২০ দলীয় জোটের নেতৃত্বে থাকা দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল আর দুদিন পরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।এই কাউন্সিলকে ঘিরে বারবার অনিশ্চয়তা আর সরকারের নিয়মহীন সংস্কৃতির শঙ্কায় ছিল নেতাকর্মীরা।

অবশেষে দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে আগামী ১৯ মার্চ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে।দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাহিরে থাকা দলটি ১০ বছরের নিপিড়ণে জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার।

বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের অগনতান্ত্রিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী অধিকাংশের বিশ্বাস এই কাউন্সিল হবে বিরোধী মতের নির্যাতিত-নিষ্পেশিত মানুষের মুক্তির এক নতুন সোপান এবং গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন বিনির্মানের দৃপ্ত অঙ্গীকার।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন বর্তমান গণতন্ত্রহীনতা ও বিশৃঙ্খলা কাটাতে একমাত্র ভরসা হতে পারে বিএনপি। 
তারপরেও সচেতন নাগরিকদের মনে রয়েছে প্রশ্নের দোলা- বিএনপি কী পারবে অগনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যাবস্থায় গনতন্ত্রের বীজ রোপন করতে? পাহাড়সম প্রতিকুল আবহাওয়াপূর্ণ বৈরী পরিবেশে বিএনপি কি পারবে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উর্দ্ধে উঠে রাষ্ট্রের নাগরিকদের আবেগ-অনুভূতির মূল্য দিতে?

রাষ্ট্রকে নৈতিক ও যৌক্তিক ভিত্তিতে গড়ে তুলতে তাদের কি কোনো মাস্টার প্লান রয়েছে? 
জেল জুলুম ও হত্যা-গুম-নির্যাতনের স্বীকার লক্ষ লক্ষ কর্মী সমর্থক ও তাদের পরিবার ১৯ মার্চের ষষ্ঠ কাউন্সিলে দলটির নীতিনির্ধারকদের দিকে তাকিয়ে আছে। এখন বিএনপি কি করবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

অন্যদিকে 'বিএনপির বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামের ব্যার্থতা ও রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি হীন' কর্মকান্ডের জন্য ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী এমপিরা প্রতিনিয়ত উপহাস-অবান্তর মূলক কথা বলে এক শ্রেনীর দর্শকদের মনোরঞ্জনের খোরাক জোগাচ্ছেন বলে মনে করছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

পাঠকদের জ্ঞাতার্থে বিএনপির কাউন্সিল ও রাজনীতির ভাষা নিয়ে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী- এমপির বক্তব্য নিন্মে উল্লেখ করছি; গত ১৫ মার্চ ২০১৬ দৈনিক ইত্তেফাক একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে যেখানে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বিএনপির কাউন্সিল প্রসঙ্গে বলেছেন, তাদের কাউন্সিল মানেই নতুন বোতলে পুরাতন মদ ঢুকানো।’ একই পত্রিকায় গত ৬ মার্চ ২০১৬ অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের নামে বিএনপির কাউন্সিল একটা তামাশা বলে মন্তব্য করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। 
আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, তেলাপোকাও একটা পাখি আর বিএনপিও একটি দল, তার আবার কাউন্সিল, এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছুই নেই। ০৫ মার্চ ২০১৬ দৈনিক আমারদেশ পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে এই নিউজটি প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে জনাব হানিফ বিএনপিকে একটি তেলাপোকার সাথে তুলনা করেছেন।

১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৬ দৈনিক নয়া দিগন্তে খাদ্যমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছ 'প্রয়োজনে খালেদা ও তারেককে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে বিএনপি পুনর্গঠন করতে হবে'। 

নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউন গত ৬ ফেব্রুয়ারী একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যেখানে তথাকথিত আসল বিএনপির দাবীদার কামরুল হাসান নাসিম বলেন, ১৯ মার্চ ’নকল’ বিএনপির কাউন্সিল প্রতিহত করা হবে।
আমাদের সময় ডটকম গত ১৬ মার্চ লিখেছে, রিজার্ভ চুরির টাকা বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান পেয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।
এর আগে গত ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামীলীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বিএনপিতে আবারো দুই আসামী নির্বাচিত হলো; যার একজন হলো এতিমের টাকা আত্মসাতকারী আর একজন গ্রেনেড মামলার আসামী। যা ফলাও করে ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়।
অপরদিকে সরকারের চাপ অথবা রাজনৈতিক কৌশলগত কারনে দেশের কতিপয় প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া প্রতিনিয়ত জাতির সামনে বিএনপিকে নিয়ে হেয় ও কটুক্তিকর ভাবে উপস্থাপন করছে। দোষারোপ করছে একতরফা ভাবে।

যেমন দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকাটি ১৫ মার্চ নেতাকর্মীদের পদচারনায় মুখরিত শীর্ষক শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। যার ইন্ট্রুতে (সূচনা) উল্লেখ করেছে 'অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মূলধারার রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এতোদিন ছিল ফাঁকা। কিন্ত ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে কার্যালয়টি আবার চাঁদের হাটে পরিনত হয়েছে। একই তারিখে বাংলানিউজ টোয়িন্টিফোর ডটকম বিএনপির কার্যালয় এখন চাঁদের হাট শিরোনামে একটি নিউজ প্রকাশ করে। 
প্রথমত সংশ্লিষ্ট নিউজে বিএনপির কার্যালয় মুখরিত শিরোনাম দিয়ে পাঠককে আকৃষ্ট করা হয়েছে তারপর নিউজের ইন্ট্রুতে মুলধারার রাজনীতি থেকে ছিটকে যাওয়া বলে বিএনপিকে গালি দেওয়া হয়েছে। যা সাধারন মানুষের চোখে সহজে ধরা পড়বেনা। এভাবেই ১০টি বছর ধরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তথ্য সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিএনপি এবং বিরোধী মতের রাজনৈতিক দলগুলোকে এভাবেই কবর দেয়া হচ্ছে বলে মনে করেন দেশের চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবিরা। 
উপরে কিছু তথ্যবহুল বক্তব্য উল্লেখ করলাম এ কারনে যে, আমাদের দেশের রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহু আগেই বিদায় নিয়েছে। রাজনীতিতে এখন এক টেবিলে দুই মেরুর কাউকে দেখা দুস্কর। আদৌও বাঙ্গালী জাতি এ অবস্থা থেকে আর কখনো উত্তরন পাবে কিনা সেটা নিয়ে পর্যবেক্ষক মহলে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

যদিও একটি শক্তিশালী গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যাবস্থায় একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল আচারন রাজনীতির অপরিহার্য প্রতিরুপ।

এক্ষেত্রে আমরা মালেশিয়াকে উদাহরন হিসেবে টানতে পারি। তাদের রাষ্ট্র ব্যাবস্থায় ক্ষমতায় যেই সরকারই আসুক দেশের কল্যানের জন্য কাজ করতে হবে এটা তাদের জনগনের কাছে কমিটমেন্ট।

এজন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে মনে করতে হবে শুধু গতানুগতিক বক্তৃতা, সমালোচনা আর গীত-সঙ্গীতে রাষ্ট্র রক্ষা হবে না। এজন্য শুধু দলীয় নেতাকর্মী নয় ষোল কোটি চোখকে স্বপ্ন দেখাতে হবে। নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাসযোগ্য সবুজ ভুখন্ডের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

ইন্টারন্টে ও সোস্যাল মিডিয়ার কল্যানে রাষ্ট্রের অধিকাংশ নাগরিকই আজ নিজেদের সম্পর্কে সচেতন।তারা চায় দেশে আইনের শাষন প্রতিষ্ঠিত হোক। এজন্য প্রজাতন্ত্রের নাগরিকদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। পাশাপাশি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার রূপরেখা জানাতে হবে তাদের।

ভোটের আগে কিছু কিছু রাজনৈতিক নেতা কম বেশী মানুষকে ধোকা দিয়ে থাকেন যেমন কেউ কেউ বলে থাকেন, আমাকে নির্বাচিত করলে আমরা এটা দেবো, সেটা দেবো। এটা করবো না, ওটা করবো, ইত্যাদি কথা। কিন্তু এসব ভাষণের দিন এখন শেষ। এখন মানুষ জানতে চায়, আপনি কি করবেন, কিভাবে করবেন?

আপনার জ্ঞান-বিজ্ঞানের অবকাঠামো আছে কি-না। ভাষণে ব্যাংক চুরির ইতিহাস শোনাবেন, কিন্তু চুরি ও দুর্নীতি ঠেকানোর ভবিষ্যত কৌশল প্রকাশ করবেন না। সেই ভাষণ বিবেচিত হবে আষাঢ়ে গল্প হিসেবে।

পুরোনো ইতিহাসকে গুছিয়ে ছোট করে বলুন, নতুন পরিকল্পনা ও স্বপ্নকে পেশ করুন বড় পরিসরে। এতে দলীয় কর্মীরাও উৎসাহিত হবেন, প্রভাবিত হবেন সাধারণ নাগরিক। আসন্ন কাউন্সিলে বিএনপি নেতৃত্বকে ভবিষ্যত রাষ্ট্র বিনির্মাণের সুচিন্তিত পরিকল্পনা পেশ করতে হবে – এটা সময়ের দাবি।

বিএনপিকে যেভাবে দল হিসেবে গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী হতে হবে, তেমনি দলনেতাকে হয়ে উঠতে হবে ‘দলনায়ক' ।

সেটা শুধু দলের ভেতরে নয়; নাগরিকদের কাছেও স্বীকৃত হতে হবে। যদিও ‘দলনেতা‘ধারণা নিয়ে বিএনপির বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ। সেটা শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে তৃনমূল সর্বত্রই দৃশ্যমান।

চেইন অব কমান্ডে যেমন ঘাটতি আছে, তেমনি নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার নামে পারস্পরিক আস্থার অভাব দলটিকে দূর্বল করছে। এরপর নানা অপপ্রচার ও চক্রান্তে দলটি এখন পর্যুদস্ত।

ধরুন, বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হচ্ছে। গণমাধ্যধ্যমের তথ্যমতে, দলের ভেতরে কিছু দুস্কৃতিকারী গুঞ্জন ছড়িয়েছে – সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে বসে নতুন কমিটির রূপরেখা চুড়ান্ত করছেন। তালিকা প্রায় চুড়ান্ত। কি হাস্যকর প্রচারণা! চেয়ারপার্সনের নেতৃত্বে সব নেতারা কাজ করছেন বাংলাদেশে। আর কমিটি হবে লন্ডনে!

একটি রাজনৈতিক দলের উপরিভাগে দ্বৈত নেতৃত্বের প্রচারণা চালিয়ে কিছু অস্বচ্ছ ও অশিক্ষিত চামচা যখন সুবিধা লুটতে সক্ষম হন, তখন দলীয় কাটামো দূর্বল হয়ে পড়ে। শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যারা দলের পিলার হিসেবে কাজ করেন, সেইসব সিনিয়র নেতারাও অসহায় বোধ করেন।

তখন দলে সংকট বাড়তে থাকে। এই অবস্থা কাটিয়ে ‘দলনেতার ধারণা বিএনপিতে প্রতিষ্ঠিত করা খুবই জরুরী। চেয়ারপার্সন, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পার্টির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সবকিছু চুড়ান্ত করবেন, এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলেও শৃঙ্খলা বিদ্যমান থাকে। চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হবে পার্টিতে। অন্যথায় পার্টি ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকবে।

আসন্ন কাউন্সিলে দলীয় কাঠামো ও দলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিএনপি জনগণের ভরসার দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করুক। জাতিকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অথনৈতিক বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটিয়ে গনতান্ত্রিক স্বপ্ন বিনির্মান করতে অগ্রনী ভূমিকা রাখুক, সেই প্রত্যাশা করি।

এসটি