১৯৭১ সালের এ মাসে হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে পাকিস্তানি শাসকদের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিল মহান বিজয়।  একাত্তরের ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের সূচনা হয়। আর বিজয়ের ক্ষণটি আসে ১৬ ডিসেম্বর। এজন্য সরকারিভাবে ১ ডিসেম্বরকে মুক্তিযোদ্ধা দিবস হিসেবে পালনের দাবি জানাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধারা।

মুক্তিযুদ্ধা- ১৯৭১ সালে যাঁরা অস্ত্র হাতে সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন কেবল তাঁদেরই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয় তা নয়। সেই সঙ্গে অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রী, সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ত্রাণ বিতরণসহ যাঁরা বিভিন্ন সেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছেন তারা, কোলকাতায় স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পরিচালকমণ্ডলী, সাংবাদিক, ভাষ্যকার ও শিল্পী, প্রমুখকেও মুক্তিযোদ্ধা হিসাব তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে যারা অস্ত্র হাতে মাঠ পর্যায়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন তাদের ৪ ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে।

প্রথমত: তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর নিয়মিত সদস্যবৃন্দ। এরা আগে থেকেই অস্ত্র ব্যবহারে এমনকী সম্মুখ সমরাভিযানে প্রশিক্ষিত ছিলেন। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এরা পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এদের অধিকাংশই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ‘নিয়মিত বাহিনী’র সদস্য ছিলেন।

দ্বিতীয়ত: সাধারণ মানুষ যাঁরা বাংলাদশে ত্যাগ করে ভারতে গিয়েছিলেন এবং ভারতের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অস্ত্রচালনা, বিস্ফোরকদ্রব্যের ব্যবহার ও গেরিলাযুদ্ধের কলাকৌশলে প্রশিক্ষণ লাভের পর দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সেগুলো ব্যবহার করেছিলেন। সংখ্যাই এরাই সর্বার্ধিক। এদের বলা হতো ‘গণবাহিনী’। সামরিক প্রশিক্ষণের পরই এদের হাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেয়া হয়েছিল। এদের মধ্যে ছিলেন কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র সহ সমাজের নানা স্তরের মানুষ।

তৃতীয়ত: টাঙ্গাইলের বঙ্গবীর আব্দুল কাদেরর সিদ্দীকীর (বীর উত্তম) নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া বাহিনীর লোকজন। এদের অধিকাংশই প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যাননি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ল্যান্স নায়েক কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে দেশের ভেতরই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।

চতুর্থত: কেবল ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নতুনভাবে ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, কিন্তু দেশাভ্যন্তরে না-ফিরে বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত এলাকায় যুদ্ধ করেছেন। এদের পৃথকভাবে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মুজিব বাহিনী’।

মুক্তিযুদ্ধ- ১৯৭১ সালে সংঘটিত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্র আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে।

২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহি ঢাকায় সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ হত্যা করে এবং গ্রেফতার করা হয় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দলের প্রধান বাঙ্গালীর তৎকালীন জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

পরিকল্পিত গণহত্যার মুখে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধযুদ্ধ।জীবন বাঁচাতে প্রায় ১ কোটি মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, সামরিক বাহিনীর বাঙ্গালী সদস্য এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ দেশকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কাজ থেকে মুক্ত করতে গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী।

৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের শেষে বিজয় আসে ১৬ ডিসেম্বরে। এজন্যই প্রতিবছর ডিসেম্বরকে পালন করা হয় বিজয়ের মাস হিসেবে। এ মাসে পুরো বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর সন্তানদের।

তার পরই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয়মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ীমুক্তিযুদ্ধের শেষে বিজয় আসে ১৬ ডিসেম্বরে। এদিনই  ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান ৯৩,০০০ হাজার সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙ্গালী জাতির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

এজন্যই প্রতিবছর ডিসেম্বরকে পালন করা হয় বিজয়ের মাস হিসেবে। এ মাসে পুরো বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর সন্তানদের।

মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বাসী সব রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগে ১ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকাসহ সব জেলা ও উপজেলায় 'মুক্তিযোদ্ধা দিবস' পালিত হয়।

মুক্তিযোদ্ধা দিবস উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি বাস্তবায়ন ও মুক্তিযোদ্ধা দিবস উদযাপন জাতীয় কমিটি কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

কিন্তু যে উদ্দেশ্যে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলো এরকি বাস্তবায়ন হয়েছে?  আজও প্রতিদিনই দেখাযায় দেশের রাস্তা-ঘাটে, নদী-নালায় পরেথাকে লাশ। ধর্ষণ হচ্ছে নারী-শিশু। দেশে দূর্বলের প্রতি সবলের হিংস্র থাবা।

এমবি