২৪ এপ্রিল! রানা প্লাজা! অসংখ্য মৃত্যু! বিশাল ধ্বংস স্তুপ! এসবের সমারোহে রানা প্লাজা ট্রাজেডি। সেই বিভীষিকাময় মৃত্যুকূপ চোখের সামনে একটা ভয়াল ক্ষণের চিত্র ফুটিয়ে তোলে যার স্মরণে আজও প্রাণ শিউরে ওঠে। একটি রানা প্লাজা শুধু মাত্র একটি ভবনের ধ্বস নয় বরং তা জীবিত-মৃত অসংখ্য প্রাণের আকুতি।
এই আকুতি শুধু নিজে বাঁচার জন্যে নয় বরং অন্যকে বাঁচানোও তার মূল লক্ষ্য। আছে তার খোঁড়া পরিবারের ঘানি টেনে জীবন সংগ্রামে এগিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। দুঃখী মায়ের চোখে জল মুছে দেওয়ার অক্লান্ত পরিশ্রম আর অতি আদরের বোনের মুখে হাসি ফোটাবার সংগ্রাম। কারো বা সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেবার সম্বল, স্ত্রীর রুটি-রুজির ব্যবস্থা করার একমাত্র পাথেয় কিংবা স্বমীর জন্য করা কোন স্ত্রীর মহান ত্যাগ।
এই সকল কিছুই হঠাৎ করে চাপা পড়লো সাভারের রানা প্লাজার বিশাল মৃত্যুকূপে। সেই দিন কারো ভুলবার নয়। ভুলতে পারবে না প্রিয়জনের বেদনায় গুমরে কেঁদে ওঠা হৃদয়গুলো।
হ্যাঁ আজ সেই অবর্ণনীয় বেদনার দিন। আজ ২৪ শে এপ্রিল; রানা প্লাজা ট্রাজেডি দিবস। ২০১৩ সালের এই দিনে সাভারের রানা প্লাজা নামক বিশাল ধ্বংস স্তুপের নিচে চাপা পড়ে মানবতা। দু’বেলা দু’মুটো খেয়ে একটু বাঁচার জন্য যারা জীবন সংগ্রামে ব্রতী হয়ে কাজের জন্য রানা প্লাজায় গিয়েছিলেন। তারাই রানা প্লাজার খোরাক হয়ে ফিরেন, কারো আবার এখনো ফেরা হয়নি।
২৪ এপ্রিল ২০১৩ বুধবার সকাল ৮:৪৫ ঢাকার অদূরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে সাভার বাসস্ট্যান্ডে রানা প্লাজা নামের একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ে। ভবনের কয়েকটি তলা মাটির নিচে দেবে যায়; কিছু অংশ পাশের একটি ভবনের ওপর পড়ে। এ দূর্ঘটনায় ১ হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক নিহত এবং দুই হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয় যেটিকে বিশ্বের ইতিহাসে ৩য় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত করা হয়েছে।
ভবনটিতে পোশাক কারখানা, একটি ব্যাংক এবং একাধিক অন্যান্য দোকান ছিল, সকালে ব্যস্ত সময়ে এই ধসের ঘটনাটি ঘটে।
ভবনটি রানা প্লাজা হিসেবে পরিচিত এবং এর মালিক সোহেল রানা সাভার পৌর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশেই নয়তলা রানা প্লাজা ভবনটি। এতে ভূগর্ভস্থ তলায় গাড়ি রাখার জায়গা। দ্বিতীয় তলার বিপণিকেন্দ্রে বহু দোকান ছিল। তৃতীয় থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত পোশাক কারখানা। এর ওপরের দুটি তলা খালি ছিল। ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ছিল প্রথম তলায়।
গার্মেন্টস কারখানায় প্রায় ৫০০০ এর মত কর্মী কাজ করত। ২০০৭ সালে রানা প্লাজা নির্মাণ করার আগে জায়গাটি ছিল পরিত্যক্ত ডোবা। ভবন নির্মাণ করার আগে বালু ফেলে এটি ভরাট করা হয়।
তৎকালীন বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর প্রধান আলী আহমেদ খান জানিয়েছিলেন যে, ভবনের উপরের চার তলা অনুমতি ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছিল।
ভবনটিতে ফাটল থাকার কারণে ভবন না ব্যবহারের সতর্কবার্তা থাকলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছিল।
২৩ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে ফাটল নিশ্চিত হওয়ার পর ভবন ছেড়ে চলে যেতে বলা সত্ত্বেও, অনেক গার্মেন্টস শ্রমিকদের পরের দিন কাজে ফিরতে বলা হয়, তাদের সুপারভাইজার ভবনটিকে নিরাপদ ঘোষণা করে। যদিও ফাটলের খবর স্থানীয় সংবাদ চ্যানেলেসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল। ৯তলা ভবনটি সকাল ৯:০০ টার দিকে প্রথম তলা বাদে বাকি সবগুলি তলা ধসে পড়ে। ধসে পড়ার সময় ভবনটিকে প্রায় ৩০০০ কর্মী ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল নয়টার দিকে হঠাৎ করে বিকট একটি শব্দ হয় এবং কাঁপুনিকে তারা ভূমিকম্প মনে করেন। পরে বেরিয়ে দেখেন বিরাট এলাকা ধুলা বলিতে ধোঁয়াটে হয়ে পড়েছে।
ঐ সময় ভবনে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিল নারী যাদের সাথে তাদের অনেকের শিশু সন্তানও সেখানে নার্সারী সুবিধায় ছিল।
রানা প্লাজা ধসে ৫৯ জেলার ১ হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক নিহত ও নিখোঁজ হন। এঁদের মধ্যে ৮৩৫ জনের লাশ প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হয় ও তিন দফা ডিএনএ পরীক্ষায় ১৭৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত হয়। তবে ডিএনএ নমুনা মিললেও ১৭ জনকে শনাক্ত করা যায়নি। নিখোঁজ শ্রমিকের সংখ্যা ১৬২।
সরকার ও পোশাক-মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর হিসাবে রানা প্লাজা ধসে নিহত শ্রমিকের সংখ্যা এক হাজার ১৩৬ জন। তাঁদের মধ্যে নারী ৭১৫ ও পুরুষ শ্রমিক ৪৬০ জন।
২৪ এপ্রিল সেই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনায় রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ১১৩৫টি মরদেহ। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো দুই শ্রমিক মারা যায়। মৃত্যুকূপের অন্ধকার গলি থেকে ফিরে আসা আহতদের সংখ্যা ২৪০০ ছাড়িয়েছিল।
স্থানীয় সাধারণ জনগণ, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তি ও সংগঠন উদ্ধারকাজ চালায়।
ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ২৫ এপ্রিল একদিনের জাতীয় শোক পালন করা হয়।
এঘটনার পর বিভিন্ন প্র উত্তেজিত পোশাক শ্রমিকরা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবীতে ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যপক আন্দোলন করেছিল।
ঘটনার প্রতিক্রয়ায় তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি এই ঘটনায় দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবিতে ২রা মে সারাদেশে হরতাল ঘোষণা করে কিন্তু পরবর্তীতে হরতাল বাতিল ঘোষণা করে।
২৫ শে এপ্রিল ’ঢাকা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ধ্বসে পড়া ঐ ভবন এবং ভবনের গার্মেন্টস মালিকদেরকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের করেন। এই দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করতে সরকারিভাবে আলাদা কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এদের সাত দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবার আহ্বান করা হয়। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঘটনায় দায়ীদেরকে দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন।
২৭শে এপ্রিল এই ভবনের দুটি গার্মেন্টসের মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া সাভার পৌরসভার দুজন প্রকৌশলীকেও গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেয়া হয়। বহু নাটকীয়তার পরে ২৮শে এপ্রিল এই ঘটনায় দায়ী ভবন মালিক সোহেল রানাকে বেনাপোল সীমান্ত থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেপ্তার করে র্যাব।
আজ ২৪ এপ্রিল ঘটনার তিন বছর পূর্ণ হল। নামমাত্র ব্যবস্থা নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত ঘটনার মহানায়ক সোহেল রানার বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তির ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। রানা প্লাজা ধসের পর এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দোষী সোহেল রানার মালিকানাধীন রানা প্লাজার ভূমি, সাভার বাজার রোডে অবস্থিত একটি বহুতল ভবন, দুটি বাড়ি ও ধামরাইয়ের একটি ইটভাটা সরকারের অনুকূলে নেওয়ার নির্দেশ দেন মহামান্য হাইকোর্ট। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই বিপুল সম্পত্তির যথাযথ ব্যবহার নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি সরকারপক্ষ।
উদ্বেগের এ বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখ্তার বলেন, এত দিনেও সোহেল রানার সম্পত্তি যথাযথভাবে ব্যবহার না করে ফেলে রাখার অর্থ হলো একটি সুযোগ তৈরি করে রাখা। যাতে সোহেল রানা কিংবা তার উত্তরসূরিরা ভবিষ্যতে ওই সম্পত্তিগুলো নিজেদের দখলে নিতে পারে।
সাম্প্রতিককালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ৪১ জনের বিরুদ্ধে দেয়া চার্জশিট আদালত আমলে নিয়েছেন। এ মামলায় ২৪ জন পলাতক অসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। পরপর দুইবার সাক্ষী হাজিরে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্টরা। দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে ৪টি মামলা হলেও তার মাত্র একটিতে চার্জশিট দেয়া হয়েছে।
ভয়াবহ এ হত্যাকাণ্ডের মামলা দীর্ঘদিনেও নিষ্পত্তি না হওয়ার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্টদের শ্রমিকদের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার অভাবকে দায়ী করছেন শ্রমিকনেতাগণ। তাদের দাবি এই অপরাধের দ্রুত বিচার করা। এই হত্যাকাণ্ডে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এভাবে মারা যাবে, অগ্নিকাণ্ড ঘটবে, কারখানা বন্ধ হবে।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আকতার মনে করেন ক্ষমতা আর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণেই রানা প্লাজার মালিক রানাসহ সংশ্লিষ্টদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি। অভিযুক্তদের কেউ কেউ জামিন পাওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, এতবড় হত্যাকাণ্ডের পর কিভাবে অপরাধীরা জামিন পায়। ক্ষমতাশালী এসব ব্যক্তিরা হয়তো ভাবছে, মামলা যত সময় গড়াবে মানুষ এ ঘটনা ভুলে যাবে, তাদের কাছে গুরুত্ব হারাবে। আর সে সুযোগ নিতেই হয়তো বিচারের এই দীর্ঘসূত্রিতা।
রানা প্লাজা ধসের পর নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ এবং অন্যসব শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা। সেইসঙ্গে এখনও নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারকে সহায়তা দেয়া, শারীরিককভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনবার্সনের দাবি জানান শ্রমিক নেতাগণ।
রানা প্লাজা আজও ভুক্তভোগীদের কাছে একটা আর্তনাদের করুণ ইতিহাস। এখনো প্রিয়জন/অভিভাবক হারানোর বেদনা তাড়া করে ফিরে তাদের। কারো একমাত্র সন্তান, সংসারের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে নিঃস্ব তারা।
প্রিয়জনহারা অনেকের কাছে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপ একটা সমাধি যেখানে তাদের প্রিয়জনরা ঘুমিয়ে আছে নীরব অভিমানে। এ অভিমান তাদের মায়ের সাথে, দেশমাতার সাথে। দেশ মাতার উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে এসে যারা নির্মম বলির স্বীকার হয়েছে।
এখনো সন্তান হারা মা-বাবা, বাবা-মা হারা সন্তান, প্রাণের প্রিয়জনহারা, এমনি অনেক স্বজনহারা, বাঁধনহারা মানুষ আজও মৃত্যুকূপের কাছে এসে নীরবে চোখের জল ফেলে। তারা জানে, যে চলে গেছে সে আর ফিরে আসার নয়। তবুও প্রাণের টানে অনেকে বৃথা খুজেঁ ফেরে চিরচেনা সেই মুখ, সেই মায়া মমতা, ভালবাসা। ধ্বংসস্তুপের পানে চাওয়া ছলছল আঁখিতে ভেসে ওঠেফেলে আসা সেই স্মৃতি।
সবকিছু হারিয়েও স্বজনদের একটাই প্রাণের দাবি, আর কোনো শ্রমিককে যেন এমন করুণ মৃত্যুর শিকার না হতে হয়। সেজন্য অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের প্রার্থনায় স্বজনরা।





