আজ ২২ এপ্রিল। বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। প্রতি বছরের এই দিনে বিশ্বের প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা ও ভালবাসা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ধরিত্রী দিবস পালিত হয়।

১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল মার্কিন সিনেটর গেলর্ড নেলসন ধরিত্রী দিবসের প্রচলন করেন। ১৯৯০ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ব ধরিত্রী দিবস পালিত হচ্ছে। সিনেটর গেলর্ড নেলসন ১৯৭০ সালে যে পরিবেশ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘এনভায়রনমেন্টল টিচ ইন’ পৃথিবীর অনেক দেশ সরকারিভাবে এই দিবসটি পালন করে।

উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো বসন্তকালে আর দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোতে শরতে ধরিত্রী দিবস পালিত হয়। পৃথিবীর পরিবেশ দিন দিন দূষিত হয়ে মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আর এর জন্য মূলত মানুষই দায়ী।

১৮’শ সালের আগে থেকে ইউরোপের পুঁজিপতিরা কলকারখানা গড়ে তুলতে থাকে। এরপর বিশ্বজুড়ে কলকারখানা বিস্তার লাভ করে। দ্রুত শিল্পায়ন করতে গিয়ে বনাঞ্চল ধ্বংস ও অপরিকল্পিত নগরায়নের হিড়িক পড়ে।

কলকারখানায় ব্যবহৃত তেল, গ্যাস, কাঠ, কয়লা, কৃষিকাজে মাত্রারিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার ও জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নির্গত হচ্ছে।

এতে মাটি পানি ও বাতাস দূষিত হচ্ছে। জনসংখ্যার বিস্ফোরণ মাত্রারিক্ত দূষণ প্রকৃতির নির্দিষ্ট সহ্য ক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। মানুষের অপরিনামদর্শী কর্মকাণ্ডে প্রকৃতি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে।

আর আমাদের সবুজ ধরিত্রীর ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য গ্যাস নির্গমণের কারণে দ্রুত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে।

কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়া আরও যেসব গ্যাস বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতার জন্য দায়ী সেগুলো হলো- হাড্রো কার্বন, কার্বন মনোঅক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড, মিথেন, সিএফসির হ্যলন, ক্লোরোফার্ম, মিথাইন ইত্যাদি।

বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইডসহ যাবতীয় গ্যাস শুষে নিয়ে বাতাসকে দূষণ মুক্ত রাখে বৃক্ষ। কিন্তু মানুষ নির্বিচারে পৃথিবী থেকে বৃক্ষ নিধন করে ফেলছে। পৃথিবী থেকে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাচ্ছে।

প্রতি বছর মানুষের হাতে পৃথিবী থেকে ৪১ লাখ হেক্টর বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে। বৃক্ষ কমে যাওয়ায় বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক মাত্রা কমে যাচ্ছে। আর বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডসহ যাবতীয় বিষাক্ত গ্যাস ও মনুষ্য সৃষ্ট সিএফসি গ্যাস অব্যাহতভাবে বেড়ে যাওয়ায় বৈষ্ণিক উষ্ণতা পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। বৈষ্ণিক উষ্ণায়নের বিরূপ প্রভাবে মেরুঅঞ্চলসহ হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের আশংকা, এভাবে বরফ গলা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের অনেক উপকূলীয় ভূমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। বিশ্বের ২২ শতাংশ পরিবেশ উদ্বাস্তু হবে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনে বিরূপ প্রভাবে পৃথিবী থেকে বহু প্রজাতির প্রাণি বিলুপ্ত হয়ে গেছে ও যাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশ বিপর্যের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর ৭০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। এর মধ্যে এশিয়ায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায়।

মানুষের প্রকৃতিবিরোধী কর্মকাণ্ডে বৈষ্ণিক উষ্ণায়ন হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত দূষণ প্রকৃতির নির্দিষ্ট সহ্যক্ষমতা ছাড়িয়ে ধরিত্রী বিষাক্ত গ্যাসে ভরে গেছে। ফলে মানুষসহ সকল প্রাণির বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

কার্বন নিঃসরণ বৈষ্ণিক উষ্ণায়ন সৃষ্টির মূল কারণ। আর শিল্পোন্নত দেশগুলো এ জন্য দায়ী। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯০ সালে ইন্টারগভারমেন্টাল নেগোসিয়েটিং গঠন করে (আইএনসি)।

১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিওডি জেনিরোতে ধরিত্রী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আইএনসি, ক্লাইমেন্ট চেঞ্জ এর খসড়া প্রণয়ন ধরিত্রী সম্মেলনে গৃহীত হয়। এ সম্মেলনে গ্রীনহাইজ গ্যাস নিঃসরণের জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলোকে দায়ী করা হয়। গ্রীনহাউজ গ্যাসে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে তাদের এগিয়ে আসার কথা গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সিএফসি গ্যাসের সিংহভাগই আসে উন্নত দেশসমূহ থেকে। ধনী দেশের গ্যাস নিগর্মণজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষতি কাটিয়ে উঠার ব্যয় উন্নত দেশগুলোকে বহন করা উচিত।

প্রকৃতিবিরোধী অব্যাহত আত্মঘাতি তৎপরতা বন্ধ করা না গেলে প্রাণিকূলসহ ধরিত্রী ধ্বংস হয়ে যাবে। বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এই ধরিত্রীকে বাসযোগ্য করে রাখতে হবে।

কোন দেশের কর্মকাণ্ডে যাতে অন্য দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি না হয় তা লক্ষ রাখার দায়িত্ব সে দেশের। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে দেশ বাঁচাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জোটবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। আর এ ব্যাপারে দেশের সকল নাগরিককে সচেতন করে তুলতে হবে।

এসএইচ