সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কে চীন-বিরোধী অবস্থান এতটাই তুঙ্গে উঠেছে যে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশটিতে ভ্রমনের ব্যাপারে নিজ নাগরিকদের সতর্ক করলো আগামী বিশ্বের সুপার পাওয়ারের স্বপ্নে বিভোর চীন।
তুরস্কে পর্যটকদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার উল্লেখ করে চীন তার পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত এক বার্তায় নিজ নাগরিকদের প্রতি এই সতর্কতা আরোপ করলো।
গত রোববার (৫ জুলাই ২০১৫) চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই সতর্ক বার্তায় নাগরিকদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়, চীন সরকারের বিরুদ্ধে তুরস্কের মানুষের ক্ষোভের মাত্রা কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে।
পশ্চিম চীনের জিনজিয়ান প্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুসলিম উইঘুর সম্প্রদায়কে রোযা ও ধর্মীয় ইবাদত পালনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় তুরস্ক ও চীনের সম্পর্কে এই নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়।
উল্লেখ্য, আগের বছরগুলোর ন্যায় এবারও রোযা শুরুর আগেই চীন দেশটির মুসলিম প্রধান অঞ্চল জিনজিয়ান-এ সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারি, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের পবিত্র রমযান মাসে রোজা না রাখতে এবং হোটেল-রেস্তোরা খোলা রাখার নির্দেশ দেয়।
কমিউনিস্ট শাসিত চীনে নাস্তিক্যবাদী শাসন কায়েম থাকায় অনেক বছর ধরেই রোজার মতো ধর্মীয় বিধি-বিধানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। বিশেষ করে দেশটি সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান আবাসস্থল জিনজিয়ান-এ বেশ কড়াকড়িভাবে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে।
এমনকি জিনজিয়ান প্রদেশের জিংহে কাউন্টি থেকে সরকারি খাদ্য বিভাগ (ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন)-এর পক্ষে গত জুনে (২০১৫) জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রমযান মাসে খাবার সরবরাহকারী কর্মস্থলগুলোতেও স্বাভাবিক কার্যক্রম চলবে।
একই প্রদেশের বোল কাউন্টির কর্মকর্তাদের প্রতি এই মর্মে নির্দেশনা প্রদান করা হয়-কেউ যেন রমযানের রোজা, রাত জেগে ইবাদত বা অন্যান্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন না করেন। স্থানীয় সরকারের এক সভায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যা পরে সরকারি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয়।
চীনের জিনজিয়ান প্রদেশে প্রতিবছর এভাবে উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়কে রোজা পালন থেকে বিরত রাখতে সরকারি এমন বাড়াবাড়ির ব্যাপারে এরই মধ্যে মানবাধিকার গ্রুপগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপক সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করছে না চীন।
এর আগের বছরগুলোতেও স্কুলগামী ছেলে-মেয়েরা যাতে রমযানের রোজা এবং অন্যান্য ধর্মীয় রীতি-নীতির অনুশীলন করতে না পারে সে ব্যাপারে কড়া নির্দেশনা কার্যকর ছিল।
এবারেও পরিস্থিতি অনেকটাই অপরিবর্তিত ছিল। দেশটির “চীনা টেচেং” হিসেবে পরিচিত টারবাঘাটাই শহরের শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রতি এক নির্দেশনায় বলা হয়- শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ করুন যাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীরা রমযান মাসে রোজা না রাখে, মসজিদে প্রবেশ না করে এবং কোন ধর্মীয় কর্মকান্ডে অংশ না নেয়।
জিনজিয়ান প্রদেশের অন্যান্য শিক্ষা ব্যুরো ও স্কুলগুলোর ওয়েব সাইটেও একই নির্দেশনা জারি করে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়।
আর সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর এমন আচরণকে ঘিরে চীনকে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছেন তুরস্কের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। একই ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষদের ওপর চীনের এমন আচরণ কিছুতেই মানতে পারছেন না দেশটির সাধারণ মুসলমানরা।
গত শুক্রবার (৩ জুলাই ২০১৫) তুরস্কের পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, নির্যাতিত ও অসহায় উইঘুর সম্প্রদায়ের জন্য তুরস্কের দরজা খোলা রয়েছে।
আর এমনই পটভূমিতে নিজ নাগরিকদের লক্ষ্য করে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত ওই নোটিসে আরও বলা হয়, তুরস্কের ধারে-কাছে ঘেষ না, সেখানকার প্রতিবাদের কোন বিষয় ক্যামেরায় ধারণ করো না। বাইরের এসব কর্মকাণ্ডকে যত পার এড়িয়ে যাও।
এদিকে, রোববার (৫ জুলাই ২০১৫) তুরস্কের প্রভাবশালী দৈনিক হুররিয়াতে প্রকাশিত প্রক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সপ্তাহে ইস্তাবুলের জনপ্রিয় তোফানি জেলায় এক চীনা রেস্টুরেন্টে ক্ষুব্ধ মানুষের একটি ছোট্ট গ্রুপ হামলা চালায়। তারা ওই রেস্তোরার জ্বানালা ভেঙ্গে ফেলে।
এদিকে, একই দিনে কয়েক’শ বিক্ষুব্ধ মানুষ একটি প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে ইস্তাবুলে চীনা কনস্যুলেট অফিসের দিকে যায়। তারা কনস্যুলেট বিল্ডিংয়ের সামনে পতাকা হাতে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করেন এবং চীন বিরোধী নানা স্লোগান দেন। এর আগে সকালের দিকে কয়েকজন প্রতিবাদকারী চীনা পতাকায় আগুন দেন।
প্রতিবাদকারীদের মধ্যে ছিলেন ১৭ বছর বয়সী তরুন তুর্কি নাগরিক মোহাম্মদ গোচি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তারা (উইঘুর মুসলমানরা) আমাদের ভাই। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর অন্যায়ভাবে আঘাত হানা হচ্ছে।
তরুণ তুর্কি নাগরিক গোচি এ সময় মাথায় একটি নীল কাপড় জড়িয়ে ছিলেন যাতে লেখা ছিল, “পূর্ব তুর্কিস্তান তুমি একা নও (East Turkestan you are not alone)”।
তরুণ গোচি ক্ষোভের সাথে আরও বলেন, “তাদের (উইঘুর মুসলমানদের) একটাই অপরাধ। আর তা হলো তারা মুসলমান। তুরস্কের মানুষের উচিত তাদের ভাইদের বুকে জড়িয়ে নেয়া এবং কমিউনিস্ট চীনের নিষ্ঠুরতা থেকে তাদেরকে রক্ষা করা”।
এদিকে, চীনের ক্রমাগত ইসলামবিরোধী অবস্থান বিশেষ করে রোযার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করাকে ইসলাম ও মুসলমানের বিপক্ষে দেশটির যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে অভিহিতি করে এরই মধ্যে বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ব উইঘুর কংগ্রেস।
কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট সাইত তুমতুর্ক 'আনাদুলো' এজেন্সিকে সম্প্রতি বলেন, "দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বিশ্ব এখনও এ বিষয় নীরব রয়েছে।"
তিনি দাবি করেন, "সরকারের এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে লোকজন রাস্তায় বিক্ষোভ করলে চীন সরকার গত বছর ৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে মেরে ফেলেছিল।"
তার মতে, পূর্ব তুর্কিস্তানের সাধারণ মানুষের উপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও মানুষিক চাপ বৃদ্ধি করে চীন সমগ্র বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, জিনজিয়ানের স্বায়ত্বাশাসিত অঞ্চলে অনেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বসবাস করেন। এর মধ্যে রয়েছে পূর্ব তুর্কিস্তানের তার্কিক উইঘুর মুসলমানরা।
তারা বিশ্বাস করেন যে তুর্কির উপজাতীদের মধ্যে উইঘুর একটি, যারা এই এলাকায়ই বসবাস করছেন। তারা চীন নয়, নিজেদেরকে মধ্য এশিয়ার অংশ হিসেবে মনে করেন।
তুমতুর্ক বলেন, "পূর্ব তুর্কিস্তানে হামলা চালানোর পর দীর্ঘ ৬৬ বছর ধরে সিস্টেমেটিক একত্তীকরণ নীতি গ্রহণ করে আসছে চীনারা। আর দশকের পর দশক ধরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয় বাধা দিয়ে উইঘুর মুসলমানদের উপর তারা নির্যাতন চালিয়ে আসছে। কিন্তু বিশ্ব এ বিষয় নীরব রয়েছে।"
বিশ্ব উইঘুরকংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট সাইত তুমতুর্ক ক্ষোভের সাথে অরগানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি)'র সমালোচনা করে বলেন যে সংগঠনটি চীনের নিষ্ঠুরতার বিষয় কোনো কথা বলছে না।
আগামীর বিশ্ব সুপার পাওয়ার হিসেবে বেড়ে ওঠা কমিউনিস্ট শাসিত চীনে মুক্ত গণমাধ্যমের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের পর এবার ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশটি তার এগিয়ে চলার গতিকে কতটা নিস্কন্টক রাখতে পারবে তা নিয়ে উদ্বেগ্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
কেবি





