অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশ। লক্ষ প্রাণ ও অগণিত মা-বোনের সম্ভ্রমের দামে কেনা ৫৬ হাজার বর্গমাইলের আমাদের এই লাল-সবুজের পতাকা। পতাকার সবুজ রং সুজলা, সুফলা, শষ্য-শ্যামলা এক উর্বর বাংলার প্রতিকৃতি। যেখানে গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ আর গোয়ালভরা গরুর সমৃদ্ধ ইতিহাস। এামরা ছিলাম এমনই এক সমৃদ্ধ জাতি।আমাদের ইতিহাসটাই এমন সমৃদ্ধি এ প্রাচুর্যের ইতিহাস।

চোখ জুড়ানো সবুজ মাঠ সোনার ফসলে ভরা। এই সোনার ফসলের পিছনে রয়েছে বাংলা মায়ের সূর্য-সন্তানদের কঠোর পরিশ্রম আর দরদর করে ঝরে পড়া ঘামের কঠোর সাধনা; আছে অকৃত্রিম এক তৃপ্তির হাসি। যা বাংলা মায়ের নীরব সংগ্রামী ছেলেদের সরলতারই প্রতিচ্ছবি। কিন্তু তার আড়ালে সুপ্ত এক সংগ্রামী ঐক্যবোধ। যে জাতির সে ঐক্যবোধ আছে তারা স্বহস্তে নিজেদের ইতিহাস রচনা করার ক্ষমতা রাখে।

এমনি এক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল সুদূর অতীতে। নিজেদের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ইতিহাস গড়ার প্রথম পদক্ষেপ ছিলো পাকিস্তানী রক্তচক্ষুর বিরোদ্ধে নিজেদের ভাষায় তথা মায়ের ভাষায় কথা বলার দাবি; তথা রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবি।এদেশের সাদাসিদা মানুষগুলো ভাষার জন্য নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করলো পরবর্তীকালেও দেশের প্রয়োজনে তারা অদক্ষ হাতের বজ্রমুষ্টি দ্বারাও শত্রুকে তার সমুচিত জবাব দিতে পারে। অর্থাৎ, প্রয়োজনে সে হাত যেমন ফসল ফলানোর জন্য মাটিকে শাসন করতে পারে, তেমনি পারে শোষককে তার সমুচিত জবাব দিতে।

হ্যাঁ আমরা পেরেছিলাম সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিলাম যে কিভাবে শুধু মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য আমরা নিজেদেরকে সোৎসাহে শত্রুর বিপক্ষে পরিচালিত করতে পারি। তা-ই করেছিলো সালাম বরকত রফিক ও জব্বাররা। সারা বিশ্ব তা অবাক চোখে দেখেছে। শুধু তাই নয়; বিশ্বব্যাপী সশ্রদ্ধ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দেয়া হয়েছে আমাদের এই সংগ্রামের দিনটিকে। তাই এই দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে পরম শ্রদ্ধায়।

হ্যাঁ, এ জাতি সালাম বরকতের রক্ত দিয়ে নিজেদের যে ইতিহাসের সূচনা করেছে তার যবনিকাপাতের ইতিহাস হবে নিশ্চয়ই আরো অনেক তাৎপর্যময়।

হ্যাঁ, আমরা পেরেছিলাম। সবুজের বুকে আবির ধারার রক্তস্রোত বইয়ে দিয়ে আমরা রচনা করেছিলাম আমাদের সেই মহাতাৎপর্যপূর্ণ সেই ইতিহাস।বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা আমাদের শুনিয়েছিলো শিকল ছেঁড়ার গান। আমরা পেয়েছিলাম মহান এক বিজয়; আমাদের মহান স্বধীনতা।

আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের লাল-সবুজের পতাকা অর্জনের ইতিহাস জগতে সত্যিই বিরল এক ইতিহাস। একটি ক্ষুদ্র ভূ-খণ্ডের স্বাধীনতায় এতোগুলো জীবন, অসংখ্য মা-বোনের মহামূল্যবান সম্ভ্রম হারানোর নজির জগতে আর দ্বিতীয়টি দেখা যায় না।

মোটকথা, বিশাল একটা ধ্বংসস্তুপের ওপর পতপত করে ওড়া বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকার ইতিহাস হচ্ছে, ত্যাগের ইতিহাস, একইসাথে সংগ্রামের ইতিহাস।

এই সংগ্রামের ইতিহাসের পিছনে যে জিনিসটি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে তা হলো আমাদের ঐক্য ও ভ্রতৃত্ববোধ। শিক্ষক, কৃষক, কামার, কুমার, তাঁতি, মাঝি, জেলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের যৌথ অবদানের ফসল। এক কথায়, আমাদের ত্যাগ সংগ্রামের মু্ক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছিলো ঐক্যের ইতিহাস।

এতদসত্ত্বেও আমাদের ঐক্যের এই ইতিহাসকে ম্লান করে দিয়েছে আমাদের বর্তমান অবস্থা। আজ আর আমাদের ঐক্য নামের সে মহাস্ত্র তার আপন সুরে ঝংকৃত হয়না। আমরা আমাদের স্বধীনতার সে চেতনা, ঐক্যের চেতনা ভুলে যে যার মতো রাজনীতির নামে নিজেই নিজের রক্তের তথা দেশের সাথে প্রতারণা করছি।

আজ আমরা আমাদের ঐক্যের সে শ্লোগান "তুমি কে, আমি কে ? বাঙালি বাঙালি" ভুলে গিয়ে হীন স্বার্থে 'জাতীয় স্বার্থকে' ভূলুণ্ঠিত করছি।

আমাদের জাতীয় স্বার্থের দাবি ছিলো আমরা হাতে হাত রেখে, কাধেঁ কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাবো উন্নতির দ্বারে। সেই দ্বার ভেঙে নিয়ে আসবো আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের সমৃদ্ধি। বিশ্বের গগন মার্গে শির উঁচু করে জানান দিব, আমরা বাঙালি; আমরা বাংলাদেশী। স্বদেশ মাতার কল্যাণের প্রশ্নে আমরা বিভেদহীন। আমরা সকলে একই গোলাপের বিভিন্ন পাপড়ি, আর সব পাপড়ি নিয়ে একটি গোলাপ হলো আমাদের প্রাণের দেশ বাংলাদেশ।

আমাদের কথা ছিল সাম্যের গানে ঐক্যের সুর তুলে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু তা না করে আমরা বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত। কেউ বিএনপি, কেউ জামায়াত, তাবলীগ, আওয়ামী লীগ, কেউবা শাহবাগী, এ্যান্টি শাহবাগী, কেউ ধর্মানুরাগী কেউবা ধর্মবিরোধী, কেউ মুক্তিবাদি, কেউ যুক্তিবাদি এই জাতীয় মনোভাব এবং বিভাজন আমাদের যেমন ক্ষুদ্র করে দিচ্ছে তেমনি করে দিচ্ছে দুর্বলও।

শত্রুর রক্তচক্ষু এই দুর্বলতার সুযোগে আমাদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, ব্লগার, শিক্ষক, সংখ্যালঘু হত্যা বিভিন্ন ইস্যুতে আমাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

আমাদের এই অভ্যন্তরীণ কলহের সুযোগেই আমাদের সীমান্তের কাঁটাতারে মানবতা ঝোলে। ফেলানীর বাবারা বিচারের দাবি দ্বারে দ্বারে ঘোরে।

যে সময় আমরা বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে নিজের দেশ-জাতিকে রক্ষা করবো তখনই আমাদের নজর দিতে হয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের দিকে। যে কোন্দলের চরম রূপ ধারণ করেছে আমাদের বর্তমান সংঘাতের রাজনীতি। যেখানে রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য যে জনগণের কল্যাণ সে উদ্দেশ্য আর হাসিল হচ্ছে না।

একটি দেশের রাজনৈতিক দলগুলো হবে একে অন্যের পরিপূরক। রাজনীতি হবে জনগণের স্বার্থে। আর জনগণের এই রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব থাকে দেশের সরকারের।

মনে রাখতে হবে, একটা দেশের সরকার যেমন জনগণের তেমনি জনগণও সরকারের। দেশের স্বার্থেই ঐক্যের মূলমন্ত্রে সবাইকে এক হতে হবে। এই ঐক্যের মূলমন্ত্রে একটি দেশে অনেকগুলো দল থাকবে কিন্তু সেখানে কোন দলাদলি থাকবে না; কিন্তু আমরা আজো আমাদের জনগণের স্বার্থে রাজনীতি দেখতে পাই না। দেখতে পাই না ত্যাগ ও মহত্বের রাজনীতি।

আজো আমরা দেখতে পাই একটা স্থানীয় সরকার তথা ইউপি নির্বাচনের মাত্র কয়েকটি ধাপে অন্তত ৮০ জন লোক নিহত হয়; আহত হয় হাজারেরও বেশি। যদিও এখনো নির্বাচনের আরো এক ধাপ বাকি। তাহলে প্রসঙ্গতই আমরা বলতে পারি, কোন দিকে যাচ্ছে আমাদের রাজনীতি? কোন পথে হাঁটছে দেশ?

একটা দেশের, দেশের সরকারের থাকবে প্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য গুণ হলো পরমত সহিষ্ণুতা। থাকবে সক্রিয় বিরোধীদল ও গঠনমূলক সমালোচনা। অনুরূপভাবে বিরোধী মতাবলম্বীগণও শুধু সরকারের সমালোচনা এবং খুঁত খুজেঁ বেড়াবে না। বরং অসঙ্গতিগুলো ধরিয়ে দিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে সাহায্য করবে। তবে সরকার যদি তা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে তবেই তা দেশ গড়ার কাজে আসবে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি বর্তমানে আমাদের রাজনীতিতে নেই কোন পরমত সহিষ্ণুতা, বরং সংঘাত ও অবিশ্বাসের রাজনীতি চলছে সর্বত্র। এই সংঘাতের রাজনীতি আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। ৯ মাসব্যাপী স্বধীনতা যুদ্ধে ৩০ লক্ষ লোক প্রাণ হারিয়েছিল কিন্তু ইউপি নির্বাচন উপলক্ষ্যে মাত্র কয়েকদিনের নির্বাচনে নিহতের পরিমাণ যেন আরেকটি মুক্তিযুদ্ধেরই বিভীষিকাময় অবস্থা। আমাদের সেই ঐক্যের, সেই চেতনার অভাবই আমাদের সংঘাতের মূলকারণ। এই সংঘাত হচ্ছে রাজনীতির জন্য, নিজের সিদ্ধির জন্য। এই সংগাতে যেমন হচ্ছে নিজের দলের মধ্যে; তেমনি হচ্ছে প্রতিপক্ষের সাথেও।

তবে কোন পথে পরিচালিত হচ্ছে আমাদের রাজনীতি? সামান্য ভোটের জন্য আমার ভাইয়ের জীবন কেড়ে নিতে পারি? আমাদের মনে রাখতে হবে যারা ( সে যেকোনো দলেরই হতে পারে) সামান্য ভোটের জন্য, ক্ষমতার জন্য আমার ভাইয়ের জীবন নিতে পারে, যারা ভোটের জন্য নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তাদের দিয়ে আর যাই হোক এদেশের কল্যাণ কল্পনা করা যায় না। কারণ তারা নিজেদের স্বার্থে দেশের আরো বড় কোনো ক্ষতি করতে পারে।

তবে কিসে হবে এদেশের কল্যাণ ? হ্যাঁ সেই কল্যাণের লক্ষ্যে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই সংগ্রামী ইতিহাসের দিকে, সেই চেতনার দিকে। হ্যাঁ ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সেই রক্তপতাকার, সেই চেতনার ইতিহাস বিভক্তির নয়; বরং ঐক্যের, সেই ইতিহাস আমাদের ভ্রাতৃত্বের।

অতএব সেই ঐক্য ও ভাতৃত্ববোধের মূলমন্ত্রে এই সংগ্রামী, ত্যাগী জাতি দণ্ডায়মান হোক। সগর্বে নিখিল বিশ্বে জানান দিক যে আমরা বাঙালি, আমরা বাংলাদেশী, স্বদেশের কল্যাণে আমরা ঐক্যবদ্ধ।

এমআইএস