ঢাকাসহ সারা দেশে দিনে রাতে অসংখ্যবার লোডশেডিংয়ে পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে নগরবাসী। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন জেলায় দিনের অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না।
গরমে শিক্ষার্থী ও রোগীদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। ভুক্তভোগিদের মতে, লোডশেডিংয়ের সময় ফ্রিজে থাকা মাছ-মাংস ও তরকারি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
গত কয়েক দিনের তীব্র তাপদাহে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে শহরের মানুষ। প্রচন্ড গরমে সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়েই থাকতে হচ্ছে গৃহবন্দি। প্রচন্ড তাপদাহে সাধারণ মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।
গরমে ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি নেই। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। ঘরের বাইরে বের হলেই যেন আগুনের হল্কা গায়ে লাগছে। স্বাভাবিক কাজকর্মে নেমে এসেছে স্থবিরতা। সকাল থেকেই বাড়ে রোদের তীব্রতা, থাকছে সন্ধ্যা পর্যন্ত। ফলে অফিসগামী মানুষ, শ্রমিক, স্কুলগামী শিক্ষার্থী এবং অল্প বয়সের শিশুরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে।
এদিকে, বিদ্যুৎতের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গরম ও পানি সংকট। ঢাকা বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, গরম পড়ায় রাজধানীতে বিদ্যুৎতের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে সংকটও। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ সংকট স্থায়ীভাবে চলে আসছিল সে সব এলাকায় বিদ্যুৎতের জন্য রীতিমতো হাহাকার শুরু হয়ে গেছে।
বিশেষ করে মিরপুরের শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মান্ডা, বাসাবো, মগবাজার, বাদামতলী, আরসিন গেইট, যাত্রাবাড়ীর কিছু এলাকা, মহাখালী, কাফরুলের একটি অংশসহ রাজধানীতে বেশ কিছু এলাকায় মানুষ বিদ্যুতের জন্য সীমাহীন কষ্ট করছে।
আবার গরম থেকে ক্ষণিকের জন্য একটু স্বস্তি লাভের আশায় মানুষ ফুটপাত থেকে লাচ্চি, লেবুর শরবত, জুস, মালাই ইত্যাদি কিনে খেয়ে উল্টো অসুস্থ হয়ে পড়ছে। গরমের কারণে বেড়ে গেছে তরমুজ, শসা, ডাব ও আনারসের দাম। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয়াবহ এই গরমে মানুষের শরীর থেকে ঝরে পড়ছে প্রচুর ঘাম, যা কিনা স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তাই এ সময়ে সবাইকে সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করতে হবে। না হলে যেকোনো সময় অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত গরমে ঘোরাফেরা করলে শরীরে অস্বস্তিবোধ, পানিশূন্যতা, প্রচন্ড মাথা ব্যথা, অনিদ্রা, মাংসপেশিতে ব্যথা, খাবারে অরুচি, চামড়ায় ক্ষত, কিডনি ও ফুসফুসে সমস্যা এবং হার্টের সদস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। লবণ বা ইলেকট্রোলাইটসের অভাবও এ শূন্যতার প্রধান কারণ। এ সময়ে শরীরের কোষ সজীব রাখতে প্রচুর পানি খেতে হবে। লবণের অভাব পূরণ করতে খাবার স্যালাইন খাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ফলের রসও খাওয়া ভালো।
প্রবীণ ব্যক্তিরা বলছেন, এ কিসের আলামত। ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রতিফলন। গত ১০ বছরের তাপমাত্রার উর্ধ্বমুখী প্রবণতা এ অঞ্চলের মানুষ ও জীববৈচিত্রের জন্য চরম হুমকি স্বরূপ। সবুজ উপকূলীয় বেষ্টনীতে মরুকরণের আভাস পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সুপেয় পানির সকল উৎসে মহাসংকটের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। বর্তমান আবহাওয়া এই আশংকারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে খুলনাঞ্চলের গড় তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রীরও বেশি পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। একই সময়ে ২৬ শতাংশ হারে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার আশংকাও করা হচ্ছে। জলবায়ুর নিরিখে খুলনার পরিবেশে এখন ভারসাম্যহীন। বৈশাখে এবারের তাপদাহ স্মরণকালের রেকর্ড ভেঙ্গেছে।
চাতক পাখি কিম্বা ব্যাঙাচির করুণ আর্তনাদ কোনভাবেই আঘাত হানছে না প্রকৃতির হৃদয়ে। বিপরীতভাবে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টি কমবে, খরা প্রবণতা তীব্রতর হবে। এশীয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) পরিচালিত এক গবেষণায়র উদ্বৃতি দিয়ে সূত্র জানায়, একটি ২০৫০ সালের মধ্যে খুলনাঞ্চলের মাসিক গড় তাপমাত্রা অক্টোবর শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ১ দশমিক ৭ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড এর মধ্যে ওঠানামা করবে।
খুলনায় চলতি মাসে ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। গত ১০ বছরের উপরোক্ত তথ্যসমূহ বিশ্লেষণ করে সূত্রটি জানায়, উল্লিখিত সময়ে খুলনার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এবং সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা মোটামুটিভাবে উর্ধ্বমুখী। সূত্রটি ২০৫০ সালের জলবায়ুর অনুমিত আশংকার স্বরূপ প্রসঙ্গে জানায়, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে পরিবেশ প্রতিবেশের সবকিছুই জড়িত।
খরা প্রবণতায় ভূ উপরিস্থ পানিসহ গভীর এবং অগভীর নলকূপসহ সকল উসের পানি প্রাপ্তিকেই অনিশ্চিত করে দিচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে ২৬ শতাংশ হারে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার আশংকায় নিকট ভবিষ্যতে খুলনা শহরাঞ্চল সুপেয় পানি মহাসংকটের কারণ হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
সূত্রটি উল্লিখিত গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে আরও জানায়, শুধু তাপমাত্রাই না ২০৫০ সালের মধ্যেকার সময়ের মধ্যে খুলনা অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনের মধ্যেও ব্যাপক অসামঞ্জ্যতা দেখা দিবে।
নগরীর মার্কেট ও বিপনী বিতানগুলোসহ রাস্তা-ঘাট থাকছে প্রায়ই জনশূন্য। যেখানে শহরের ব্যস্ততম সড়কগুলো অন্য সময় থাকে চরম কোলাহল পূর্ণ, সেখানে এই তীব্র তাপদাহে মানুষ বাসা-বাড়ি থেকে বেরই হতে চাচ্ছে না বা বের হতে পারছে না। বেলা বাড়ার পর থেকে রাস্তায় মানুষের চলাচল কমে যাচ্ছে। তবুও যাদের বের হতে হচ্ছে নিতান্তই প্রয়োজনে তাদের অনেককেই দেখা গেলো, খরতাপ থেকে বাঁচতে ছাতা মাথায় চলাচল করতে।
এদিকে তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে বিদ্যুতের ভেল্কিবাজী। ক্ষণে ক্ষণে লোডশেডিং মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। গরমের শুরুতেই লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে। গরমে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। যত কষ্টই হোক না কেন, পেটের দায়ে রাস্তায় তো বের হতেই হবে তাদের।
স্থানীয় ভ্যানচালক আব্দুল বলেন, সকাল ১১টা পর্যন্ত ভাড়া মারতে পারছি। তারপর থেকে আর রাস্তায় ভ্যান নিয়ে নামতে পারছি না। বাতাসের সঙ্গে প্রখর রোদের তাপের কারণে ভ্যান চালাতে পারছি না।
এদিকে গরম ও তাপদাহে কদর বেড়েছে শরবত ও রসালো ফলের। জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, প্রচন্ড গরমের কারণে শহরের বিভিন্ন সড়কে, মোড়ে মোড়ে ভ্রাম্যমাণ তরমুজ, ডাব ও আখের রসের দোকান বসেছে। এসব দোকানে ভিড়ও বেশ।
শহরের চাষাড়া এলাকায় আখের রস ব্যবসায়ী মকবুল জানালেন, এই তাপে একটু স্বস্বি পেতে মানুষ আখের রস পান করছেন। প্রতি গ্লাসের মূল্য নিচ্ছেন ১০টাকা। গত কয়েকদিন থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ গ্লাস রস বিক্রি করছেন। আগে তিনি প্রতিদিন বিক্রি করতেন ১০০ থেকে ২০০ গ্লাস রস।
এদিকে তীব্র তাপদাহে লোডশেডিংয়ের মাত্রা তীব্র থাকায় জনজীবন আরো বেশী বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৬-১৮ ঘন্টাই বিদ্যুৎ থাকছেনা বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এ অবস্থা চলতে থাকলে বন্ধ হয়ে যাবে বিদ্যুৎ নির্ভর বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান অসুস্থ হয়ে পড়বে চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ।
এদিকে চলমান এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলে পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা জানিয়েছেন। তারা জানান, সন্ধ্যার পর থেকে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে পড়াশোনা মারাত্বক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গরমের সাথে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে পরীক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারছে না। এ কারণে তাদের কাঙ্খিত ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হবে না কিনা তা নিয়ে সংঙ্কায় অভিভাবকরা।
এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা যায়, লোডশেডিংয়ের সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ক্লাস ছেড়ে বাইরে বসে অলস সময় কাটাতে।
বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা জানান, এভাবে লোডশেডিং চলতে থাকলে সপ্তাহ শেষে আমার কোন রোজগার থাকবে না। আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে কি খেয়ে বেঁচে থাকব। দ্রুত লোডশেডিং সমস্যার সমাধান চাই। সব মিলিয়ে এই তীব্র গরম এখন জনজীবন সবচেয়ে বড় মানবিক অশান্তির নাম।
এদিকে তাপমাত্রা আর আর্দ্রতা যতখানি, গরমটা তার চেয়ে বেশিই লাগছে। বিষয়টির ব্যাখ্যায় আবহাওয়াবিদরা বলছেন, 'ঢাকা এখন পড়ছে বাতাসের চক্করে। পর্যাপ্ত বাতাস প্রবাহিত না হওয়ায় তাপ বেশি অনুভূত হচ্ছে। আমরা এখন অপেক্ষায় আছি পূবালী বাতাসের।
এমআর





