পোলিও এক ধরনের ভয়াবহ সংক্রামক। এ ভয়াবহ সংক্রামক ভাইরাসটি যে কোন সময় মহামারী রূপ ধারণ করতে পারে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গোটা বিশ্বকে অবাক হয়ে এ ভয়াবহ মহামারী দেখতে হয়েছে।

এই ভাইরাসের আক্রমণ স্থল নার্ভ এবং মাংসপেশি। বিশেষ করে শিশুরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। বড়রাও বাদ যায় না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্টও পোলিও ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

অনেক গবেষণার পর বিখ্যাত আমেরিকান চিকিৎসক জোনাস সাক এ পোলিও টিকা আবিষ্কার করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৪ সালের সর্ব প্রথম শিশুদের পোলিও টিকা দেওয়া হয়।

সেই থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংঘটনের উদ্যোগে পোলিও মুক্ত বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে পৃথিবী ব্যাপী পোলিও টিকা দেয়া হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা – ডাব্লু এইচ ও এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিল – ইউনিসেফ ২০১৮ নাগাদ পোলিওমুক্ত বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে ছ'বছর মেয়াদী এক নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

পোলিওর প্রার্দুভাব প্রকট এরকম দেশগুলিতে বিশেষ করে – আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ায় পোলিও নিরোধক টিকা সেবনের কার্য্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে এই পরিকল্পনায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে যে পোলিও আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে পঙ্গু হওয়ার সংখ্যা ২০১৩তে সবচেয়ে নীচে নেমে এসে উনিশে দাঁড়িয়েছে। গতবছরে এই সংখ্যা ছিলো ২২৩।

জাতিসংঘের এই দুটি সংস্থা বলছে যে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল মেয়াদকালের এই পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজন হবে সাড়ে পাঁচশো কোটি ডলার – যার মধ্যে দাতা এবং বৈশ্বিক পোলিও নির্মূল কার্য্যক্রমের শরীকরা প্রায় চারশো কোটি ডলারের অঙ্গীকার করেছেন।

বৈশ্বিক পোলিও নির্মূলকরণ উদ্যোগের একজন মুখপত্র সোনা বারি বলেন যে গত দুবছরের অগ্রগতির কারণেই এই পরিকল্পনা তৈরি সম্ভব হয়েছে : ভারত পোলিওমুক্ত হয়েছে। এই দেশটি থেকে পোলিও দূর করা সবচেয়ে কঠিন বলে সবাই বিবেচনা করতেন এবং যে তিনটি দেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি সেসব দেশেও অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।

সোনা বারি বলেন যে আমাদেরকে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। পঁচিশ বছর আগে পোলিও কারণে কমপক্ষে সাড়ে তিনলাখ শিশু পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলো। চলতি বছরে পোলিওতে পঙ্গু হয়েছে উনিশজন।

সোনা বারি বলেন অবশ্য আমাদেরকে এই রোগ নির্মূলের মাধ্যমে সংখ্যাটি শূণ্যে নামিয়ে আনতে হবে। সুতরাং, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে আগামী দুই বছরের মধ্যে এই রোগের ভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ করতে হবে। এরপর পরের তিনবছর বিশ্বের সবজায়গায় আমাদেরকে নজর রাখতে হবে যাতে কোথাও পোলিও না থাকে এবং নিশ্চিত করা যায় যে ভাইরাসটি নিশ্চিহ্ণ হয়েছে।

পোলিও যেকোন বয়সেই সংক্রমিত হতে পারে তবে পাঁচ বছরের কম বয়েসী শিশুদের মধ্যেই এই রোগের বিস্তার ঘটে বেশি।

পোলিও রোগ: ইংরেজিতে Poliovirus (PV)/ Poliomyelitis কে পোলিও রোগ বলা হয়ে থাকে।

এটি Genus Enterovirus রক্তের RNA-তে প্রোটিন বন্ধনী তৈরি করে থাকে।

কিভাবে ছড়ায়: মূলত লালা, হাঁটি-কাশি, ব্যক্তিগত সংস্পর্শে এলে, আক্রান্তের ব্যবহৃত পানির গ্লাস ব্যবহার করলে, আক্রান্তের মল পুকুর, ডোবা বা জলাধারে মিশে গিয়ে, খাবারের মাধ্যমে, অনিরাপদ যৌন মিলন ইত্যাদির মাধ্যমেই পোলিও ভাইরাস ছড়ায় ছড়ায়। এটি মূলত মানবদেহের অন্ত্র এবং গলবিলে অবস্হান করে।

উপসর্গ: আনুমানিক ৯০ শতাংশ রোগীর জটিল কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়না। সাধারণত ৭ হতে ১৪ দিনের মধ্যে সংক্রমণের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

ডা. সাক তাঁর গবেষণায় প্রমাণ করনে, পোলিও মূলত তিন ধরনের poliovirus type 1 (PV1), type 2 (PV2), and type 3 (PV3)।

তিন ধরনের আক্রমণের লক্ষণ:-

১। হালকা সংক্রমণ : জ্বরের মত ভাব, পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি, গলা ব্যথা, গলা বসে যাওয়া, হালকা জ্বর, মাথা ব্যথা

২। মাঝারি সংক্রমণ: আক্রান্তের শতকরা ৪-৮ ভাগ মাথা ব্যথা, জ্বর, বমি, গলা এবং শ্বাসযন্ত্রে সংক্রমণ, ডায়রিয়া, লেথারজি(গা ম্যাজ ম্যাজ করা), মানসিকতার পরিবর্তন, মাংসপেশীতে ব্যথা যেমন পায়ের ডিম, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, পিঠে ব্যথা,পেটে ব্যথা, ক্লান্তি এবং দুর্বলতা অনুভব ইত্যাদি ঘটতে পারে।

৩। ভয়াবহ সংক্রমণ: আক্রান্তদের শতকরা ৩ ভাগের কেন্দ্রীয় স্নায়ু তন্ত্র (Central Nervous System) আক্রান্ত হয়। এটাই পোলিও রোগের সবচেয়ে ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

রোগী শুরুর দিকে মাংসপেশিতে শক্তি না পাওয়া, চলাচলে দুর্বল হয়ে পড়া, স্প্যাসম (ঘাড়, পিঠ, হাত, বা পা) ঘাড় কাত করতে না পারা, ঘাড় সোজা করে না রাখতে পারা, পেট ফুলে যাওয়া,

শ্বাসরুদ্ধ/শ্বাস কষ্ট হওয়া, মুখের মাংসপেশিতে সংকোচন, খাবার গিলতে অসুবিধা, মুখ দিয়ে লালা ঝরা পড়া ইত্যাদি উপসর্গে ভোগে।

পরবর্তীতে আংশিক কিম্বা পরিপূর্ণ ভাবে পক্ষাঘাতের শিকার হয়। এবং অনেকের মেনিনজাইটিস রোগ হতে পরে।

এই Central Nervous System-এ আক্রান্ত রোগীর শতকরা ৭৯ ভাগ Spinal polio, শতকরা ১৯ ভাগ Bulbospinal polio শতকরা ২ ভাগ Bulbar polio নামক অসুখে আক্রান্ত হয়।

যার নিরাময় একেবারেই অসম্ভব।

নির্নয়ঃ রক্তের CSF Analysis পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয়।

প্রতিরোধ: পোলিওর বিরুদ্ধে লড়তে টিকা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। টিকা দু ধরনের। মুখে খাবার এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করতে হয়। মুখে খাওয়ানোর (OPV) এর চেয়ে ইনজেকশন বেশি কার্যকর বিধায় উন্নত দেশগুলোতে পোলিও ইনজেকশন বেশি প্রচলিত।

প্রথম ডোজের ২মাসের মধ্যে ২য়, ৪ মাসে ৩য় , ৬-১৮ মাসে ৪র্থ এবং ৪-৬ বছরের মধ্যে বুষ্টার ডোজ নিয়ে নিজে এবং পরিবারের সবাইকে পোলিও মুক্ত রাখা সম্ভব।

পোলিও দেশে দেশে: গত ৫ বছরে বাংলাদেশে কোন পোলিও রোগী শনাক্ত হয়নি। তবুও বাংলাদেশকে পোলিও মুক্ত দেশ ঘোষণা করা হয়নি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কারণে। বাংলাদেশে পোলিও সংক্রমণের পুরো ঝুঁকি রয়েই গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঘোষণা অনুযায়ী আশপাশের দেশগুলো পোলিও রোগের অবস্থা পরপর ৩ বছর শূন্যের কোঠায় থাকতে হবে। পোলিও মুক্ত হলেই বাংলাদেশও পোলিও নির্মূলের সনদ পাবে। সনদ না পাওয়া পর্যন্ত চলবে পোলিও টিকা দান কর্মসূচি।

আশার কথা বাংলাদেশ পোলিও নির্মূলের ক্ষেত্রে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। দীর্ঘ এক দশক পর আবারও চীনে পোলিও রোগ ধরা পড়েছে । ১৯৯৯ সালের পর গতবছর চীনেও রোগটির অস্তিত্ব ধরা পড়েছে।

পোলিওর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এমন চারটি দেশ হলো আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান (পাকিস্তানে এ রোগ প্রায় মহামারী আকারে এখনো বিদ্যমান) ও নাইজেরিয়া।

পোলিও মুক্ত বিশ্ব গড়তে ইতিমধ্যে কানাডা সরকার, মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, নাইজেরিয়া, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ/দাতা সংস্থা পোলিও মুক্ত কর্মসূচিতে অর্থ সহায়তা প্রদানের জন্য মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সতর্কতা/টিপস: পোলিও ঝুঁকি পূর্ণ দেশে ভ্রমণ করার আগে পোলিওর টিকা দিন। বড়দের জন্যও প্রযোজ্য।

আপনার দায়িত্ব:   একটি প্রতিবেশী শিশুও যাতে বাদ না যায় তা নিশ্চিত করা আপনার সামাজিক এবং মানবিক দায়িত্ব।

দেশকে দক্ষ জন-সম্পদে সমৃদ্ধ করতে হলে শিশুর সুষ্ঠু বৃদ্ধি ও সঠিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর অকালমৃত্যু রোধ করতে।

EPI তথা গুরুত্বপূর্ণ ৬টি টিকা প্রদান নিশ্চিত করতে পারলেই ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, যক্ষ্মা, পোলিও, হাম, হেপাটাইটিস-বি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ার ইত্যাদির মত ভয়াবহ সংক্রমনের হাত থেকে আমাদের শিশুকে সহজেই বাঁচাতে পারি।

সংবিধিবদ্ধ সতর্কতা: বাচ্চা বাঁচান। নবজাত শিশুকে শাল দুধ সহ মাতৃদুগ্ধ পান করান। এটি আপনাকে স্তন-ক্যান্সারের ঝুঁকি থেকে বাঁচাবে। নির্দিষ্ট সময়ে ৬টি টিকা দিন। তা না হলে চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসেবা জনগণের কাছে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। (তথ্য সূত্র: ইন্টারনেট।)

এমকে