৭১এ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার (আপিল)কার্যক্রম দ্রুত শেষ হতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপক্ষের পাল্টা যুক্তি দেওয়া শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষামান রাখা হবে অথবা চূড়ান্ত রায়ের জন্য দিনক্ষণ ঠিক করা হবে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত অ্যার্টনি জেনারেল ও ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের সমন্বয়ক এমকে রহমান জানান,‘সুপ্রিমকোর্টের আপিলে সাঈদী ছাড়া আরও ছয়টি মামলা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু সাঈদীর মামলার কার্যক্রম সবচেয়ে এগিয়ে। অন্য কোনো মামলার শুনানি এখনও শুরুই হয়নি।’
তবে শুধুমাত্র সাঈদীর মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামীপক্ষের আর্গুমেন্ট (যুক্তি) শুনানি শেষ করে আসামীপক্ষের পাল্টা যুক্তি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আশা করি,রাষ্ট্রপক্ষের আর্গুমেন্টও দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। আর্গুমেন্ট (যুক্তি) খণ্ডনের পরের পর্যায় হলো রায় ঘোষণা।" তবে রায় কবে নাগাদ দেওয়া হবে তা তিনি জানাতে পারেননি।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী জানান,রাষ্ট্রপক্ষের আর্গুমেন্ট (যুক্তি) খন্ডন দুই -একদিন চলতে পারে। তার পরবর্তী পর্যায় হলো (সিএবি) রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখার পালা। সে হিসেবে অন্য কোনো মামলা আর শুনানির পর্যায়ে নেই। তাই সাঈদীর মামলার রায় আগে হতে পারে’।
সৈয়দ হায়দার আলীর সঙ্গে একমত পোষণ করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান খান জানান,‘সাঈদীর মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের পাল্টা আর্গুমেন্ট (যুক্তি) খন্ডন দুই-একদিন চলতে পারে। তার পরবর্তীতে (সিএবি) রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখার পালা। সে হিসেবে এপ্রিলে না হলেও মে মাসে সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা হতে পারে।’
ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর মামলার কার্যক্রম শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়েছে। আরও চারটি মামলার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
ইতিপূর্বে ট্রাইব্যুনালে ১০টি মামলায় মাওলানা আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড,জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন,(আপিলের রায়ে পরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর),আরেক সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড,নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড,সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের ৯০ বছরের কারাদণ্ড ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড,চৌধুরী মুঈন উদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড,বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড ও আব্দুল আলীমের আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়ে মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রথম ধাপে মামলার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর অপেক্ষমান রায় ঘোষিত না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ফজলে কবীরের মেয়াদ শেষে তিনি অবসরে গেলে তার স্থানে অন্য বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাই নিয়ম অনুযায়ী নিজামীর দ্বিতীয় ধাপের যুক্তি খণ্ডন করে মামলাটির রায় হওয়ার অপেক্ষায়।
নিজামীর পরবর্তী পর্যায়ে আব্দুস সোবহান,মীর কাশেম আলী,এটিএম আজহার ও আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হোসেন এবং ফরিদপুর বিএনপির নেতা ও নগর কান্দা পৌর মেয়র জাহিদ খোকনের মামলার কার্যক্রম দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রসিকিউটর হায়দার আলী বলেন,‘আব্দুল কাদের মোল্লার আপিলে যে সময় লেগেছে সাঈদী বা অন্যান্য মামলায় ততো সময় নাও লাগতে পারে।’
ট্রাইব্যুনালে আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় রায় ঘোষণার পর দণ্ডের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ আপিল করার বিধান থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করতে পারবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। পরে ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয়। যদিও ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করার পর আপিল নিষ্পত্তির জন্য দুই মাস অর্থাৎ ৬০ দিন সময় বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু কাদের মোল্লার মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর আপিল শুনানি শেষ করতে সময় লেগেছে ৫৬ দিন।
এদিকে,দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা নিষ্পত্তির পরে পর্যাযক্রমে অধ্যাপক গোলাম আযম,আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ,মো.কামারুজ্জামানের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির তারিখ নির্ধারিত রয়েছে।
পরের ধাপে শুনানির জন্য আসতে পারে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আব্দুল আলিমের আপিল আবেদন। তবে আবুল কালাম আযাদ ও চৌধুরী মুঈন উদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা হয়নি।
সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড বহাল চায় রাষ্ট্রপক্ষ
সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড বহাল চেয়ে সর্বচ্চো আপিল বিভাগের কাছে আবেদন করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইন র্কমর্কতা এ্যার্টনি জেনারেল মাহবুবে আলম।
যুক্তি উপস্থাপন কালে তিনি বলেন,এক মোমেনার সাক্ষীতে কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়েছে।  মোমেনার মতো নির্ভরযোগ্য সাক্ষী এখানেও রয়েছে। সাক্ষীদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়,সাঈদীর অপরাধ আরো ঘৃণ্য ও মারাত্মক। হত্যা,লুণ্ঠন,র্ধষণ,পাক বাহিনীকে আমন্ত্রণ ও অর্ভ্যাথনা,অগ্নিসংযোগসহ সব ধরণের অপরাধ তিনি করেছেন।
এ্যার্টনি জেনারেল বলেন,হত্যার চেয়েও ভয়ানক আরকেটি অপরাধ সাঈদী করেছেন। সেটা হচ্ছে জোর করে মানুষকে র্ধমান্তরিত করা। এই মামলায় ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায় যথার্থ হয়েছে। ন্যায় বিচারের র্স্বাথে অবশ্যই এই রায় আপিল বিভাগে বহাল থাকা উচিত। অন্যদিকে প্রমাণিত হলেও সাজা না হওয়া ছয় অভিযোগে সাঈদীর শাস্তি চেয়ে আপিল করেন রাষ্ট্রপক্ষ।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেন আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে ওই বছররে ২৮ র্মাচ সুপ্রিমর্কোটে আপিল দায়ের করেন জামায়াতের এই নেতা। এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর আপিল আবেদনের শুনানি শুরু হয়।
আসামীপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিষ্টার আব্দুর রাজ্জাকের অনুপস্থিতে এডভোকটে এস এম শাহজাহান যুক্তির্তক উপস্থাপন করছেন। আসামীপক্ষের পর গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করনে রাষ্ট্রপক্ষ।
রাষ্ট্রপক্ষের আনীত ২০টি অভিযোগের মধ্যে ৮টি অভিযোগের ওপর যুক্তি উপস্থাপন করেন আসামীপক্ষ। অপরদিকে  ট্রাইব্যুনাল যে ১২টি অভিযোগ থেকে সাঈদীকে খালাস দিয়েছে,সেগুলোও পূর্ণ ন্যায় বিচার চায় রাষ্ট্রপক্ষ। সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে ২০টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়েছিল। এরমধ্যে আটটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে। ওইসব অভিযোগের দুটিতে  তাকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
[b]ঢাকা, কেএ, ১৪ এপ্রিল (টাইম নিউজ বিডি) // জেএ [/b]