বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্ণীতি ও অব্যস্থাপনা এখন আর শুধু দেশের গণমাধ্যমেরই খবর নয়। এই খাতে একের পর এক লুট, জালিয়াতি ও নানা অনিয়মের বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও জায়গা করে নিয়েছে। এসব ঘটনায় দেশের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।
এই সেক্টরে যারা লুটপাট চালাচ্ছে তারা আসলে কারা? কিভাবেইবা তারা একের পর এক পঙ্গু করে দিচ্ছে এক একটি ব্যাংক? এমনই নানা প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আমেরিকার প্রভাবশালী দৈনিক 'দি নিউইয়র্ক টাইমসে' গতকাল ( শুক্রবার-১০ অক্টোবর ২০১৪) একটি মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। টাইমনিউজবিডির পাঠকদের জন্য মন্তব্য প্রতিবেদনটি বাংলা অনুবাদ করা হলো:
বাংলাদেশে আমরা মাঝে মধ্যেই 'আমাদেরও আছে' এমন ভাব নিয়ে এক ধরণের খেলায় মেতে উঠি। এটা যেন রীতিমতো এক পারিবারিক খেলায় পরিণত হয়েছে। আমরা তখন গর্বের সাথে বলি কিছুদিন আগে যা অন্য দেশে দেখতে পাওয়া যেত তা এখন আমাদের দেশেই দেখতে পাচ্ছি।
নব্বইয়ের দশকে আমাদের দেশে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০০ সাল নাগাদ শপিং মল, সুউচ্চ ভবন এবং মাল্টিপ্লেক্স সিনেমার আগমন ঘটে এখানে। চলতি বছর থেকে আমরা এদেশে হলিউড-স্টাইলে ব্যাংক লুটের রেকর্ড অর্জন করতে শুরু করেছি।
গত জানুয়ারিতে সোহেল নামের এক ব্যক্তি ইদ্রিস নামে আরেকজনকে সাথে নিয়ে সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখা থেকে ১৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা (প্রায় ২২ লাখ আমেরিকান ডলার) লুট করে। রাজধানী ঢাকা থেকে ৭০ মাইল দূরে অবস্থিত এই ব্যাংক থেকে সফলতার সাথে এত বড় অংকের অর্থ লুট করতে সক্ষম হন সোহেল ও ইদ্রিস।
পরবর্তীতে অবশ্য সোহেলের আসল নাম ইউসুফ মুন্সি বলে জানা যায়। ঘটনার কয়েকদিন পর তার ভাই ইদ্রিস মুন্সিসহ লুটের সাথে জড়িত আরো কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়।
পরবর্তীতে ধীরে ধীরে জানা যায়, কিভাবে সোহেল ৩০ ফুট ভূগর্ভস্থ টানেল বা গর্তের মাধ্যমে ব্যাংকের টাকা রাখার ভল্টের (কুঠুরি) কাছে গিয়েছিল। এই লুটের কাজে সে দুই বছর পরিশ্রম করেছিল। এমনই ব্যাংক লুটের পরিকল্পনা নিয়েই সোহেল ব্যাংকের পাশে একটি বাসা ভাড়া করেছিল।
এমন তথ্যও প্রকাশিত হয়, সোহেলের সাথে ব্যাংকের কোন কর্মকর্তার যোগসাজশ ছিল। অপরদিকে, সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে এই ঘটনাকে হলিউডের বিভিন্ন ছবির সাথে তুলনা করা হয়। বিশেষ করে 'দি ব্যাংক জব' মুভিটির সাথে এই ঘটনার তুলনা করেন অনেকেই।
মনে হচ্ছে যেন সোহেল মুন্সি একটি ধারা চালু করে দিল। পরবর্তীতে গত মার্চে সোনালী ব্যাংকের বগুড়ার আদমদীঘি শাখা থেকে লুট করা হয় ৩০ লাখ টাকা (প্রায় ৪০ হাজার আমেরিকান ডলার)। এই লুটের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এখানে ব্যাংকের কাছাকাছি একটি ফার্নিচারের দোকানে গর্ত খুঁড়ে ব্যাংকের ভল্টের কাছে আসে দুর্বৃত্তরা।
গত মাসে জয়পুরহাটে ব্রাক ব্যাংকের একটি শাখা থেকে একই কায়দায় প্রায় ২ কোটি টাকা (২ লাখ ৬০ হাজার আমেরিকান ডলার) লুট করে একটি ক্রিমিনাল চক্র। এখানেও একইভাবে পাশের বিল্ডিং থেকে গর্ত খোঁড়া হয়।
ব্যাংকের পাশে বাসা ভাড়া নেয়ার সময় এই ডাকাত চক্রটি বলেছিল তারা একটি অলাভজনক সংস্থা (এনজিও) চালু করতে যাচ্ছে। সংস্থাটির নাম দেয়া হয় গরীব উন্নয়ন (Poor Development) । বিড়ম্বনার এখানেই শেষ নয়, রয়েছে আরও বিড়ম্বনা (Irony)।
ক্রমেই বিস্তারলাভকারী মুভি-স্টাইলের ব্যাংক ডাকাতির বিষয়ে যখন আমাদের মনোযোগ নিবিষ্ট, তখন সবচেয়ে বড় পরিহাসের (Irony) বিষয় হলো- সোহেল মুন্সি ও তার মতো ক্রিমিনালরা আসল ব্যাংক লুটকারী নয়। বড় বড় চোরেরা নিজেদেরকে সাধুদের কাতাদের লুকিয়ে রেখেছে। শুধু তাই নয়, তারাই আবার ব্যাংক থেকে বড় বড় বরাদ্দ নিজেদের জন্য ভাগিয়ে নিচ্ছে ব্যাংক কর্মকর্তাদেরই বদৌলতে।
হ্যা, এরাই হল ঋন খেলাপি। এসব লোক ও ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে মোটা অংকের ঋন নেয় এবং ঋন নেয়ারও বহু আগে থেকে তারা এই ঋন পরিশোধ না করার মানসিকতা পোষণ করে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত কোন পথে চলছে সেটা এক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা। বৃহত্তর দৃষ্টিতে বাংলাদেশে দু'ধরণের ব্যাংক রয়েছে- বেসরকারী বা প্রাইভেট ব্যাংক এবং সরকারী ব্যাংক। বেসরকারী ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে পরিচালিত হয় এবং সরকারী ব্যাংকগুলো অর্থ-মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে পরিচালিত হয়।
বেসরকারী ব্যাংকগুলো যখন তাদের ঋন খেলাপিদের মাত্রা কমিয়ে আনতে কাজ করছে, তখন সরকারী ব্যাংক বাজে ঋন প্রদানের মাত্রা যেন ক্রমেই বাড়িয়ে তুলছে। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ঋনখেলাপীর মাত্রা বর্তমানে ২ থেকে ৩ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে এই মাত্রা ১২ শতাংশের বেশি।
সম্প্রতি 'বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট' পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের সরকারী ব্যাংকে ঋণ পরিশোধ না করার মাত্রা প্রায় ২৯ শতাংশ।
পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন সংক্রান্ত বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৩ সালের রিপোর্টে বলা হয়, 'দুর্বল আভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রন, দুর্বল সরকারী সহযোগিতা, ভঙ্গুর ঋণ ব্যবস্থাপনার কারণেই ঋণ প্রদানে অনিয়ম হচ্ছে'। আর এর ফলেই সরকার পরিচালিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি ঋণ দেয়া হয়েছে যা পরিশোধ হচ্ছে না। বিগত ছয় বছরে সরকার-পরিচালিত ৪ ব্যাংকে খেলাপী ঋনের পরিমান দাঁড়িয়েছে ২৪৫ কোটি ডলারে।
এর অর্থ হচ্ছে একটি বিশাল অংকের অর্থ ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর সুদের হার বাড়িয়ে দিয়ে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া ছাড়া ব্যাংকের আর কোন বিকল্প থাকে না। বর্তমানে বাংলাদেশী ব্যাংকগুলোতে সুদের হার ৯ থেকে ১৬, যেখানে ডিপজিট আয় ৬ থেকে ১২ শতাংশ।
প্রায়ই বলা হয়, খেলাপীদের বিরুদ্ধে সরকার বড় ধরণের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। বেসিক ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান, ১৪৫ কোটি ডলারের ঋনের জন্য যার নাম বড় বড় জঘণ্য ক্রিমিনালদের তালিকায় রয়েছে, তিনি সম্প্রতি ১০০জন খেলাপির নামের একটি তালিকা জনসম্মুখে প্রকাশ করেছেন।
এই ব্যাংকটি এসব খারাপ ঋণ রিকভার করার জন্য উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত আইনি পদক্ষেপও সামান্যই কাজে আসে বিচারব্যবস্থার চরম শোচনীয় পরিস্থিতির কারণে। বর্তমানে ঋন খেলাপি সংক্রান্ত ৮ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
এই ভঙ্গুর সিস্টেম থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো সরকার-পরিচালিত ব্যাংকগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট বডি নিয়ন্ত্রন করবে। আর এই বডিকে হতে হবে সরকারের নির্বাহী শাখা থেকে সম্পূর্ণরুপে পৃথক।
এছাড়া দেশে বেশ কয়েকটি ব্যাংক রয়েছে যা রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এরা অর্থ মন্ত্রনালয়কে রিপোর্ট করে অর্থাৎ অর্থ মন্ত্রনালয়ের অধীনে কাজ করে। এসব ব্যক্তিদের কখনো নিরপেক্ষ কোন সংস্থার তদন্ত বা অডিটের মুখোমুখি হতে হয় না। আর এরাই সব সময় দুর্ণীতিমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে থাকে।
যাই হোক আবার পুরোনো ঘটনা প্রসঙ্গে একটু আলোকপাত করছি। যখন সোহেল মুন্সি ও তার ভাইসহ লুটকারীদের কাছ থেকে র্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটালিয়ান বা র্যাব নামক আরেক ভয়ংকর সংস্থা সোনালী ব্যাংকের টাকা উদ্ধার করলো, তখন প্রায় ২ কোটি টাকা কম পাওয়া যায়। ইউসুফ মুন্সির দাবি স্থানীয় এক ধর্মীয় নেতার কাছ থেকে একটি চালভর্তি ট্রাক কিনতে ওই টাকা খরচ হয়েছে। ওই টাকা আর কখনই ফেরত পাওয়া যায়নি।
মুন্সিদের ওই লুটের পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদারে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। হ্যাঁ, এটা ঠিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সুপারিশের ফলে ব্যাংকের ভল্টগুলোতে আরেকটু সিমেন্টের প্রলেপ নিশ্চয়ই বাড়বে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ব্যাংকের ভেতর থেকেই যে লুটপাট হয় সেটা বন্ধ করতে হবে, সুটেড-বুটেড হয়ে আসা যেসব ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্য দিবালোকে ঋনের নামে লুটপাট চালাচ্ছেন তা বন্ধে সবার আগে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মূল লেখক: তাহমীমা আনাম, 'A Golden Age' বইয়ের লেখিকা





