মিয়ানমারের রাখাইনে (আরাকান) রোহিঙ্গা মুসলমানশূন্য করতে নানা অজুহাতে প্রদেশটিতে ১৯ বার অভিযান চালায় মিয়ানমারের বর্বর বাহিনী। ১৯৪২ সাল থেকে চলা এই দমন-পীড়ন নির্যাতনে আরকান এখন বিধ্বস্ত এক জনপদ।

১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিকের জারিকৃত নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে তিনটি ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়। (১) তাইরেন্স (প্রথম শ্রেণীর নাগরিক), (২) নাইংচা (প্রাকৃতিক নাগরিক), (৩) নাইংক্রাচা (অতিথি নাগরিক); কিন্তু এই তিন ক্যাটাগরির কোনোটিতেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।

সর্বশেষ তাদের দেশবিহীন জাতিতে পরিণত করতে গত ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মুসলিম অধ্যুষিত সীমান্ত চৌকিতে পুলিশের ওপর অজ্ঞাত অস্ত্রধারীদের হওয়ার ঘটনার সূত্রপাত ধরে শুরু হয় অভিযানের নামে মিয়ানমারের সরকারি তিন বাহিনী পুলিশ, সেনাবাহিনী ও সীমান্তরী বাহিনীর নৃশংসতা। নৌ, স্থল, আকাশপথে চলছে থেমে থেমে নৃশংস আক্রমণ।

অনেকটা বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর আড়াল করে চালানো এই অভিযানে সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠীর হাজার হাজার লোককে তাদের ভস্মীভূত বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়। নিহত হয় অজ্ঞাত সংখ্যক।

ফলে রোহিঙ্গারা ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসছেন। নাফ নদী ও সাগরে ভাসছে নারী-পুরুষ ও নিরীহ মানুষ বোঝাই অনেক নৌকা। রোহিঙ্গারা কোনোভাবেই যাতে এ দেশে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ড সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। তবুও দলে দলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন বিপন্ন রোহিঙ্গা মুসলমানরা।

সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর মিয়ানমারের বর্বর নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনায় এক রকম ‘নীরব দর্শকের ভূমিকা’য় অবতীর্ণ হয়েছে বিশ্ববিবেক।

লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণের ঘটনায় লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে পালাচ্ছেন।সর্বস্ব হারিয়ে ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

২০১২ সালে, প্রায় ৮,০০,০০০ রোহিঙ্গা মায়ানমারে বসবাস করে।মায়ানমার ছাড়াও ৫ লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এবং প্রায় ৫লাখ সৌদিআরবে বাস করে বলে ধারনা করা হয়।রোহিঙ্গা মুসকলিমরা বিভিন্ন সময় বার্মা সরকারের নির্যাতনের কারণে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।জাতিসংঘের তথ্যমতে, রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী।

মংডুর জামবুনিয়া রাঙ্গাবালি গ্রামের বিধবা ফাতেমা খাতুন (৫৩) জানালেন, স্বামীকে হারিয়েছেন অর্ধযুগ আগে। রাখাইন প্রদেশে বসবাস হলেও নাগরিকত্ব মিলেনি। এরপরও সন্তান ও নাতি-নাতনী নিয়েই দিন কাটছিল।কিন্তু সেই সুখ তাদের শোকে পরিণত হয়েছে। সব কিছু হারিয়ে তিন নাতনীকে নিয়ে তিনি এখন দেশান্তরী। স্বীকৃতি মিলেছে অবৈধ অভিবাসীর।

তিনি বলেন, গ্রামে সেনাসদস্যরা আক্রমণ চালায় ১৫ নভেম্বর রাতে। বাড়িতে ঢুকে ছেলে শাহ আলম (৩০), নুর ছালাম (২৭), আমান উল্লাহ (২৫) ও হামিদ হোসেনকে (১৬) বেঁধে ফেলে। এরপরই চলে তার দুই মেয়ের ওপর পাশবিক নির্যাতন। একে একে সেনারা তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়।

ফাতেমা বলেন, ‘নির্যাতনে বাধা দেয়ায় সেনারা মারধর শুরু করে। মেয়েদের ওপর নির্যাতন শেষ হলেই ৪ ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে ঘরে আগুন দেয় সেনাসদস্যরা। এ সময় প্রাণ বাঁচাতে কে কোথায় গেছে আমি জানি না।’

টেকনাফ উপজেলার লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প থাকা: মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের মংডুর টাউনশিপের উত্তর জানবুনিয়া গ্রামে বাড়ি ছিল নূর বেগমের।মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অন্যদের মতো তাঁদের ঘরবাড়িও পুড়িয়ে দেয়।তাঁর দুই ছেলেকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। ধরে নিয়ে গেছে স্বামী জামাল হোসেনকে।

এরপর ৬ মাস বয়সী ছোট ছেলে জানে আলমকে নিয়ে ২০ দিন ধরে হেঁটেছেন নূর বেগম। থেকেছেন অর্ধাহারে-অনাহারে। সীমান্ত পেরিয়ে গত ২৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেন নূর বেগম।

অসুস্থ হয়ে ২৫ নভেম্বর সকালে মারা যায় শিশুটি। এর পর থেকে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন নূর বেগম।পরে ক্যাম্পের বাসিন্দারা শিশুটিকে গোসল করান এবং জানাজায় অংশ নেন।( ছবি-এফএনএস)

লেদা ক্যাম্পের বাসিন্দা ইলিয়াছ মাঝি জানান, সকাল হলে শিশুটিকে ক্যাম্পে অবস্থানরত বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত চিকিৎসাক্যাম্পে দেখানোর কথা ছিল।কিন্তু তার আগেই ভোরে শিশুটি তার মাসহ সবাইকে কাঁদিয়ে চিরতরে চলে যায়।

পরে ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গারা শিশুটিকে শেষ গোসল করায় এবং জানাজা শেষে তাকে দাফন করে।

ইলিয়াছ মাঝি জানান, শীতের মধ্যে ঝোপে-জঙ্গলে থাকায় এবং ঠিকমতো খাবার ও চিকিৎসা না পাওয়ায় শিশু জানে আলম নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে তাঁদের ধারণা।

কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং এলাকার মোজিনা খাতুন নামে একজন রোহিঙ্গা নারীর অভিযোগ করছেন যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করেছে।

মোজিনা খাতুন জানান, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে।পুরুষদের ধরে ধরে হয় গুলি করা হচ্ছে, নয়তো গলা কেটে ফেলা হচ্ছে।তার মতই আরো বহু নারী এখন স্বামীহারা।

তারা আমাদের বাচ্চাদের আগুনে ছুঁড়ে ফেলছে।প্রাণ বাঁচাতে রাতের অন্ধকারে আমরা তাই সীমান্ত অতিক্রম করে এখানে এসেছি।

শীতে কাঁপছে রোহিঙ্গারা: মংডু নাইছংপাড়া গ্রামের শামসুল আলম (৩৫) জানায়, তার স্ত্রী হাসিনা (২৮), মেয়ে শাহিনা (৭), ছেলে কাউসার (৪), সোহেল (২) কে নিয়ে গত দু’দিন ধরে বস্তির ঝুঁপড়ি ঘরের আঙ্গিনায় দিন কাটাতে হচ্ছে।আসার সময় এক কাপড়ে চলে আসার কারণে শীত নিবারণ করতে না পারায় ঠান্ডায় তার দু’শিশু জ্বরে কাপঁছে।জানা যায়, যাদের আত্মীয় ও চেনা জানা রোহিঙ্গা পরিবার রয়েছে তারা আশ্রয় পেলেও হাজারেরও অধিক রোহিঙ্গাপরিবার খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাচ্ছে।

উখিয়া প্রেস কাবের সাবেক সভাপতি রফিক উদ্দিন বাবুল জানান, সংবাদ সংগ্রহ করতে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট শিশুটি তার দাদীর কোলে তীব্র শীতে কাপছে। শিশুটির পরনে নেই জামাকাপড়। অসহায় রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক জানান, বিজিবি-পুলিশের সতর্ক অবস্থানের পরও প্রতিদিনই কুতুপালং বস্তি ও শরণার্থী শিবিরে ঢুকছে রোহিঙ্গারা। এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু এখানে আশ্রয় নিয়েছে।

রোহিঙ্গাদের অঞ্চলে সাংবাদিক ও ত্রাণকর্মীদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছে মিয়ানমার সরকার।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সংস্থা নিউ ইয়র্ক টাইমস মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে নির্যাতনের প্রমাণ হিসেবে একটি ছবি প্রকাশ করে।ছবিতে যে দুটি গ্রামের দৃশ্য দেখানো হয়েছে সেগুলো হল- কিয়েত ইয়ো পিন এবং ওয়া পিক।

কিয়েত ইয়ো পিন: গ্রামের প্রথম ছবিটি তোলা হয়েছিল ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ।দ্বিতীয় ছবিটি মিয়ানমারের সেনাদের তাণ্ডবের পর গত ১০ নভেম্বর তোলা। 

ওয়া পিক: গ্রামের প্রথম ছবিটি তোলা হয়েছিল ২০১৪ সালে।এ গ্রামের দ্বিতীয় ছবিটি তোলা হয় চলতি বছরের ১০ নভেম্বর। 

রাখাইন প্রদেশে সেনা অভিযান শুরুর আগে ও পরের ওই স্যাটেলাইট ইমেজে দু'টি গ্রামের দৃশ্য দেখানো হয়।এতে দেখা যায়, সবুজের মাঝের এক টুকরো গ্রাম দুটি পুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। 

এর মধ্য দিয়ে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর কি পরিমাণ নির্যাতন চালানো হচ্ছে সে বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যায়। 

এমন মানবিক বিপর্যয়েও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোও এক রকম নিশ্চুপ।তাদের কেউ কেউ দায়সারা গোছের প্রতিবাদ জানিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করছে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্রই প্রশ্ন করা হচ্ছে, জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউ, ওআইসি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসহ কোথায় আজ বিশ্ববিবেক?

এমবি