ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানের সিনিয়র ক্রীড়া লেখক বার্নি রোনাই। গার্ডিয়ানের আরেকটি প্রকাশনা ফুটবল উইকলিরও নিয়মিত লেখক তিনি। ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ হিসেবেও বেশ পরিচিত।

তার চোখ খুঁজে ফিরে বিশ্বের আনাচে-কানাচে, ক্রীড়াঙ্গনের গলি-ঘুপচিতে। যেখানেই প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটবে, সেখান থেকেই তিনি মুক্তো তুলে আনবেন এবং লেখনীর মাধ্যমে ছড়িয়ে দেবেন সারা বিশ্বে।


বার্নির চোখ এসে আটকে গেল বাংলাদেশের সুন্দরবনঘেঁষা সাতক্ষীরা জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম তেঁতুলিয়ায়। এখান থেকেই যে হঠাৎ ক্রিকেটাকাশে উদিত হয়েছে এক রহস্যময় পেস বোলার মুস্তাফিজুর রহমান! সুতরাং এ রহস্য তো ভেদ করতেই হবে। বার্নি রোনাই নেমে পড়লেন রহস্য ভেদ করার কাজে।


গবেষণা করলেন, বিশ্লেষণ করলেন। অবশেষে একটা নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ দাঁড় করিয়ে দিলেন গার্ডিয়ানের স্পোর্টস ব্লগে, 'Mustafizur Rahman : the statistically freaky bowler with an even freakier gift' এ শিরোনামে।

অভিষেকের পর থেকে মুস্তাফিজের আট মাসের অভিযাত্রা এবং এ অভিযাত্রায় বিশ্ব ক্রিকেটে তার যে প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে, এসবই উঠে এসেছে বার্নি রোনাইয়ের লেখায়।

শুরুতেই তিনি একটু রসিকতা করার চেষ্টা করেছেন। বলেছেন, ‘আপনাকে কি আমি টি ২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের রহস্যময় পেসার মুস্তাফিজুর রহামানকে নিয়ে ষড়যন্ত্রের একটি গল্প শোনাব? এই প্রশ্নে হয়তো আপনি বলবেন যে, না, আমি শুনবো না। ধন্যবাদ। তবুও গল্পটা শোনাবোই।’

মুস্তাফিজুর রহমান কেমন? লাজুক, হালকা-লিকলিকে গড়নের এই বাঁ-হাতি উঠে এসেছে একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে।

পরিসংখ্যানপ্রেমীরা মুস্তাফিজকে ঘাঁটাঘাঁটি করলেই বুঝে যাবে মাত্র আট মাসে কতটা উন্নতি করেছে এই পেসার। অভিষেকের পর থেকে এখন পর্যন্ত মুস্তাফিজ বল করেছেন ৮২৪টি। উইকেট সব মিলিয়ে ৪৩টি। উইকেটপ্রতি দিয়েছেন মাত্র ১৪ রান। কী অসম্ভব এক পরিসংখ্যান। যোগ্য মূল্যই পেয়েছেন বাংলাদেশের এই বাঁ-হাতি পেসার। আইপিএলের আগামী সংস্করণের জন্য সানরাইজার্স হায়দরাবাদ তাকে কিনে নিয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডে (প্রায় দেড় কোটি টাকা)।

গ্রাম থেকে উঠে আসা এক তরুণের যেন স্বপ্নের উত্থান। তেঁতুলিয়া গ্রাম থেকে এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি গুগল সার্চ করা ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন মুস্তাফিজ।
এমনকি গত বছর ভারত সিরিজের সময় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি কাঁধের ধাক্কা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই ছেলেটিকে তারা বড় ধরনের প্রতিপক্ষই মনে করছেন।

বার্নি রোনাই লিখেছেন, ‘আমি এখনও তাকে সরাসরি খেলতে দেখিনি। এমনকি ইউটিউবে আসা তার সাক্ষাৎকারগুলোর কোনোটাকেই ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করিনি। উইকেট নেয়ার পর যে উদযাপন তিনি করেন, তার চেয়ে অন্যকিছুতে আমি তাকে অনুসরণও করিনি। তবুও সন্দেহাতীতভাবে আমার সবচেয়ে ফেভারিট ক্রিকেটার হয়ে গেলেন মুস্তাফিজ।’

মুস্তাফিজের বোলিং তত্ত্বের দিকে আসা যাক। খুব বেশি গতি যে তার বলে রয়েছে তা নয়, বলেও যে খুব বেশি সুইং করাতে পারেন, সেটাও নয়। এমনকি বাউন্সার দিয়ে ব্যাটসম্যানের পিলে চমকে দেয়ার মতোও নন। কিন্তু মুস্তাফিজ হচ্ছেন এমন এক বোলার যিনি খুবই ইকনোমিক্যাল। খামখেয়ালি টাইপের একজন মিডিয়াম পেসার এবং এখনও শিক্ষানবিশ।

তিনি নির্ভর করেন নিজের কিছু সুপার পাওয়ারের ওপর। স্বাভাবিকভাবেই তার ডেলিভারিতে রয়েছে অসাধারণ কিছু বৈচিত্র্য, যা তাকে সবার চেয়ে ভিন্ন হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে। বল করার সময় হাতের কব্জিটাকে ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ঘুরিয়ে দেন। সাদা বলকে জাম্প করাতে পারেন এবং কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই আবার স্টপ করিয়ে দিতে পারেন। এটা জন্মগতভাবে পাওয়া একটি প্রতিভা, স্কিল। যে কাটার তিনি দিয়ে থাকেন, সেটা শিখেছেন নেট বোলিং সেশনে। বিশ্বকাপ টি ২০ শুরু হতে আর মাত্র তিন দিন বাকি। অথচ তার আগেই গত সপ্তাহে ইনজুরিতে পড়েছে।

বাংলাদেশ জানিয়ে দিয়েছে, এশিয়া কাপে আর খেলতে পারবে না সে। কিন্তু আমার থিওরি হচ্ছে, এ গল্পের পেছনে অন্য কোনো গল্পও আছে। যদিও এ সম্পর্কে কোনো গুঞ্জন, তথ্য কিংবা আলোচনার বিষয়বস্তুও আমার কাছে নেই। তবুও আমি বলব, টি ২০ বিশ্বকাপের জন্য বাংলাদেশ তাদের সেরা অস্ত্রটিকে রিজার্ভ রেখেছে। আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস এমনকি নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার জন্য তিনি হয়ে উঠতে পারেন ভয়ংকর।

আমি আবারও বলছি, আমার এ ধারণার পেছনে সঠিক কোনো তথ্য নেই। সম্পূর্ণ নিজের ভেতর থেকেই বলছি, টি ২০ বিশ্বকাপে সম্পূর্ণ নিজের ক্ষমতা নিয়েই আবির্ভূত হবেন তিনি। আমি চাই না কোনোভাবেই ইনজুরিতে পড়ুক মুস্তাফিজ। তাকে চাই বিশেষ কোনোরূপে। মুস্তাফিজ এমন একজন বোলার, আমি যখন থেকে টি ২০ বুঝতে পেরেছি, তখন থেকে অপেক্ষায় আছি তার মতো একজন বোলারের। যিনি টি ২০তে অন্যমাত্রা যোগ করতে পারবেন।’ ওয়েবসাইট।

ওএফ