গাজায় গত ১ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলি আগ্রাসনে এ পর্যন্ত (১১ আগস্ট ২০১৪) ১,৯৪০ ফিলিস্তিনি শহীদ এবং ১০,০০০’র বেশি আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, এবারই প্রথম হামাসের পাল্টা হামলায় ইসরাইলের হিসাব মতে তাদের ৬৪ সেনা নিহত হয়েছেন। এছাড়া, আরো প্রাণহানী হয়েছে অপর তিন বেসামরিক নাগরিকের। তবে, হামাসের দাবি, তাদের হাতে খতম হয়েছেন অন্তত ১৫০ ইসরাইলি সেনা।
একদিকে বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ইসরাইলি বাহিনী, যাদের পক্ষে নগ্ন সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা, কানাডা ও জাতিসংঘসহ বিশ্বের তাবত মহাশক্তিধর গোষ্ঠীসমূহ। অন্যদিকে, বিমান, ট্যাংক তো দূরের কথা সামান্য নিজেদের হাতে তৈরি রকেট দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে অবরুদ্ধ গাজার প্রানের সংগঠন হামাস। এমন অসম যুদ্ধ বিশ্বের ইতিহাসে ইতিপূর্বে ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই।
এই অসম লড়াই বড়জোর কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু না, এ কী দৃশ্য দেখছেন বিশ্ববাসী! সবাইকে অপার বিস্ময়ের সাগরে ডুবিয়ে দিয়ে গত এক মাসেরও বেশি সময় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে অবরুদ্ধ গাজার ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস।
পরিস্থিতি এতটাই অস্বাভাবিক রুপ নিয়েছে যে, বিশ্ববাসী এখন মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে-এই অসম যুদ্ধে কে বিজয়ী। হামাস না কী ইসরাইল। চলছে চুরচেরা বিশ্লেষণ। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধন লিখেছেন ইরানের প্রভাবশালী ইংরেজী দৈনিক তেহরান টাইমসের কলামিস্ট হাসান হানিজাদেহ।
পত্রিকাটির এই নিয়মিত কলামিস্ট খুব জটিল ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে না গিয়ে একেবারে সাদামাটা কিছু যুক্তি তুলে ধরেছেন যা বুঝতে কারো সামান্যতমো কষ্ট হবে না। সাদামনে একটু ভাবলে যে কারো কাছেই হানিজাদেহের যুক্তিগুলো দিবালোকের পরিস্কার বলেই প্রতিভাত হবে।
"Israel’s great defeat in Gaza" অর্থাৎ 'গাজায় ইসরাইলের ভয়াবহ পরাজয়' শিরোনামে গত ৯ আগস্ট (২০১৪) অনলাইন ভার্সনে এবং পরদিন প্রিন্ট ভার্সনে প্রকাশিত ওই নিবন্ধনটির সরল অনুবাদ করেছেন আমাদের প্ল্যানিং এডিটর মো: কামরুজ্জামান বাবলু। এবার চলে যাই মূল অনুবাদে:
ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে সামরিক সফলতা অর্জন না করেই উল্টো পরাজয়ের গ্লানি বরণ করতে হলো। পরিস্থিতি এমনই রুপ ধারণ করলো যে ইসরাইলি সেনারা রীতিমতো গাজা ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হলেন।
মাত্র ৩৬০ বর্গ-কিলোমিটারের ছোট্ট ভূখন্ড গাজা। চারদিক থেকে অবরুদ্ধ এই উপত্যকায় ১৫ লাখের কিছু বেশি মানুষের বসবাস। জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক দিয়ে বর্তমান বিশ্বে এটি সবচেয়ে জনবহুল শহর।
অথচ এই ছোট্ট শহরটির ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস ও ইসলামিক জিহাদের রকেট ও মিসাইল শক্তির অবস্থান আজও নির্ণয় করতে চরম ব্যর্থ হয়েছে ইসরাইল, যার হাতে রয়েছে সিনবেত, মোশাদ ও আমানের মতো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা।
বিগত ৩০ দিনের অধিক সময়ে ধরা চলা যুদ্ধে (৯ আগস্ট ২০১৪ তেহরান টাইমসে মূল লেখাটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত) গাজায় ইসরাইলি চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ চলাকালে হামাস ও ইসলামিক জিহাদ ২৯০০'র বেশি রকেট নিক্ষেপ করে। এসব রকেট ইসরাইলের রাজধানি তেলআবিব ও গুরুত্বপূর্ণ শহর হাইফা, অ্যাশকেলন এবং ইশকল শহরে আঘাত হেনে সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, গাজায় বিগত ৩০ দিন ইসরাইল একতরফা আগ্রাসন ও গণহত্যা চালিয়েও যেন ক্রমেই ভয়ানকভাবে হাপিয়ে উঠেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধ বিমান থাকা সত্ত্বেও সেই দুর্বল ও সামান্য শক্তিধর রকেটের কাছেই যেন নাস্তানাবুদ ইসরাইল।
মাসাধিককালের এই যুদ্ধের সময় ৩০ লাখেরও বেশি ইসরাইলি হামাসের রকেটের ভয়ে আশ্রয় নিয়েছেন যা দখলদার ইহুদীবাদী শক্তিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তেলআবিব স্টক এক্সচেঞ্জ যা বিশ্বের অন্যতম বড় পুঁজিবাজার 'ওয়াল স্ট্রিটের' সাথে পাল্লা দিয়ে চলে তার লেনদেন ৫০ শতাংশ নিচে নেমে যায়। ইসরাইলকে প্রতিদিন কোটি কোটি ডলার ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইসরাইলকে বেন গোরিয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল পর্যন্ত বাতিল করতে হয়েছিল যা দেশটির পর্যটন খাতে ভয়াবহ আঘাত হানে এবং চলমান অর্থনৈতিক পতনকে আরও তরান্বিত করে।
এছাড়া সামরিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসরাইলের মিসাইল ধ্বংসকারী আয়রন ডোম, যা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে, তাও চরমভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। কারণ হামাস ও ইসলামিক জিহাদ কর্তৃক নিক্ষিপ্ত ২৯০০ রকেটের মধ্যে আয়রন ডোম মাত্র ৪৮০টি প্রতিহত করতে পেরেছে।
এমনকি এই যুদ্ধের ফলে ইসরাইল কী পরিমান অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তারও কোন খতিয়ান জনসম্মুখে প্রকাশ করেনি ইসরাইল। তবে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের হিসাব মতে এই যুদ্ধে ইসরাইলের ক্ষতির পরিমান প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
এটা খুবই স্বাভাবিক যে যুদ্ধ চলতে থাকলে তা মোটেই ইসরাইলি স্বার্থ রক্ষা করবে না। কারণ দখলকৃত যেই ফিলিস্তিনি ভূ-খন্ডে একটি আরামদায়ক ও নিরাপদ জীবন যাপনের স্বপ্ন নিয়ে ইহুদীরা অন্য জায়গা থেকে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন, তারা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হবেন।
উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, ২০০৬ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহর সাথে ৩৩ দিনের যুদ্ধে ২ লাখ ৭০ হাজারের অধিক ইহুদী, বিশেষ করে যারা দখলকৃত ফিলিস্তিনের উত্তর অংশে বসবাস করতেন, তারা ইউরোপ ও আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন এবং আর ফিরে আসেননি। এটা যায়নবাদী ইসরাইলি শাসনের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ।
সুতরাং গাজার বেসামরিক লোকদের ওপর নারকীয় বোমা হামলা চালিয়ে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলনকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ইসরাইল সফল হয়েছে-এমনটি যারা ভাবেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। যদিও এই হামলায় গাজায় সাধারণ নাগরিকদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু এতে একই সাথে হামাসের শক্তিও বৃদ্ধি পেয়েছে।
আর এ কারণেই আমরা দেখেছি, ৭২-ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর পরই হামাস এমন ঘোষণা করেছে যে গাজা উপত্যকার ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেয়া, রাফাহ ক্রোসিং খুলে দেয়া এবং গাজায় পুনরায় হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা ইসরাইল না দিলে যুদ্ধবিরতির পর পুনরায় রকেট হামলা শুরু হবে। বাস্তবেও তাই হয়েছে।
এদিকে, ইসরাইল হামাসকে পুরোপুরি অস্ত্রমুক্ত করা ও গাজাকে সম্পূর্ণরুপে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর নিয়ন্ত্রনে নেয়ার দাবি জানিয়ে আসছে।
সুতরাং সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন অবস্থানে দাঁড়িয়েছে যে, ইসলামিক প্রতিরোধ যোদ্ধাদের দাবিকে বিবেচনায় নিয়ে যুদ্ধবিরতির একটি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর উদ্যোগ না নেয়া পর্যন্ত গাজা ইস্যুটি একটি রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও সামরিক সমস্যা হয়েই থাকবে। আর হামাস ও ইসরাইলের মধ্যকার এই যুদ্ধ প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলতেই থাকবে।
ঢাকা, ১১ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, কেবি





