সাংবাদিকরা সমাজের দর্পন। জাতির বিবেক। প্রতিদিন সংবাদ পিপাসু মানুষের দ্বারে নতুন নতুন খবর নিয়ে হাজির হয় সাংবাদিকরা। তাদের লেখনি বা সংবাদ উপস্থাপনের মাধ্যমে সকালে চায়ের কাপে ঝড় থেকে শুরু করে মানুষ সুফল পেতে শুরু করে।

নির্যাতিত মানুষেরা শেষ আশ্রয়স্থল হিসাবে সাংবাদিকদের দ্বারস্থ হয়। আর সাংবাদিকরা জাতির সামনে তুলে ধরে সুবিধা বঞ্চিত মানুষের সুখ-দুঃখ,হাসি-কান্না,সাফল্য-ব্যর্থতার কথা। কিন্তু সেই সাংবাদিক যখন নির্যাতিত হয় তখন সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?

মঙ্গরবার ২১ জুন সাংবাদিক নির্যাতন দিবস। ১৯৯২ সালের এই দিন তৎকালীন সরকারেরস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরীর নির্দেশে পুলিশ জাতীয় প্রেসক্লাবেহানা দিয়ে সাংবাদিকদের ওপর নির্বিচার হামলা চালায়।

এ দিন পুলিশেরবেপরোয়া লাঠিপেটায় ১০-১২ জন সাংবাদিকসহ জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যরা গুরুতরআহত হন।  তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক এখনও ওই হামলার ক্ষত বয়েবেড়াচ্ছেন। এরপর থেকে দেশের সাংবাদিক সমাজ ২১ জুনকে ‘সাংবাদিক নির্যাতনদিবস’হিসেবে পালন করে আসছে।

সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন বস্তুনিষ্ঠতার শপথ নিয়েই। রাজনীতিবিদদের নষ্ট মানসিকতা ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সম্প্রসারণ সাংবাদিক পেশাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিবিসি’র সাংবাদিক উইলিয়াম ক্রলি ও মার্ক টালিকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বহিষ্কার করা হয়েছিল। যে সব দেশে গণতন্ত্র নেই যেমন মধ্যপ্রাচ্য, চীন, লিবিয়া,মিয়ানমার,পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া প্রভৃতি দেশে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নেই।

গণমাধ্যমগুলো জনগণের চাহিদানুযায়ী খবর পরিবেশন করতে পারে না। আবার কিছু দেশে গণতন্ত্র থাকলেও স্বাধীন সাংবাদিকতা মেনে নিতে পারেন না সে সব দেশের নোংরা রাজনীতিবিদরা। অবস্থাটা এমন যে তথ্য গোপন করে তারা যুগের পর যুগ ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকবেন।

একুশ শতকের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে,বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার এই সময়ে তথ্য গোপন রাখার কোনো সুযোগ যে নেই সেটা তারা বুঝতে চান না। তারপরও যখন তারা সে চেষ্টা করেন এবং সাংবাদিকরা সেই অপচেষ্টা রোধ করে তখন তাদের আক্রোশ গিয়ে পড়ে সাংবাদিকদের ওপর।

সাংবাদিকের পরিবার অর্থ সংকটে: স্বাধীন সাংবাদিকতা খুবই জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব কিছুতেই ব্যবসার মানসিকতা। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও অথবা ইলেকট্রনিক্স সংবাদপত্রের মালিকদের বাণিজ্যিক স্বার্থজনিত কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে প্রতিযোগিতার এই যুগে গণমাধ্যমগুলোর কোনো খবর গোপন করার সুযোগ নেই বললেই চলে। কোনো প্রচার মাধ্যম তথ্য গোপন করলে অন্যরা তা প্রকাশ করে এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশেও গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বার্ষিক রিপোর্টে জানিয়েছে, ২০১৩ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকরা রোষানলের শিকার হয়েছেন। নিহত ও আহত বেশির ভাগ সাংবাদিকের পরিবার অর্থ সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থ সাংবাদিকদের পরিবার-পরিজন রাষ্ট্রীয় সহায়তা কমই পেয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের পোষ্যরা নির্যাতনের ভয়ে প্রতিকার চান না।

অনেকে আবার মামলা করে চরম আতঙ্কে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপদে আছেন। তবুও এত কিছুর পর সৎ সংবাদকর্মীর বিশ্বাস অটুট থেকে যায়। বন্দুকের নল কিংবা কামানের গোলার চেয়েও শক্তিশালী হচ্ছে কলম। সব নির্যাতন-নিপীড়ন উপেক্ষা করে সাংবাদিকরা তাদের মহান পেশার পবিত্র কলম চালিয়ে যাবেন।

বিশ্বে ৯০ শতাংশ সাংবাদিক হত্যার কোনো বিচার হয়নি: বিশ্বে ৯০ শতাংশ সাংবাদিক হত্যার কোনো বিচার হয়নি বলে জানিয়েছে কমিটি ফর প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস নামক একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন।

সম্প্রতি সংগঠনটি সাংবাদিক হত্যা বিষয়ক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার হামলার পর গোটা বিশ্বেই যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আর এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। হত্যাকাণ্ডের শিকার সাংবাদিকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জেমস ফলি এবং স্টিভেন স্টলফের নাম উল্লেখযোগ্য।

ইরাকে ইসলামিক স্টেট যোদ্ধাদের হাতে তারা নিহত হন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে,সাংবাদিকরা হত্যার শিকার হচ্ছেন এটা যেমন সত্যি তেমনি সাংবাদিক হত্যার জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এটাও সত্যি।

আর অপরাধীরা বিচারের আওতার বাইরে থাকার কারণে সংবাদিকদের হত্যা থেকে পিছু হটছে না বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনগুলো। এক লিখিত বক্তব্যে সংগঠনটি আরো জানায়,‘গত দশক থেকে সাংবাদিকদের উপর চড়াও হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

রাষ্ট্রগুলোর সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দেয়ার বিষয়টি পুনরায় খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ যুদ্ধ হোক আর বন্যাই হোক সাংবাদিকদের ঘটনাস্থলে যেতে হয়। আর ঘটনাস্থলে গিয়ে যদি সাংবাদিকদের মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয় তাহলে ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা হুমকির মধ্যে পড়বে।’

সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যা বেড়েছে: সম্প্রতি বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যা বেড়ে গেছে। কিন্তু জাতির বিবেক গণমাধ্যম কর্মীদের দুর্ভাগ্য যে, এসব হত্যাকান্ডের কোনোটিরই সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায় বিচার হচ্ছে না।  গত এক দশকে ঘটে যাওয়া সাংবাদিক হত্যাকান্ডের বিচার কাজ এখনো ঝুলে রয়েছে। কয়েকটি মামলার ক্ষেত্রে বছরের পর বছর সময় নিয়েও তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা,মূল অপরাধীদের পাশ কাটিয়ে চার্জশিট দেয়া,দুর্বল অভিযোগ উত্থাপন এবং চার্জশিটভুক্ত আসামিদের গ্রেফতার না করার অভিযোগ আছে।

এমনকি প্রভাবশালী খুনিদের পক্ষ নিয়ে নিহত সাংবাদিকের পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখানোরও অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন উঠেছে নিম্ন আদালতে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও। এক দশকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে ২৩ জন সাংবাদিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন।

সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনী হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে এ সংখ্যা ২৫-এ দাঁড়িয়েছিলো। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে এসব বিচারের জন্য বার বার আশ্বাস দেয়া হলেও তা হয় নি। বিরোধীদলের থাকা নেতারা সভা সেমিনারে বক্তব্য বিবৃতি দিলেও তারা যখন ক্ষমতায় থাকে তারা বিচার করে নি। অবস্থা এমন হয়েছে ‘‘বিচার পায় না,তাই বিচার চায় না’’। ২০১১ সালের ২৭ জানুয়ারি নিজ বাসায় স্ত্রীসহ খুন হন সাংবাদিক ফরহাদ খাঁ। 

দিবসটি স্মরণে সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ইউনিয়ন কার্যালয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) এই আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।

ডিইউজের সভাপতি শাবান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী।

ওএফ