সালাম অর্থ শান্তি ও নিরাপত্তা। মুসলিম সমাজের সেতুবন্ধন তৈরীর শ্রেষ্ঠ উপায় হলো সালাম। একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে সালাম যেমনি সহায়তা করে, তেমনি পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা ও বন্ধুত্ব স্থাপনের মাধ্যমে সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি স্হাপনের পথ প্রশস্থ করে ।
সালাম আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের একটি। সালাম ইসলামের সৌন্দর্য্য। একজন মুসলিম ভাইয়ের ওপর অপর মুসলিম ভাইয়ের হক।
মহান আল্লাহ বলেন, “যখন তোমাদের (সালাম বা অন্য কিছু দ্বারা) অভিবাদন জানানো হয়, তখন তোমরা তার চাইতেও উত্তম উপায়ে তার জবাব দাও কিংবা কমপক্ষে যতটুকু সে দিয়েছে ততটুকু ফেরৎ দাও, অবশ্যই আল্লাহ সবকিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখেন। (সূরা আন-নিসা, ৪:৮৬)
সালাম মানুষের মধ্যে পারস্পারিক শুভ কামনার শ্রেষ্ঠ সম্ভাষণ। এর বিকল্প যত শব্দ রয়েছে, যেমন- হাই, হ্যালো, গুডমর্নিং, গুডইভিনিং ইত্যাদি কোন কিছুই সালামের মতো নয়।
আসসালামু আলাইকুম মানে আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এই শুভ কামনা সুখে-দুখে, দিনে-রাতে, ছোট-বড়, ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবাই সবাইকে দিতে পারে। তবে এর পদ্ধতি কেমন হবে তা মহান আল্লাহ বলে দিয়েছেন। তাহলো অভিবাদন যতটুকু হবে জবাব তার চাইতে উত্তম পন্থায় হতে হবে। অর্থাৎ আসসালামু আলাইকুম বলা হলে জবাব হবে ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ। এখানে কন্ঠের মাত্রা, মধুরতা, আন্তরিকতা, চেহারার অভিব্যক্তি, সালাম প্রাদানকারীর চাইতে সালাম গ্রহণকারীর একটু বেশী থাকতে হবে যা আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ ।
সালাম কখন, কিভাবে এবং কোথায় শুরু হলো তার বর্ণনা সহীহ আল বুখারিতে উল্লেখ রয়েছে। আবু হোরায়রা (রা.)-এর বর্ণনায় নবী (স.) বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আঃ)-কে ষাট হাত (প্রায় ত্রিশ মিটার) লম্বা দৈহিক আকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেন। তাকে জীবনদানের পর আল্লাহ তায়ালা বললেন, “হে আদম! তুমি সেখানে যাও, ফেরেস্তাদের একটি জামায়াত অপেক্ষা করছে। তুমি তাদেরকে অভিবাদন জানাও এবং তাদের প্রতিউত্তর গ্রহন করো যা তোমাদের এবং তোমাদের পরবর্তী সন্তানদের পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাতের অভিবাদন হবে”।
হযরত আদম (আ:) ফেরেস্তাদের নিকট গেলেন এবং বললেন, “আসসালামু আলাইকুম” (আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক)। প্রতিউত্তরে ফেরেস্তারা বললেন, “ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ” (আপনার ওপরও শান্তি বর্ষিত হোক ও ক্ষমা বর্ষিত হোক)। তারা একটু বাড়িয়ে বললো, “ওয়া রহমাতুল্লা”। মহানবী (সঃ) আরও বললেন, “যে জান্নাতে প্রবেশ করবে সে হযরত আদম (আঃ) এর আকৃতি নিয়েই জান্নাতে প্রবেশ করবে”। অর্থাৎ এ হাদীস থেকে দেখা যায় যে, ফেরেস্তারা আরও উত্তম পন্থায় সালামের জবাব দিলেন যেমনটি আল্লাহর নির্দেশ।
উত্তম পন্থায় সালামের জবাব দেয়া সামাজিক সম্প্রীতি স্থাপনে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে। ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে কথা বার্তায় শুভ কামনা অনস্বীকার্য। পারস্পারিক সম্প্রীতি স্থাপনে সালামের গুরুত্বের কারণে প্রিয় নবী (স.) তার সাহাবিদের বেশী বেশী সালামে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
আবু হোরায়রা (রা.)থেকে বর্ণিত । রাসুল (স.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতকালে যেন তাকে সালাম দেয়। তারপর যদি তাদের দু‘জনের মধ্যে কোন গাছ, দেয়াল বা পাথর অন্তরাল হয় এবং এরপর আবার তারা মুখোমুখি হয় তাহলে যেন আবার তাকে সালাম করে।
একাধিক সহীহ হাদীসগ্রন্থে মুসলমানদের পারস্পারিক সাতটি হকের কথা বর্ণীত হয়েছে। সেগুলো হলোঃ ১. অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, ২. মৃত ব্যক্তির জানাজায় অংশগ্রহন করা, ৩. হাচিঁ দাতার আলহমদুল্লিাহ বলার জবাবে ইয়ারহামু কাল্লাহ বলা, ৪. দুর্বল ও বৃদ্ধকে সাহায্য করা, ৫. মাযলুমকে সহায়তা করা, ৬. সালামের প্রচলন করা এবং ৭. শপথ পূর্ণ করা। এখানে সালাম মুসলমানদের অন্যতম একটি হক। (রিয়াদুস সালেহীন- হাদীস ৬২৭ ও ৮৪৭)।
এক মানুষের সাথে অন্য মানুষের সম্প্রীতি এবং ভালবাসা হয় সালামের মধ্যমে। মহান আল্লাহ এই ভালবাসাকে ইমানের ভিত্তি বানিয়ে দিয়েছেন। নবী (সঃ) বলেছেন, “আমি সেই সত্তার শপথ করে বলছি, যার হাতে আমার জীবন –তোমরা ঈমান গ্রহন না করা পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানরদার হবে না যতক্ষণ না তোমরা একে অন্যকে ভালবাসবে। এ সম্পর্কে আমি তোমাদেরকে বলতে পারি যে, যদি তোমরা তা অনুশীলন কর তাহলে একে অন্যকে ভালবাসতে পারবে। এজন্য তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।” এ হাদীস থেকে এটা পরিস্কার যে, মুসলিম সমাজে সালামের প্রসার ঘটানো হচেছ জান্নাতে যাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ; কেননা সালাম মানুষের অন্তরে অন্যের প্রতি ভালবাসা তৈরী করে। আর এই ভালবাসা বৃদ্ধি করে ঈমান। (সহীহ মুসলিম- হদীস ৫৪, আবুদাউদ- হাদীস ৫১৯৩, তিরমিযি- হাদীস ২৬৮৯)
ইসলামের শিষ্টাচার নীতির দরজা হল সালাম। একজন ব্যাক্তি কতটা ভদ্র, শালিন, অহংকারমুক্ত, বিনয়ী এবং সর্বোপরি আল্লাহভীরু তা তার সালাম থেকে বুঝা যায়।
হযরত আয়েশা (রঃ) বলেন, “একদল ইহুদী রাসুল (সঃ)-এর খেদমতে এসে বললো- আসসালামু আলাইকা (আপনি নিপাত যান)। রাসুল (সঃ) বললেন- ওয়ালাইকুম (তোমরাও)। হযরত আয়েশা বলেন- আমি বললাম, “বাল আলাইকুম ওয়াল্লা নাতু (বরং তোরা নিপাত যা এবং তোদের প্রতি লানত)। তিনি বললেন, “হে আয়েশা! আল্লাহ নম্রতা পছন্দ করেন। হযরত আয়েশা (রা.) আরজ করলেন- আপনি শুনেননি এরা কি বলেছে? তিনি বললেন আমিও তো ওয়ালাইকুম বলে দিয়েছি।” (সহীহ মুসলিম, কিতাব আসসালাম- হাদীস ৫৩৮৪)
এখানে নবী (সা:) সালামের শুধু ভদ্রচিত জবাব দিয়েছেন। কোন মন্দ শব্দ ব্যবহার করেননি। এমনকি নিজ স্ত্রী আয়েশাকে নম্রতা অবলম্বনের উপদেশ দিয়েছেন। অন্য ধর্মাবলম্বীদের আগে সালাম দেয়া নিষেধ। যদি তারা যথার্থভাবে সালাম প্রদান করেন তাহলে যথার্থভাবে সালামের উত্তর দেয়ার ব্যাপারে অধিকাংশ ইসলামিক পন্ডিতগণ একমত হয়েছেন। আর যদি তারা বিকৃতভাবে সালাম প্রদান করেন তাহলে কেবল ওয়ালাইকুম পর্যন্ত বলা যাবে ।
সালামের আদব সর্ম্পকে ইমাম বুখারি এবং ইমাম মুসলিম উভয় সূত্রে বর্ণিত, নবী (সঃ) বলেছেন, “চলমান ব্যাক্তি পথচারীকে সালাম দিবে, পথচারী বসা ব্যাক্তিকে, ছোটদল বড়দলকে এবং কমবয়ষ্ক বেশীবয়ষ্ককে সালাম দিবে”। আবু দাউদও তিরমিযি সূত্রে বর্নিত , নবী (সঃ) বলেছেন, “তুমি যখন কোন মজলিশে যোগদান করবে তখন উপস্থিত ব্যাক্তিদেরকে সালাম দিবে এবং যখন তুমি সেখান থেকে প্রস্থান করবে তখনও তুমি সালাম দিবে; কেননা প্রথম অভিবাদন শেষ অভিবাদনের চেয়ে উত্তম”। অর্থাৎ ছোট বড়কে সালাম দিবে, এটি একটি সামাজিক আদব যা সালামের মাধ্যমে শিখানো হয়েছে। (সহীহ আল-বুখারি- হাদীস১১, সহীহ মুসলিম- হাদীস ২১৬০, আবু-দাউদ- হাদীস ৫২০৮, তিরমিযি-হাদীস ২৭০৭)
ইমাম তিরমিযি এবং ইবনে মাযাহ উভয় সূত্রে উল্লেখিত, মহানবী (সঃ) বলেছেন, “হে লোক সকল! নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও , অন্যকে খাবার খাওয়াও, রক্তের সম্পর্কিত আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি সদয় হও এবং রাত্রিকালে সকলে যখন ঘুমিয়ে যায় তখন জায়নামাজে দাঁড়াও, তাহলে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।” (তিরমিযি- হাদীস২৪৮৭, ইবনেমাযাহ- হাদীস১৩৩৫ ও ৩২৫১)
ইমাম বোখারী এবং ইমাম মুসলিম উল্লেখ করেছেন যে, জনৈক ব্যক্তি নবী (সঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন- কোন ইসলাম সর্বোত্তম? তিনি উত্তরে বললেন-মানুষকে খাবার খাওয়ানো এবং পরিচিত অপরিচিত সকলকে সালাম দেয়া। (সহীহ আল-বুখারী- হাদীস ১১, সহীহ মুসলিম- হাদীস ৩৯, আবুদাউদ- হাদীস ৫১৯৪)
পারিবারিক সৌহার্দ রক্ষায় সালামের ভূমিকা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন, “অত:পর যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ কর, তখন তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম করবে। এটা আল্লাহর কাছ থেকে কল্যাণকর ও পবিত্র দোয়া।” (সূরা আন নূর, ২৪:৬১)
মানুষ নিজ পরিবারের লোকদের প্রতি সালাম জানানোর মাধ্যমে প্রকৃত পক্ষে সে নিজের জন্যই দোয়া করে থাকে। আর এই দোয়া অন্য কারো পক্ষ থেকে নয়; বরং স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে । এর মাধ্যমে স্রষ্টার সাথে বান্দার সম্পর্ক এবং ব্যক্তির সাথে তার আত্মীয়-স্বজনদের সম্পর্ক স্থাপিত হয়।
ব্যক্তি নিজের শয়ন কক্ষে প্রবেশকালে সালামসহ স্ত্রীর অনুমতি গ্রহন করলে স্ত্রীর সুযোগ থাকে স্বামীর কক্ষটি পরিপটি করে রাখার । এতে উভয়ের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় থাকে।
পারিবারিক অধিকার সংরক্ষণে সালামের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদার ব্যাক্তিরা! তোমরা নিজের ঘর ছাড়া অন্য কারো ঘরে-সে ঘরের লোকদের অনুমতি না নিয়ে ও তাদের বাসিন্দাদের প্রতি সালাম না করে কখনো প্রবেশ করো না; এটা তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে করে তোমরা (কথাগুলো) মনে রাখতে পারো’।” (সূরা আন নূর, ২৪:২৭)
মহান আল্লাহ তার বান্দাদেরকে ভদ্রতা ও শালিনতার শিক্ষা দিয়েছেন সালামের মাধ্যমে। মহানবী (স.) কারো ঘরের দরজায় সরাসরি দাঁড়াতেন না; কেননা তাহলে ঘরের ভিতরের দৃশ্য দৃষ্টগোচর হতে পারে।সহীহ আল বুখারী এবং সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সঃ) বলেছেন, “ যদি কেউ তোমাদের বাড়িতে উকি মারে, তুমি যদি তাকে পাথর মেরে চোখ ফুটো করে দাও, তাহলে তোমার কোন দোষ নেই।” (সহীহ আল-বুখারী- হাদীস ২০৬৩)। অর্থাৎ- এ হাদীস থেকে দেখা যায় যে, প্রত্যেক মানুষ নিজ গৃহের গোপনীয়তা রক্ষা করার অধিকার রাখে।
সালামের মাধ্যমে নিজের পরিচয় দিয়ে অনুমতি গ্রহণ করতে হয়। মেরাজের রাতে জিবরীল (আ.) প্রতি আসমান অতিক্রম করার সময় সালামসহ নিজের পরিচয় ও তার সংগী মুহাম্মদ(স.) এর পরিচয় দিয়েছিলেন। (রিয়াদুস সালেহীন-হাদীস ৮৭৪)।
জনৈক ব্যক্তি রাসুল (স.) এর ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে রাসুল (স.) তার খাদেমকে নির্দেশ দিলেন ঐ ব্যাক্তিকে সালামের পদ্ধতি শিখানোর জন্য। সালামের পর নিজের নাম না বলে আমি বলা রাসুল (স.) পছন্দ করতেন না। (রিয়াদুস সালেহীন- হাদীস ৮৭২, ৮৭৫, ৮৭৬ ও ৮৭৭)।
বর্তমান যুগে মানুষের কথা-বার্তার নানা উপায় রয়েছে। যেমন- ফোন, মোবাইল, Skype, Viber-সহ নানা মাধ্যমে মানুষ একে অন্যের সাথে কথা-বার্তা বলে থাকেন। ইসলামী সম্ভাষণ রীতি অনুযায়ী কথা শুরু হবে সালামের মাধ্যমে। কিন্তু সাধারণ মুসলিম তো বটেই আলেম-ওলামা পর্যন্ত হ্যালো শব্দ দিয়ে (ফোন, মোবাইল, Skype, Viber) কথা বলা শুরু করেন। এতে মুসলিম সমাজের মধ্যে সালামের মাধ্যমে যে সম্প্রীতি গড়ে ওঠার কথা তা সম্ভব হচ্ছে না। মহান আল্লাহ সালামের মধ্যে যে কল্যাণ ও দোয়া রেখেছেন তা থেকেও মুসলিম সমাজ ক্রমাগত অধিকহারে বঞ্চিত হচ্ছে। এটা মুসলমানদের বড় ধরণের একটা অজ্ঞতা। তারা একটা অসাধারণ সম্ভাষণ পদ্ধতির পরিবর্তে অর্থহীন একটা পদ্ধতি অনুশীলন করে।
সালামের স্বাভাবিক রীতির অনেক ব্যাতিক্রমও আমাদের মুসলিম সমাজে দেখা যায়। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে দেখা যায় যে, নেতা সবসময় কর্মীর নিকট থেকে সালাম প্রত্যাশা করে। কর্মী কতটা অনুগত তা সালামের অভিব্যক্তি থেকে পরখ করে নেয়। নেতা কেবল লক্ষ্য করেন কর্মী সালাম দিল কিনা, কতটা অনুগত অভিব্যক্তিতে সালাম দিল। এসবের ওপর কর্মী কতটা অনুগ্রহ পাবে সে বিষয়টি নির্ভর করে। তিনি (নেতা) কেবল মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দেন যে, সালাম তিনি পেয়েছেন।
অফিসের বস অধিনস্তদের নিকট থেকেও সালাম গ্রহণ করেন। যেহেতু তিনি উর্ধতন কর্তৃপক্ষ সেহেতু সালাম তাকে দেয়া হবে- আনুগত্য ও সম্মানের কারণে। তিনি মাথা নেড়ে, তাকিয়ে, হাসি দিয়ে-এরূপ কোন একটি ভংগিতে সালাম গ্রহণের কাজটি সারেন। এছাড়া দেশের আলেম ওলামা, খতিব, ইমাম এবং সর্বোপরি যারা দাঁড়ি ও টুপিওয়ালা তারাও কেবল সালাম গ্রহণ করেন। তবে তারা সালামের জবাব দেয়, পরিপূর্ণ হক আদায় না করে হলেও। এখানেও একশ্রেণী কোন না কোন দিক দিয়ে নিজেদেরকে সুপিরিয়র মনে করেন। দেশের শিক্ষক শ্রেণীও ছাত্রদের নিকট একইভাবে সালাম প্রত্যাশা করেন।
সামাজিক সম্প্রীতি স্থাপনে এরূপ সালাম যৎকিঞ্চিতও অবদান রাখে কিনা সন্দেহ আছে। বড়ত্ব, সম্মান, ক্ষমতা, ধন-সম্পত্তি ইত্যাদি কারণে সালাম গ্রহণকারী ব্যাক্তি আল্লাহর রহমত, শান্তি ও ক্ষমা লাভের পরিবর্তে আল্লাহর লানত বা অভিশাপের হকদার হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী থাকে। এখানে একে অন্যের প্রতি দোয়া ও শুভকামনার বিষয়টি অনুপস্থিত থাকে। ফলে এরূপ সালাম সামাজিক সৌহার্দ্য গড়ে তুলতে পারেনা। সুদৃঢ় সামাজিক সম্পর্কের বন্ধন ছাড়া একটি সুখী সমাজ বিনির্মান করা সম্ভব নয়।
আমাদের সমাজের গড়ে নব্বই ভাগ মুসলমান হওয়া সত্বেও তারা ইসলাম ও ইমানের সাথে অপরিহার্য বিষয়গুলো না জানা ও না মানার কারণে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ সৃস্টি হচ্ছে না।
সালাম সমাজের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি তৈরী করে। সম্প্রীতি সচ্চরিত্রতার এবং বিদ্বেষ অসচ্চরিত্রতার ফল। সচ্চরিত্রতা পারস্পারিক বন্ধুত্ব ও আনুগত্যের কারণে হয় এবং অসচ্চরিত্রতা ঘৃণা, শত্রুতা ও বিচ্ছিন্নতার ফল। সম্প্রীতি মানুষের প্রতি আল্লাহর একটি বড় নেয়ামত। যেমন- মহান আল্লাহ বলেছেন, “আপনি পৃথিবীস্থ সবকিছু ব্যয় করেও মানুষের অন্তরে সম্প্রীতি স্থাপন করতে পারতেন না, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন করেছেন।” (সূরা আনফাল, ৮:৮৩)।
আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যে সম্প্রীতি স্থাপন করেছেন তার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে সালাম। তবে এই সম্প্রীতি ও বন্ধুত্ব কেবল মুমিনদের মধ্যে থাকাই বাঞ্চনীয়। যেমনঃ আল্লাহ বলেন, “ আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাসী সম্প্রদায়কে তুমি পাবেনা যে তারা সেই ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব করে, যে আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধীতা করে, যদিও সে তাদের পিতা বা পূত্র হয়।” (সূরা তাওবাহ :২৩৯) অর্থাৎ বন্ধুত্ব ও ভালবাসা আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরোধীতাকারীদের সাথে নয়, তারা পিতা বা পূত্রের ন্যায় আপনজন হলেও।
ইমাম গাজালী-রহ. তার এহইয়াউউলুমুদ্দীন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন-আল্লাহ তায়ালা হযরত ঈসা (আ:)-এর প্রতি ওহী পাঠান- যদি তুমি সমগ্র আকাশ ও পৃথিবীর বাসিন্দাদের সমপরিমান আমার ইবাদত কর,আর আল্লাহর জন্য মহব্বত ও আল্লাহর জন্য শত্রুতা তোমার মধ্যে না থাকে, তবে সে ইবাদত তোমার কোন উপকারে আসবে না। এজন্য হযরত ঈসা তার উম্মতদের বলেন, “গোনাহগারদের সাথে শত্রুতা করে আল্লাহ তায়ালার মহব্বত সৃষ্টি কর। তাদের কাছ থেকে দূরে সরে আসার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন কর এবং তাদেরকে নারাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ কর। (ইমাম গাজালী-রহ., অনুবাদ: মুহউদ্দীন খান, এহইয়াউউলুমুদ্দীন: ২য়খন্ড, মদীনা পাবলিকেশান্স, ঢাকা, ৭ম সংস্করন, ২০০৭, ৪২১)
সালামের মাধ্যমে একজন মুসলিমের বিনয়, ভদ্রতা, শ্রদ্ধা, ভালবাসা, উদারতা, কল্যাণ-কামনা, সহিষ্ণুতা ইত্যাদির মতো সৎগুণাবলীর প্রতিফলন ঘটে। যে সালাম দেয় তার মনে অহংকার থাকে না। আল্লাহর নিকট উত্তম সে ব্যাক্তি যে আগে সালাম দেয়। সবচেয়ে সে কৃপন যে সালাম দিতে কার্পন্য করে। সালাম হলো মুসলিম সমাজের সামাজিক সম্প্রীতির জাল। একজন ভাল মুসলিম এই সম্প্রীতির জাল কখনো ছিন্ন করে না।
প্রিয় নবী (সঃ) বলেন, ‘কোন মুসলমানের জন্য তার মুসলমান ভাইকে তিন দিনের বেশী পরিত্যাগ করা কিংবা পরস্পর দেখা হলে এক জনের একদিকে এবং অন্যজনের ওদিকে মুখ ফিরিয়ে রাখা যায়েয নয়। তাদের মধ্যে উত্তম সে ব্যাক্তি, যে প্রথমে সালাম প্রদান করে। (রিয়াদুস সালেহীন-হাদীস১৫৯২)। অর্থাৎ সালাম ছিন্ন সম্পর্ক জোড়া দেয়। তবে যে মিশনকে সামনে রেখে মুসলমানরা এই সামাজিক সম্প্রীতির জাল রক্ষা করে তাহলো- তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর মনোনীত দ্বীনি সমাজ প্রতিষ্টা করবে। অথচ আজকের বাংলাদেশে মুসলিম সমাজের সম্প্রীতি এতটাই দুর্বল ও ছিন্ন যে, তারা অপরাধীদের নিকট জিম্মী ও তাদের হাতের পুতুল। এমনকি তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের নিরাপত্তা খোঁজে যা ঈমানের পরিপন্থী।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকলে তারাই বরং সমাজকে অপরাধমুক্ত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারতো। যে মহান আল্লাহর আরেক নাম সালাম, তারই বান্দাদের প্রকৃত আব্দুস সালাম হওয়া ছিল ঈমানী দায়ীত্ব। এ ঈমানী দায়ীত্ব পালনের মাধ্যমে তারা সমাজে শান্তি ,শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি স্থাপনে এগিয়ে আসতে সক্ষম হতো, যদি তারা যথাযথভাবে সালামের প্রসার ঘটাতে পারতো। সুতরাং যে ব্যক্তি ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ চায় তারই উচিত সালামের প্রসারে আন্তরিক হওয়া ।
লেখক: গবেষক, শিক্ষক।
ইমেইল: [email protected]





