বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তন, গ্রীন হাউস ইফেক্ট, ওজোন স্তরের ক্ষয়, বরফ গলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মরুকরণ, খরা ও বনাঞ্চলের পরিমাণ হ্রাসসহ বিভিন্ন কারণে মানুষ আজ মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে আগামী ৪০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে দেশের উপকূলীয় দ্বীপ জেলা ভোলা ও কক্সবাজারের কুতুবদিয়া পুরোপুরি সাগর গর্ভে বিলিন হয়ে যাবার আশঙ্কা রয়েছে।
সমুদ্র পৃষ্টের উচ্চতা ১০০ সে. মি. বাড়লে পানির নিচে তলিয়ে যাবে ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ উপকূলীয় অঞ্চল, পরিবেশ শরণার্থী হবে দু’কোটি মানুষ। শতকরা ২৯ শতাংশ নিচু এলাকা বন্যার ঝুঁকি বাড়বে।
সাম্প্রতিককালে মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, প্রতিবছর সিডর ও আইলার মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বন্যার প্রকোপ, মরুকরণ এসব আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে ভবিষ্যতের ভয়াবহ পরিণামের কথা। ঢাকার বাতাস আজ বিশ্বের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষিত।
গত দুই দশকে নদীমাতৃক এই দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নদী আজ মৃতপ্রায়। বিলীন হয়ে গেছে অনেক নদী।যে কয়েকটি নদীর অস্তিত্ব আছে তা ভূমিদস্যুদের দখলবাজিতে নদী থেকে রূপান্তরিত হয়েছে খালে।কলকারখানার বর্জ্য পতিত হয়ে দূষিত হয়েছে নদীর পানি।
পানি দূষণ, শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণে হুমকির মুখে মানব স্বাস্থ্য। দূষণ রোধে বিভিন্ন সময়ে নেয়া পদক্ষেপ মেনে না চলায় প্রতিনিয়ত পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস।
UNEP (United Nations Environment Program) বা জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির উদ্যোগে প্রতিবছর এ দিবসটি পালিত হয়।মানুষের মধ্যে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিই এর উদ্দেশ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের বাংলা প্রতিপাদ্য: 'শত কোটি জনের অপার স্বপ্ন, একটি বিশ্ব, করি না নিঃস্ব'।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্মিলিত কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে সর্বপ্রথম বৃহৎ আকারে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে পরিবেশ সংক্রান্ত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়। অক্টোবরে ২৭তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ স্টকহোম সম্মেলনের প্রস্তাব অনুযায়ী জাতিসংঘ পরিবেশ পরিকল্পনা কার্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। এখান থেকেই ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সম্মেলনের শুরুর দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই জাতিসংঘ ৫ জুনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। প্রথম বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি পালন করা হয় ১৯৭৩ সালে। এরপর থেকে প্রতিবছরের ৫ জুন তারিখে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয়।
বাংলাদেশেও বিশ্ব পরিবেশ দিবস নানা ভাবে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে জাতিসংঘের মানব পরিবেশের উপর সম্মেলনের পর পরই বাংলাদেশে পরিবেশ সংক্রান্ত কার্যক্রম প্রথম গ্রহণ করা হয়। এসময় পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পানি দূষণ নিয়স্ত্রণ অধ্যাদেশ, ১৯৭৩ জারি এবং পানি দূষণ নিয়স্ত্রণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সামগ্রিক পরিবেশকে বিবেচনা করে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের কাজ হাতে নিয়ে একটি পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ সেল গঠন করা হয়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস কমিটির সুপারিশক্রমে উপরোক্ত সেল ও প্রকল্পকে একীভূত করা হয়।
১৯৮৫ সালে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গঠন করা হয়। ১৯৮৯ সালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় নামে আলাদা মন্ত্রণালয় সৃষ্টি হয়। একজন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে অধিদপ্তরটি নতুন নামকরণ হয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর গঠিত হয় এবং ১৯৯৫ সালে তৈরি পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে লাভ করে।
জাতীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা অনুসরণে তৈরী হয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫। স্বল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রণীত খাতওয়ারী বিভিন্ন সেক্টরভিত্তিক নীতিমালা জাতীয় পরিবেশ নীতি ও নেমাপ-এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
নেমাপ এর বিস্তৃত কার্যকলাপ শিল্প, পানি সম্পদ, জ্বালানি, বন, ভূমি সম্পদ, মৎস্য ও পশু সম্পদ, কৃষি আবাসন ও নগরায়ন, স্বাস্থ্য পয়ঃনিস্কাশন ও দূষণ, শিক্ষা ও সচেতনতা এবং পরিবহন ও যোগাযোগ মোট ১১টি সেক্টরে বিভক্ত। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জাতীয় পরিবেশ নীতি ১৯৯২ এবং ১৯৯৫ সালে প্রণীত নেমাপ তাই একটি বৃহৎ আন্তঃখাতভূক্ত ও কার্যসিদ্ধিমূলক বাস্তবানুগ কার্যকলাপ।
কেবলমাত্র কিছু মৌলিক গবেষণা, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কার্যক্রম ব্যতীত পরিবেশ অধিদপ্তরের বেশির ভাগ কার্যকলাপের ধরণ হচ্ছে নিয়ন্ত্রণমূলক। পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রমের আইনগত ভিত্তির যথেষ্ঠতা নিশ্চিতকরণে ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষ বিধিমালা, শিল্প ক্ষেত্রে ইআইএ নির্দেশিকা ১৯৯৭, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধন) ২০০০ এবং ২০০২, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা (সংশোধন) ২০০০ ও ২০০২ এবং পরিবেশ আদালত আইন ২০০০ ও পরিবেশ আদালত আইন (সংশোধন) ২০০২ প্রণীত হয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। তাই আমাদের পরিবেশ রক্ষার দায় আমাদেরই।আমাদের পরিবেশ বাঁচলে আমরা বাঁচবো। বাঁচবে আমাদের এই ভূখন্ডটি। প্রিয় এই দেশ, এই ধরিত্রীকে যে করেই হোক বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
আগামীর অনাগত উত্তরাধীকারীদের জন্য গড়ে দিয়ে যেতে হবে স্বপ্নের মতো সুন্দর এবং নিরাপদ একটি পৃথিবী। তাই আজ আসুন। আমরা নিজেদের জন্যই পরিবেশকে রক্ষা করি।তথাকথিত উন্নয়ন এবং পরিবেশের সংঘাতে জয় হোক পরিবেশের। ‘সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা’ স্বপ্নের মতো সুন্দর একটি বাংলাদেশ আমাদের একান্ত কাম্য।
এআর/কেএইচ





