কাশ্মিরকে সবসময়ই নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ দাবি করে আসছে ভারত। এমনকি পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ-কাশ্মিরকেও নিজের অংশ দাবি করে পাকিস্তানকে অবৈধ দখলদার আখ্যা দিয়ে আসছে দেশটি। অপরদিকে, পাকিস্তানের পাল্টা অভিযোগ ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরে গণহত্যা ও নৃশংসতা চালিয়ে আসছে ভারত। দুই দেশের এমন দোষা-দোষীর যাতাকালে ক্রমেই স্তিমিত হচ্ছে কাশ্মিরের জনগণের প্রাণের দাবি –স্বাধীন কাশ্মির, দীর্ঘায়িত হচ্ছে রক্তাক্ত ইতিহাস।

বৃহস্পতিবার (২৩ মার্চ ২০১৭) ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাই-কমিশনার আব্দুল বাসেতের মন্তব্য, তার আগে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির বক্তব্য এবং চলতি মাসের গোড়ার দিকে জাতিসংঘে ভারতের নালিশের পটভূমিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারো কাশ্মির ইস্যুটি আলোচনায় উঠে আসে। কিন্তু কাশ্মির সমস্যার সমাধানে সেখানে গণভোট বা কার্যকর কোন পদক্ষেপের প্রতি সামান্যতমো নজর দিচ্ছে না দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের সবকধারী পশ্চিমা বিশ্ব।

বৃহস্পতিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীতে পাকিস্তান দিবসের এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের হাই-কমিশনার বলেন, অবশ্যই জম্মু ও কাশ্মিরের জনগণই ঠিক করবে তারা ভারতের সঙ্গে থাকবে নাকি স্বাধীন হবে। পাকিস্তানী হাই-কমিশনার একই সাথে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনে তার দেশ শতভাগ আন্তরিক বলেও দাবি করেন।

বাসিত আরো বলেন, পাকিস্তান সবসময়ই তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলার নীতিতে বিশ্বাস করে এবং ভারতের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন সময় কাশ্মির ইস্যুতে বক্তব্য দিয়ে আলোচিত এই কুটনীতিক ভারতের সাথে কাশ্মির ইস্যুসহ সব বিরোধপূর্ণ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের ব্যাপারেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন ।

এদিকে, বৃহস্পতিবারের মন্তব্যের সময়ও বাসেত তার স্বভাবসুলভ অবস্থান থেকে সরে আসেননি। ওইদিনও এই কুটনীতিক বলেন, জম্মু-কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদিদের তার দেশ সমর্থন করে। কারণ তারা স্বাধীনতার দাবিতে সংগ্রাম করছেন। শিগগিরই মহান আল্লাহর করুণায় কাশ্মিরের জনগণ তাদের কাঙ্খিত স্বাধীনতা লাভ করতে সক্ষম হবেন বলেনও মন্তব্য করেন এই পাক রাষ্ট্রদূত।

এদিকে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি মামনুন হুসাইনও ভারতের সাথে আলোচনায় বসার ওপর গুরুত্বারোপ করে বক্তব্য দেন বৃহস্পতিবার। পাকিস্তানের জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে দেশটির সামরিক বাহিনীর প্যারেড অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, কাশ্মিরসহ সব ইস্যুতেই ভারতের সাথে আলোচনায় বসতে তার দেশ প্রস্তুত।

তবে, চলতি মাসের গোড়ার দিকে জাতিসংঘে উত্থাপিত এক দাবিতে ভারত পরিস্কার ভাষায় জানিয়ে দেয় জম্মু-কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাকিস্তান অবৈধভাবে কাশ্মিরের কিছু অঞ্চল দখল করে রেখেছে। সীমান্ত সন্ত্রাসই কাশ্মিরের প্রধান সমস্যা বলেও জাতিসংঘে উত্থাপিত অভিযোগে দাবি করে ভারত।

কিন্তু ভারতের ব্যাপারে এর থেকেও ভয়াবহ অভিযোগ করে আসছে পাকিস্তান বহু বছর ধরে। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সাধারণ মানুষের ওপর দশকের পর দশক ধরে চালানো ভারতীয় বাহিনীর জুলুম-নির্যাতনের তথ্য-উপাত্ত জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে বিগত ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর হস্তান্তর করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের কাছে এই দলীল হস্তান্তর করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।

ওই সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর সীমাহীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবকে ব্রিফ করেন বলেও জানা যায়। তিনি ভারতীয় নির্মমতার যাতাকলে কিভাবে কাশ্মীরের মানুষ প্রতিনিয়ত নিস্পেষিত হচ্ছেন তার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। বিশেষ করে গত ৮ই জুলাই (২০১৬) কাশ্মীরের হিজবুল মুজাহিদীন কমান্ডার ও কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলনের তরুণ স্বপ্নদ্রষ্টা বুরহান ওয়ানিকে হত্যার পর সৃষ্ট গণআন্দোলন ঠেকাতে ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষীরা কাশ্মীরে কার্ফু জারি ও হত্যাযজ্ঞসহ যে বর্বরতা চালায় তা তুলে ধরেন নওয়াজ শরীফ।

জাতিসংঘ মহাসচিবকে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ঐদিন আরো বলেন, গত ৭৪ দিনে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে একশোরও বেশি মানুষ নিহত হন এবং আহত হন আরো কয়েক হাজার। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মানসিকতা যে কতটা বর্বর তা বোঝা যায় তাদের পেলেট বন্দুক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যার ফলে নারী ও শিশুসহ কাশ্মীরের শত শত মানুষ অন্ধ হয়ে যান সম্প্রতি।

উল্লেখ্য, কাশ্মীরে বিক্ষোভ মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনী পেলেট বন্দুক ব্যবহার করছে যা থেকে ছররা বুলেট বের হয় শয়ে শয়ে। এই ছররা বুলেটে মৃত্যু হয় না। কিন্তু সারা গায়ে ক্ষত তৈরি হয়। শরীরের অন্য অংশের ক্ষত সামাল দেওয়া গেলেও চোখের ক্ষেত্রে মারাত্মক হয়ে উঠছে পেলেট বন্দুক।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে গত ১৪ই জুলাই (২০১৬) দৈনিক ইনকিলাবে “পেলেট বন্দুকের দাপটে দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছে কাশ্মীরী তরুণরা”-এই শীরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়: “গত বছরের (২০১৫) হিসেব অনুযায়ী অন্তত ৭০০ মানুষের চোখ নষ্ট হয়ে গেছে এই পেলেট বন্দুকের জেরে। কারো কারো ক্ষেত্রে দুটি চোখই। এবারেও বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে পেলেট বন্দুক যার জেরে চোখে গুরুতর আঘাত নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বহু মানুষ। শুধুমাত্র মহারাজা হরি সিং হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন শতাধিক মানুষ। যাঁদের চোখে পেলেট বন্দুকের জেরে আঘাত লেগেছে।”

জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে নওয়াজ আরো অভিযোগ করেন, ভারত ক্রমাগত কাশ্মীরে তার দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে চলছে। একদিকে কাশ্মীরের নেতৃস্থানীয়দের কারাগারে আটক রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে আহতদের এমনকি পেলেট বুলেটের আঘাতে আহত ও অন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে বাঁধা সৃষ্টি করছে ভারত।

ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের জনগণের ওপর পেলেট বন্দুক চালানোর ফলে সেখানে নারী ও শিশুসহ মানুষ কিভাবে আহত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন তার বেশ কিছু ছবিও জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে হস্তান্তর করেন নওয়াজ শরীফ। এসব ছবি দেখে জাতিসংঘ মহাসচিব দু:খ প্রকাশ করেন।

নওয়াজ শরীফ দাবি করেন, কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলে গৃহিত রেজ্যুলেশন ভারতকে অবশ্যই মানতে হবে। তিনি আবারও কাশ্মীরে ভারতের বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন এবং এই উদ্দেশ্যে সেখানে জাতিসংঘের অধীন ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন (fact-finding mission) পাঠানোরও দাবি করেন।

কিন্তু পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে জাতিসংঘের কোন পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অপরদিকে, কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত বরাবরই কোন আলোচনা বা সমঝোতামূলক উদ্যোগকে এড়িয়ে চলছে। সবসময়ই দেশটি সেখানে দমন-পীড়ন নীতি প্রয়োগ করে আসছে।

গত ১৭ই আগস্ট (২০১৬) বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত-শাসিত কাশ্মীরে গত প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলা সহিংসতার পটভূমিতে ভারতকে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে আলোচনার যে প্রস্তাব দিয়েছিল পাকিস্তান, দিল্লি তা কার্যত নাকচ করে দিয়েছে। দিল্লিতে সরকারি সূত্রগুলো বিবিসিকে জানিয়েছে, পাকিস্তানের প্রস্তাব ছিল ‘আলোচনা হোক শুধু কাশ্মীর নিয়ে’। কিন্তু পাল্টা জবাবে ভারত বলেছে এই মুহূর্তে মূল আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত শুধুই ‘সন্ত্রাসবাদ’।

আর এভাবেই দিনের পর দিন ভারতের একতরফা চলো নীতির ফলে কাশ্মীরের রক্তাক্ত ইতিহাস ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী শুধুমাত্র ১৯৯৯ সাল থেকেই এই উপত্যকায় ৪০ হাজারেরও বেশি প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে যাদের বেশিরভাগই সাধারণ জনগণ। বর্তমানে এই ছোট্ট অঞ্চলটিকে নিয়ন্ত্রন করতে সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে চার লাখ ভারতীয় সেনা সদস্য।

কাশ্মীর ইস্যুকে মানবিকভাবে গ্রহণ করে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসলেই হয়তোবা সেখানে চলমান কয়েক দশকের রক্তাক্ত ইতিহাস বন্ধ হবে। ভারতীয় বাহিনী সেখানে মুসলমানদের হত্যা করছে বিষয়টি এভাবে বিবেচনা না করে কাশ্মীরের মুসলমানরাও মানুষ, তাদেরও মানবিক অধিকার রয়েছে সেই উপলব্ধি আসতে হবে। আন্তর্জাতিক মহলকে সত্যিকার অর্থে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু আদৌ সেটা বাস্তবে রুপ লাভ করবে কীনা তা আগামীর ভবিষ্যতই বলে দিবে।

কেবি