মাত্র কয়েকদিন আগের ঘটনা। ইরাক সরকার তাদের দেশে আন্তর্জাতিক টিভি চ্যানেল আল-জাজিরা সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। শুধু ইরাক নয়, বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশের সরকার তার দেশের গণমাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে, হয়তো ইরাকের মত সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় না।

গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস শুধুমাত্র আধুনিকতার আস্তরণে আবৃত সরকারগুলোরই নয়, এ ইতিহাস অনেক পুরনো। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই দেখা যায় এর উপর সরকার নিয়ন্ত্রণ রাখার একটা অপচেষ্টা সব সময়ই করে যাচ্ছে, হয় ইহা বাংলাদেশ কিংবা আমেরিকা।

দেশ, পরিবেশ, পরিস্থিতি, ভৌগলিক কারণ আলাদা থাকলেও প্রত্যেকটি সরকারের গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রের কারণ এবং কৌশল প্রায় একই রকম। বহুবিধ কারণের মধ্যে একটি অন্যতম কারণ হল, গণমাধ্যম তার সরকারের বন্দনা না করে বরং তার সমালোচনা করে। এছাড়া অন্য কোন কারণে গণমাধ্যমের উপর কখনো চাপ প্রয়োগ করা হয় না।

যেমন যারা সরকারের সমালোচনা না করে গুনকীর্তন করে, সরকার তাদের উপর নিয়ন্ত্রন না করে তাদেরকে বিশেষ বিশেষ সময় পুরষ্কৃত করার ব্যবস্থা করে। এছাড়া বিনোদন, খেলাধুলা, প্রাণীজগত বা রিয়েলিটি শো ভিত্তিক গণমাধ্যমগুলোকে কখনো সরকারের রোষানলে পড়তে দেখা যায় নি। যেসব গণমাধ্যমগুলো সরকারের সমালোচনা করে শুধুমাত্র তাদেরই কন্ঠরোধ করতে দেখা গিয়েছে।

আমাদের এই উপমহাদেশে প্রথম গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করে ব্রিটিশরা। কারণ ছিল সরকারের সমালোচনা এবং সরকার পতনের জন্য বিদ্রোহিদের উস্কানি প্রদান। এই কারণ দেখিয়ে কোন ধরণের কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই বন্ধ করে দেয়া হত গণমাধ্যম। আর একটির অবস্থা দেখে অন্যগুলোও শিক্ষা পেয়ে যেত কিভাবে চলতে হবে।

এরপর ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের অবস্থা একই রকম দাড়িয়েছে। সরকারের সমালোচনা করলেই পড়তে হয়েছে রোষানলে। বাংলাদেশ জন্মলাভের পর থেকে অনেক পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, অনেক টিভি চ্যানেল বন্ধ করা হয়েছে, অনেক সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে, যাদের হত্যা করা হয়েছে তদের হত্যাকারীদের বিচার করা হয়নি। এতো কিছুর পর সরকারের গুনকীর্তন না করে কেউ আর পারে না।

কারণ গণমাধ্যম এখন আর ছোট্ট কোন পরিসর নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষ। একটি গণমাধ্যম বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে শত শত পরিবারের কষ্ট। তাই গণমাধ্যমগুলো চাইলেও অনেক কিছু করতে পারে না। অবশ্য হলুদ সাংবাদিকরা এসব নৈতিকতার নিয়ম-নীতির ধার ধারে না।

গণমাধ্যম হল একটি জাতীর বিবেক। এই গণমাধ্যম যদি অন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেই দেশ অন্ধকারে হারিয়ে যায়। তাই একটি দেশের সরকার তার গণমাধ্যমকে যতই নিয়ন্ত্রন করুক, গণমাধ্যমগুলো যদি সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা না করে, তার ভুলগুলো না ধরিয়ে দেয় সেই দেশের ভবিষ্যত কখনোই ভাল হবে না, শুধু অন্ধকারই হবে ভবিষ্যত।

তাই একটি দেশের সরকারই পারে সে দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রাখতে, আর সরকারই পারে গণমাধ্যমের মুক্ত কন্ঠ রোধ করতে। তাই সরকারই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখবে এই হোক আজ ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে বা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আমাদের কামনা।

উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে ইউনিস্কোর ২৬তম সাধারণ অধিবেশনের সুপারিশ মোতাবেক জাতিসংঘ ১৯৯৩ সাল থেকে এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করার শপথ গ্রহণ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ক্ষতিগ্রস্ত ও জীবন দানকারী সাংবাদিকদের স্মরণ ও তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক সংগঠনগুলো দিবসটি পালন করে থাকে।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সংবিধান-স্বীকৃত গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অধিকার সমুন্নত রাখতে সকল প্রকার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, “একদিকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও সুশাসন ও অন্যদিকে জনকল্যাণমুখী, অংশগ্রহণমূলক ও টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়া সুদৃঢ়তর করণের লক্ষ্যে তথ্য ও মত প্রকাশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সকল প্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ ও সংবাদকর্মীদের ওপর হয়রানি বা দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা প্রতিহত করা সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। এমন কোনো আইনী, প্রশাসনিক, নীতি বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রবর্তন থেকে বিরত থাকা উচিত যার ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।”

তিনি আরো বলেন, “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) আইন ২০১৩ এর ৫৭ ধারাসহ সরকারের বিবেচনাধীন জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা, খসড়া সম্প্রচার আইন ও প্রেস কাউন্সিল আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনী প্রস্তাবসমূহ চূড়ান্তকরণের ক্ষেত্রে এমন সব ধারা বাতিল করতে হবে যার ফলে মাত্রাতিরিক্ত ও নিবর্তনমূলক নজরদারির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে এবং তথ্যের অবাধগম্যতা ও মত ও তথ্য প্রকাশের মৌলিক অধিকার খর্ব হতে পারে।”

উল্লেখ্য, আওয়ামী মহাজোট সরকারের আমলে ১৮ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন, আহত হয়েছেন প্রায় দুই হাজার সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ৪৮ সাংবাদিকের ওপর হামলার রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকার বাইরের ভিন্ন মতের ২০০ পত্রিকার ডিক্লারেশন ডিসিদের দিয়ে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। অনলাইন গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য নীতিমালা করা হচ্ছে।

ইআর/এমবি