২৫ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন হঠাৎ করেই স্থগিত ঘোষণা করা হয়।১৯৭১ সালের ২২ মার্চ সকালে এ ঘোষণা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ আর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা দেশ। ঢাকার রাজপথে নেমে আসে লাখ লাখ মানুষ।সারা দেশের লক্ষ-কোটি জনতা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার এ ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে মুক্তির সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে আরও বেগবান করে তোলার শপথ নেন।

মানুষ এতটাই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে যে, ২১ দিন ধরে চলা অসহযোগ আন্দোলনেও রাজপথে এমন বিক্ষোভ আর দেখা যায়নি। লাখো জনতার মিছিল গিয়ে সমবেত হয় বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনের সামনে। বঙ্গবন্ধু সমবেত জনতার উদ্দেশে এদিন ৫-৭ বার বক্তৃতা করেন। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘আমার শেষ রক্ত দিয়ে হলেও আপনাদের রক্তের ঋণ শোধ করে যাব। রক্ত দেব, তবুও স্বাধীনতা দেব না। আমাদের আন্দোলন চলবেই। আপনারা সবকিছু নিয়ে প্রস্তুত থাকুন।’

এদিকে ২২ মার্চেও বঙ্গবন্ধু তার গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠকের জন্য প্রেসিডেন্ট ভবনে যান। একই সঙ্গে গত দু’দিনে তিনি পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে ৬ দফা বৈঠকে মিলিত হন। সে সময়ও বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা শোভা পাচ্ছিল।

একাত্তরের ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠক শেষে নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্যে হোটেলে ফিরে এক সংবাদ সম্মেলনে ভুট্টো বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বৈঠক অব্যাহত রয়েছে। তারা উভয়েই বিভিন্ন বিষয়ে ঐকমত্যেও পৌঁছেছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে তা অবশ্যই পিপিপির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। তা না হলে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ ইয়াহিয়া-মুজিবের কোনো সিদ্ধান্তই মেনে নেবে না।

সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলন শেষ করেই ভুট্টো তার সঙ্গে পাকিস্তান থেকে আসা ১২ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদকে নিয়ে গোপন বৈঠকে বসেন। প্রায় দেড় ঘণ্টার বৈঠক শেষ করেই কড়া সামরিক প্রহরায় ভুট্টো ছুটে যান প্রেসিডেন্ট হাউসে। সেখানে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে দু’ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এ বৈঠকেই চূড়ান্ত হয় অপারেশন সার্চলাইটের সার্বিক পরিকল্পনা। ভুট্টো ঢাকায় অবস্থান করে টের পেয়েছিলেন যে, বাঙালির প্রাণের দাবি স্বাধীনতা ছাড়া তাদের নেতা শেখ মুজিব অন্যকিছু মেনে নেবেন না।

ভুট্টোর ব্যস্ততা ও ছোটাছুটিকে স্বাধীনতা আন্দোলনরত কোনো নেতাকর্মীই ভালোভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না। রাজনৈতিক বোদ্ধারা ভুট্টো-ইয়াহিয়ার আলোচনাকে ষড়যন্ত্রের অংশ বলেও মনে করতে থাকেন। চরম উত্তেজনা আর প্রচণ্ড বিক্ষোভের মধ্যে মুজিব, ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর বৈঠকের দিকেই সমগ্র জাতির দৃষ্টি ছিল। বৈঠক সফল হবে না জেনেও বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নেতারা আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষেই ছিলেন। ইয়াহিয়া ও ভুট্টোকে ষড়যন্ত্রকারী আখ্যায়িত করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতারা বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতাও করেন। বঙ্গবন্ধুও দলীয় নেতা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেন।

সমগ্র দেশেই চলছিল মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র প্রস্তুতি আর জায়গায় জায়গায় প্রতিরোধ। সদ্য গঠিত সাবেক সৈনিক পরিষদ এদিনও পল্টনে বিরাট এক সভা করে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে। সভায় বক্তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুপ্তচরবৃত্তি সম্পর্কে সবাইকে সদাজাগ্রত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘প্রহরীর মতো সার্বক্ষণিকভাবে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

আমাদের যা কিছু আছে সেই সীমিত শক্তি নিয়েও শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।’ এদিন বাঙালি শিল্পী পরিষদ পুরনো ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে সমবেত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি আবারও সমর্থন ব্যক্ত করে। স্বাধীন বাংলা শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ এ দিনটি প্রতিরোধ দিবস হিসেবে উদযাপন করে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সমর্থন আদায়ের জন্য প্রবাসী বাঙালিসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমর্থকরাও জোর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন।

এআইজে