মিয়ানমারের ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাচারে বাংলাদেশের বৌদ্ধরা জড়িত রয়েছে। নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ এক বিবৃতি পাচারের শিকার হওয়া এক রোহিঙ্গা নারীর কথা উল্লেখ করে এ তথ্য জানিয়েছে।

বুধবার দেয়া বিবৃতি হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে যে মিয়ানমারের বিবেকহীন চোরাকারবারী ও মানব পাচারকারীদের শিকার হওয়া সাগরে ভাসমান রোহিঙ্গারা ও বাংলাদেশের নাগরিকরা তাদের কাছে লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠনটির কাছে রোহিঙ্গা মুসলমানরা বর্ণনা করেছেন, কিভাবে সাগরে গত দুটি মাস ডেকের নিচে একটি রুদ্ধ সংকীর্ণ স্থানে সামান্য খাদ্য ও পানীয় দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন।

চলতি মে মাসের শুরুর দিকে থাইল্যান্ডে অনেকগুলো গণকবর ও বন্দী শিবির খুঁজে পায় দেশটির কর্তৃপক্ষ। এরপর বিষয়টি আলোচনায় চলে আসে। একটি নৌকায় আনুমানিক ১০০জন রোহিঙ্গা পুরুষ ও মহিলাকে থাইল্যান্ডের উপকূলের কাছাকাছি অজ্ঞাত এক স্থানে রেখে পাচারকারীরা চলে যায়। পরে তাদেরকে থাই কর্তৃপক্ষ উদ্ধার করে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার মতে,এখনো তিন থেকে চার হাজার মানুষ সাগরে ভাসছে।

সাধারণ মানুষের দলভেদে সাগর পাড়ি দেয়ার বিষয় সমাধান খুঁজতে আগামী ২৯ মে ব্যাংককে একটি আঞ্চলিক সভার আহবান করা হয়েছে।

ধর্মীয় নিগ্রহের শিকার হয়ে দেশ ছাড়া ও মানবপাচারকারীদের হাতে পড়ার কথা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে বর্ণনা করেছেন বেঁচে থাকা রোহিঙ্গারা। মৃত্যু, খারাপ আচারণ ও ক্ষুধার প্রত্যক্ষী হয়ে আছেন তারা।

এ বিষয় হিউম্যান রাইটসের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বিবৃতিতে বলেছেন, “কর্মকর্তা ও অন্যান্যের সঙ্গে কথা বলে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ধর্মীয় নিগ্রহের শিকার ও অবহেলিত মানুষদের হতাশা ও দুর্দশার সুযোগ নিয়ে বার্মা, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার কিছু কর্মকর্তার সহযোগিতায় এই নিষ্ঠুর নেটওয়ার্কটি ফায়দা লুটছে।”

তিনি আরো বলেন, “আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো ও অন্যান্য সরকারের প্রতিজ্ঞা করা উচিত যে তারা অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতা আরো বৃদ্ধি করবে এবং হাজার হাজার রোহিঙ্গা ও বাংলোদেশী আশ্রয়প্রার্থী ও অভিবাসীদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করবে।”

অ্যাডামস বলেন, “বার্মা ও বাংলাদেশের উচিত রোহিঙ্গাদের উপর উৎপীড়ন বন্ধ করা। আর মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের উচিত বন্দীশিবিরগুলো দ্রুত বন্ধ করে দেয়া এবং এটা নিশ্চিত করা উচিত যে তাদের মাটিতে আর কোনো গণকবর খোড়া হবে না।”

বিবৃতিতে জানানো হয়, সম্প্রতিবাংলাদেশ ও বার্মা (মিয়ানমার) থেকে হাজার হাজার অভিবাসী ও রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীবহনকারী অনেকগুলো জাহাজ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছায়। কিন্তু তিন দেশেরই সরকার জাহাজগুলো সমুদ্রে ফিরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার শিকার হয়ে তারা সিদ্ধান্ত বদলাতেবাধ্য হয়।

আন্তর্জাতিক চাপে গত ২১ মে কুয়ালালামপুর বৈঠকে বসে ওই তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া নৌকাগুলো ভিড়তে দিতে সম্মতি হয়। তবে শর্ত জুড়ে দেয় যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সহায়তা দিতে হবে এবং এক বছরের মধ্যে তাদেরকে পুনর্বাসন ও নিজ দেশে ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করতে হবে।

বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমানদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। শিক্ষার সুযোগ নাই বললেই চলে। চাকুরি নেই। ভ্রমন ও নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নেই। ফলে তারা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন। এমন বাজে অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে স্বেচ্ছায় ভিন দেশ পাড়ি দিলেও অনেকে মানবপাচারারীদের ফাঁদে পড়েছেন। চোরাকারবারিরা প্রলোভন দেখিয়ে ও প্রতারণা করে তাদেরকে সাগর পাড়ি দেয়ায় এবং অনেক সময় পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়।

মানব পাচারকারীদের শিকার হওয়া ১৩ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা মেয়ে হিউম্যান রাইটসকে বলেছেন, “তারা (পাচারকারীরা) আমাকে টেনে নৌকায় তুলেছিল। তাদের হাতে লাঠি ছিল এবং আমাকে মারার ভয় দেখাচ্ছিল। আমি চিৎকার করলাম, জোরে জোরে কাঁদলাম। আমার মা-বাবাও কাঁদছিলেন কিন্তু তারা কিছুই করতে পারলেন না।”

১৬ বছর বয়সী আরেক রোহিঙ্গা মেয়ে বলেছে, “বাংলাদেশের রাখাইন বৌদ্ধদের ৬ জনের একটি দল ছুরি ও বন্দুকসহ এসে আমাকে জোর করে নৌকায় তুলল। তারা বলল যে আমাকে মিয়ানমার থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমাকে ছোট্ট একটি নৌকায় উঠিয়ে দিল। সেখানে আরো ১৫ জন রোহিঙ্গা ছিল। সবাইকে জোর করে আনা হয়েছিল।”

তৃতীয় আরেক জন নারী বলেন, “আমি আমার স্বামীর সঙ্গে শ্বশুড় বাড়ি যাচ্ছিলাম। তখন এক দালাল ও আরো কয়েকজন লোক মিলে আমাদেরকে তুলে নিয়ে গেল। তারা জোর করে আমাদেরকে নৌকায় উঠাল। নৌকায় আমি তারে ভাষা বুঝতে পারিনি। আমি বার্মিজ বা রাখাইন ভাষায় কথা বলতে পারি না। আমি জানি না তারা কারা। ”

তাদের মতো নির্যাতনের শিকার হওয়া আরেক রোহিঙ্গা মেয়ে বলেছে, “আমরা দু’মাস নৌকায় ছিলাম। ছোট নৌকায় করে আরো অনেক মানুষবড় নৌকায় নিয়ে আসা হত। আমরা (মহিলারা) নৌকার নিচের অংশে ছিলাম। এটা খুবই ছোট জায়গা ছিল। আমি নৌকার বাইরের কিছুই দেখতে পাইনি। শুধু অনুভব করলাম এটা দুলছে। লোকজন বমি করছিল। আমার মাথা ঝিম ঝিম করছিল এবং সারাক্ষণ অস্বস্তিতে ছিলাম।

গত ২৫মে মালয়েশিয়ার সরকার ১৩৯টি গণকরব ও ২৮টি বন্দী শিবিরের সন্ধান পায়। এ মাসের শুরুর দিকে থাইল্যান্ডও গণ কবর ও বন্দী শিবির আবিষ্কার করে।

রোহিঙ্গারা ও বাংলাদেশীরা জানিয়েছে যে মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াতে তারা অনেক দুর্বিষহ জীবন কাটাত। যদি তারা মুক্তিপণ দিতে না পারত, তাহলে তাদের প্রহার করা হত ও গালিগালাজ কর হত।

থাইল্যান্ডের একটি বন্দী শিবির থেকে মুক্তি পাওয়া এক রোহিঙ্গা নারী বলেছেন, “আমি টাকা আদায় করে দিতে না পারায় এক দালাল আমাকে লাটি ও বাঁশ দিয়ে পিটিয়েছিল এবং আমার পায়ে ও গোড়ালিতে জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরেছিল।

বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতারা রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদাসীন মন্তব্য করেছে। মিয়ানমারের সরকারও তাদেরকে দেশটির জনগণ বলে স্বীকার করছে না। মুসলিম রোহিঙ্গাদের অবৈধ বাঙ্গালি বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করছে।

বার্মার কর্মকর্তারা প্রথমে অস্বীকার করেছিল যে ভাসমান লোকজন তাদের দেশের না। আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যারা অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছে তারা ‘মানুষিক বিকারগ্রস্ত’ এবং তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোট সাগরে ভাসা মানুষদেরকে বেপরোয়া বলেছেন। তার দেশে কোনো কাউকে আশ্রয় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন।

আগামী ২৯ মে বাংলাদেশ, বার্মা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার সরকার বৈঠকে বসছে। এ বিষয় হিউম্যান রাইটসের অ্যাডামস বলেছেন, “সবচেয়ে গুরুতত্বপূর্ণ হল, বার্মা যদি রোহিঙ্গাদের প্রাপ্য অধিকার না দেয় এবং তাদের বৈষম্যনীতি বিলোপ না করে, তবে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে না। অন্যান্য দেশেরও চোরাকারবারি ও মানবপাচারকারীরে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।”

জেডআই