১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ সমগ্র বাংলাদেশে একযোগে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ভোরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে নিজ হাতে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। ঢাকার প্রতিটি দূতাবাসেও এদিন পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে উত্তোলন করা হয় বাংলাদেশের পতাকা। দু-একটি দূতাবাসে ভোরে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করা হলেও সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো যে হোটেলে অবস্থান করছিলেন সেই হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেও উত্তোলিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত লাল-সবুজ পতাকা। এছাড়া হাইকোর্ট, বিচারপতিদের বাসভবন, সচিবালয়, রেডিও, টেলিভিশন এবং সব বিদেশী মিশনসহ সব স্থানেই উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশে দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও মহকুমা শহরেও স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করা হয় এদিন। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পরামর্শে ইকবাল হলের ছাত্র শিবনারায়ণ দাস কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত একটি পতাকা তৈরি করেন। তার তৈরি এই পতাকাটিই সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়।

এদিন এটি জয় বাংলা বাহিনীর প্রধান কামরুল আলম খান খসরু (পরবর্তী সময়ে ওরা ১১ জন সিনেমার নায়ক) পল্টন ময়দানের লক্ষ-জনতার সমাবেশে নিয়ে আসেন। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা আসম আবদুর রব, আবদুল কদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাহজাহান সিরাজ। সকালে জয় বাংলা বাহিনী মার্চপাস্ট করে পল্টনে এসে বাহিনীর উপ-প্রধান হাসানুল হক ইনু (বর্তমানে জাসদ সভাপতি ও এমপি) পতাকা উত্তোলন করে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের অভিবাদন জানান।

এ সময় মাইকে জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাজানো হয়। পরে আসম আবদুর রব মঞ্চের নিচ থেকে পতাকাটি তুলে এনে মঞ্চের এক কোনায় স্থাপন করেন। সভা শেষে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে জয় বাংলা বাহিনী সশস্ত্র কুচকাওয়াজ করে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে এসে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ণ সামরিক কায়দায় গার্ড অব অনার জানায়। বঙ্গবন্ধুও গার্ড পরিদর্শন করেন এবং সালাম গ্রহণ করেন। এরপর বঙ্গবন্ধুর হাতে পতাকাটি তুলে দেন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী। এ ঐতিহাসিক দৃশ্য দেখার জন্য হাজার হাজার সংগ্রামী মানুষ ভিড় জমায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে। সারাদিনই হাজার হাজার মানুষ এখানে অবস্থান করেন। আন্দোলন-সংগ্রামের নতুন দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ বিকালে বায়তুল মোকাররম এলাকায়, মওলানা ভাসানী পল্টন ময়দানে ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে পৃথক সমাবেশ করে। এসব সমাবেশ থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সব কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে সবাইকে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়।

এদিকে পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদ আজকের দিনে চট্টগ্রামের জেএম সেন হলে একটি বিরাট মহিলা সমাবেশ করে। এতে সংগঠনের সভানেত্রী বেগম সুফিয়া কামাল ও সাধারণ সম্পাদিকা মালেকা বেগম, হান্নান বেগম, কুন্ত প্রভাসেন, সীমা চক্রবর্তী, মুস্তারী শফি, শিরিন শফিউল্লাহ প্রমুখ নেত্রী বক্তৃতা করেন। মহিলা পরিষদের নেত্রীরা নারীর অবগুণ্ঠন ভেঙে বেরিয়ে এসে স্বাধীনতায় ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এখন আর চুপ করে ঘরে বসে থাকার সময় নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতা ঘোষণা করে গেরিলা যুদ্ধের কৌশলও বলে দিয়েছেন। তাই সবাইকে এখন ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে শত্র“র মোকাবেলা করতে হবে। অন্যদিকে এদিনে টঙ্গী, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতা ও শ্রমিকদের মিছিলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নির্বিচার গুলি চালায়। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গুলিতে বহু বাঙালি হতাহত হন। এই খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করা লাখ লাখ টগবগে তরুণ প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আক্ষরিক অর্থেই তখন সমগ্র বাংলাদেশ পাকিস্তানের সামরিক শাসনের আওতার বাইরে চলে যায়।

এআইজে