বিগত কয়েক শতাব্দি ধরে বাংলাদেশে ওয়াকফকৃত প্রায় আড়াই লক্ষ ওয়াকফ সম্পত্তির মধ্যে দুই লক্ষের অধিক সম্পত্তির খোঁজ জানে না ওয়াকফ প্রশাসন।

এর মধ্যে অনেক ওয়াকফ স্টেটের খোঁজ জানলেও প্রশাসনের জনবল সংকট, কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দূর্নীতি ও ওয়াকফের কাজে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের প্রভাব বিস্তারের কারণে স্টেটগুলো উদ্ধার করা যাচ্ছে না।

দেশের বেশির ভাগ ওয়াকফ স্টেটগুলো সর্বনিম্ন এক শতাব্দি আগে ওয়াকফ হওয়া, পুরাতন দলিলের হিসেবে সম্পত্তির অবস্থান নির্ণয়ে সমস্যা, যিনি ওয়াকফ করেছেন তার মৃত্যুর পর ওয়ারিশগণ সম্পত্তি নিজেদের নামে রেকর্ড করিয়ে নেয়া ও বিক্রি করে দেয়া এবং ওয়াকফ প্রশাসনের কাঠামো দুর্বল হওয়া ও জনবল সংকটের কারণে এতোগুলো স্টেটের খোঁজ নেই বলে জানিয়েছে ওয়াকফ প্রশাসন।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ওয়াক্ফের কর্মচারিদের হুমকি ধামকি ও যোগ-সাজঁস করে বিভিন্ন কায়দা-কানুনের মাধ্যমে ওয়াক্ফের সম্পত্তি নিজের নামে দলিল করে নিয়েছেন। আবার এমনও দেখা গেছে, নতুন ওয়াকফ সম্পত্তির খোঁজ পেয়েও ঘুষ নিয়ে আঞ্চলিকগুলো ওয়াকফ প্রশাসনে সে সম্পত্তির কথা জানায় না।

এসব বিষয়ে ওয়াক্ফের প্রশাসক ফয়েজ আহমেদ ভূইয়া বলেন, দেশে দুই লক্ষের মত ওয়াকফ স্টেট নিবন্ধিত না থাকলেও এ সম্পত্তি একেবারে বেহাত হয়ে গেছে কিন্তু তথ্যটি সঠিক নয়। যারা ওয়াকফকৃত সম্পত্তি ভোগ দখল করছে তারা বিভিন্ন সময় টাকা দিয়ে সরকারি ভাবে সম্পত্তিগুলো তাদের নামে রেকর্ড করিয়ে নিয়েছেন। সে হিসেবে তারাও বৈধ ভাবেই ভোগ করছেন সম্পত্তি। এখানে আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা স্টেটগুলো নিজের আওতায় নিয়ে আসতে পারছি না। অনেকে বলে বেড়ায় ওয়াকফের সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে, কিন্তু এ কথা বলা ঠিক নয়।

বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত ওয়াকফ স্টেটের সংখ্যা ২১৫৮৮টি এবং ২২৯টি স্টেট নিয়ে মামলায় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় ওয়াকফ হওয়া সম্পত্তির দলিল দেখে খোঁজ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ বছরে ৯০৮টি স্টেটসহ গত তিন বছরে মোট ১২২৬টি স্টেট উদ্ধার করা হয়েছে।

বর্তমানে ওয়াকফ প্রশাসনের মোট জনশক্তি ৯৮ জন। এর মধ্যে ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তা ১০ জন, ৩য় শ্রেণীর ৬০ জন, ৪র্থ শ্রেণীর ৩০ জন আর ২য় শ্রেণীর কেউ নেই। সারাদেশে ৩৮টি আঞ্চলিক অফিসে দুজন করে কাজ করে, এরমধ্যে একজন পরিদর্শক বা হিসাব নিরীক্ষক আর অন্যজন ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারি।

এই জনবল নিয়ে স্টেটগুলো ব্যবস্থাপনা করা, মোতাওয়াল্লী নিয়োগ, অডিট করাতেই হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। এরপর নতুন ওয়াকফ সম্পত্তির খোঁজ করে বের করা আসলেই কতটুকু সম্ভব তা প্রশ্নের বিষয়।

এ বিষয়ে ওয়াকফ প্রশাসক বলেন, বেশিরভাগ স্টেট একশো বছর আগে ওয়াকফ করা। এর মধ্যে উত্তরসূরিরা সম্পত্তি নিজেদের নামে রেকর্ড করিয়ে নিয়েছেন তাও চার পাঁচ পুরুষ আগে। এর কারণে আমরা বেশির ভাগ বাস্তবিক অবস্থান সম্পর্কে জানি না। স্টেটগুলোর দলিল আমাদের কাছে থাকলেও অনেক পুরোনো দলিল হবার কারণে সেগুলো খুঁজে বের করা যাচ্ছে না। আর আমাদের যে জনবল রয়েছে তা দিয়ে এতো গুলো স্টেট ব্যবস্থাপনা করা এবং নতুন স্টেট খুজেঁ বের করা আমাদের জন্য কষ্ট সাধ্য, তবে আমরা চেষ্টা করছি।

বর্তমানে ওয়াক্ফের নিয়ন্ত্রনে যে স্টেটগুলো রয়েছে তার বেশির ভাগই তাদের আয়ের সঠিক হিসেব দিচ্ছে না এবং আয়ের বেশির ভাগ টাকা জন কল্যাণে ব্যয় না করে নিজেদের পকেটে রেখে দিচ্ছেন। প্রশাসনে তারা আয়ের সঠিক হিসেব না দিয়ে যে হিসেব দেয় ওয়াকফ তার সঠিক হিসেব না নিয়েই তাদের ওডিট সম্পন্ন করে।

যেমন মিরপুরের শাহ আলী (রহ) মাজার কমিটি আয়ের ৫ শতাংশ হিসেবে বাৎসরিক ১৫ লক্ষ টাকা ওয়াকফ প্রশাসনে দেয়। তাদের এই হিসেবে মাজারের বাৎসরিক আয় তিন কোটি টাকা কিন্তু একটি সূত্রে জানা গেছে, তাদের বছরে ছয় কোটি টাকার উপরে আয় রয়েছে।

এছাড়া পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ ইয়ারউদ্দিন খলীফার মাজার কমিটি বাৎসরিক এগারো লক্ষ টাকা দেয় ওয়াকফ প্রশাসনে। সে হিসেবে তাদের আয় সোয়া দুই কোটি টাকা হলেও মাজারের উত্তরসূরি হাফেজ খালেদ জানান, মাজারের বছরে চার কোটি টাকা আয় হয়, যার বেশির ভাগ টাকা কমিটি ভাগ বাটোয়ারা করে নিজেরা নিয়ে নেয়।

আয় নিয়ে স্টেটগুলোর লুকোচুরির বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াকফ প্রশাসক বলেন, আমরা জানি অনেকেই আয়ের সঠিক হিসেব দিচ্ছে না, কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে অনিয়মের মধ্যে চলতে থাকা স্টেটগুলোকে বেশি চাপাচাপি না করে তাদের উপর ওয়াক্ফের ধার্য আদায় নিয়মিত করার চেষ্টা করছি এবং ক্রমান্বয়ে ধার্য বাড়াচ্ছি যাতে তাদের উপরও চাপ না পড়ে। এছাড়া ওডিটের মাধ্যমে স্টেটগুলোর আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসেব রাখা এবং সঠিক ব্যবহার করার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছি যা তারা আগে দায় সাড়া ভাবে চালিয়ে যেত।

এছাড়া আগে ওয়াকফ স্টেটের অনেক দামি দামি সম্পত্তি ওয়াকফ প্রশাসনের মাধ্যমেই নাম মাত্র মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। ২০১৩ সালে আইন করে সম্পত্তি বিক্রিতে কঠোরতা আরোপ করাতে ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রি বন্ধ হয়েছে।

দেশের সবগুলো ওয়াকফ সম্পত্তি যদি উদ্ধার করা যায় এবং সঠিক ব্যবহার করা যায় তাহলে দেশের মানুষ অনেক উপকৃত হবে এবং যারা জন কল্যাণের আশায় বুক বেধে নিজের কষ্টার্জিত সম্পত্তি ওয়াকফ করেছেন তাদের আত্মা শান্তি পাবে। ফয়েজ আহমেদ বলেন, শুধু আইনের খাতা কলমে নয়, বাস্তবিকভাবে সরকার যদি ওয়াকফ প্রশাসনকে শক্তিশালী করে তাহলে শুধু ওয়াকফের মাধ্যমেই দেশের গরিব দু:খীদের কষ্ট দূর করা সম্ভব।

ইআর