচ ফৈজাবাদ জেলার ১৯০৫ সালের গ্যাজেটিয়ার অনুযায়ী ১৮৫৫ সাল অবধি নাকি হিন্দু এবং মুসলমান, দুই সম্প্রদায়ই সংশ্লিষ্ট ভবনটিতে প্রার্থনা ও পূজা করেছে। কিন্তু সিপাহী বিদ্রোহের পর মসজিদের সামনেরটা ঘিরে দেওয়া হয় এবং হিন্দুরা বহিরাঙ্গনের একটি 'চবুতরা'-র ওপর তাদের পূজাপাঠ করতে থাকে। ১৮৮৩ সালে হিন্দুরা ওই চবুতরার ওপর একটি মন্দির নির্মাণের প্রচেষ্টা করলে পরেজেলা প্রশাসন তা নিষিদ্ধ করেন। ১৯৩৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মসজিদের চারপাশের প্রাচীর ও একটি গম্বুজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তা পুনর্নির্মাণের ব্যবস্থা করেন।

১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর মধ্যরাতে পুলিশ গার্ডরা নিদ্রিত থাকা অবস্থায় মসজিদে রাম-সীতার মূর্তি ঢোকানো হয়। কিন্তু যে আন্দোলনে শেষমেষ বাবরি মসজিদ ধ্বংস হবে, তা শুরু হয় ১৯৮৪ সালে, যখন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ মসজিদের তালা খুলে দেওয়ার দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৫ সালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সরকার ঠিক সেই নির্দেশই দেন। ১৯৮৯ সালের নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের আগে ভিএইচপি বিতর্কিত স্থলটিতে (মন্দিরের) 'শিলান্যাস'-এর অনুমতি পায়। ভারতীয় জনতা পার্টির প্রবীণ নেতা লাল কৃষ্ণ আদভানি ভারতের দক্ষিণতম প্রান্ত থেকে তাঁর ১০ হাজার কিলোমিটার দূরত্বের 'রথযাত্রা' শুরু করেন।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর এল কে আদভানি, মুরলি মনোহর যোশি, বিনয় কাটিয়ার ইত্যাদি নেতারা পূজা প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে একটি প্রতীকী 'কার সেবা' করেন। সেদিন দুপুরে এক কিশোর 'কার সেবক' একটি গম্বুজে চড়ে- যার পরই মসজিদের বাইরের কর্ডন ভেঙে ফেলা হয়। অতঃপর বাবরি মসজিদ বিনাশের পথে আর কোনো বাধাই থাকে না। ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের কণ্টকিত ইতিহাসে আর একটি কলঙ্কিত অধ্যায় যুক্ত হয়।

এমএ