১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চিরদিনের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে যান সালমান শাহ। কিন্তু রেখে গেছে অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী, তারা এখনো সালমান শাহকে ভালোবাসে। তার সিনেমা দেখে এখনো চোখ মোছেন…।
সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে তার প্রবেশ। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। অভিনয় করেছেন মাত্র ২৭টি চলচ্চিত্রে। আর সাবলীল অভিনয় নৈপুণ্যে জয় করেছিলেন কোটি মানুষের ভালোবাসা। হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের সিনেমার এক নাম্বার নায়ক। আজ তিনি কিংবদন্তি, সালমান শাহ।
১৯ বছর আগে ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান জনপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ। মারা যাওয়ার পর এখনো উদঘাটন হয়নি সালমান শাহের মৃত্যুটি অপমৃত্যু না হত্যাকাণ্ড। সিআইডি ও বিচার বিভাগীয় তদন্তে অপমৃত্যু উল্লেখ্য করে প্রতিবেদন দাখিল করা হলেও তা প্রত্যাখ্যান করেন সালমান শাহের পরিবার।
সর্বশেষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন সালমান শাহর মা নীলুফা চৌধুরী। আদালত না রাজির আবেদন মঞ্জুর করে পুনঃতদন্তের জন্য র্যাব-৩ কে নির্দেশ দেন। এদিকে পুনঃতদন্ত বাতিল চেয়ে অপমৃত্যুর আবেদনটি গ্রহণ করার আবেদন করে রিভিউ পিটিশন দাখিল করেন রাষ্ট্রপক্ষ।
নারাজির আবেদনে সালমান শাহর মা নীলুফার চৌধুরী উল্লেখ্য করেন, আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ১১ জন তার ছেলে সালমান শাহর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, আইনগতভাবে সালমান শাহের মামলাটি চলতে পারে না।
কারণ হিসাবে আব্দুল্লাহ আবু বলেন, মামলার বাদী সালমান শাহের বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী মারা গেছেন। তিনি মারা যাওয়ার পর সালমান শাহর মা নীলুফার চৌধুরী মামলার বাদী হন। আইনগতভাবে এক বাদীর পরিবর্তে অন্য বাদী হতে পারে না।
আব্দুল্লাহ আবু আরও বলেন, বিচার বিভাগীয় তদন্তে নায়ক সালমান শাহর অপমৃত্যু উল্লেখ্য করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছিল। প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে সালমান শাহর মা নীলুফার চৌধুরী নারাজি প্রদান করেন। আদালত নারাজির আবেদন মঞ্জুর করে পুনঃতদন্তের জন্য র্যাব-৩ এ পাঠান। আমরা পুনঃতদন্ত বাতিল চেয়ে আদালতে রিভিশন দাখিল করেছি। আদালত তা শুনানির জন্য ২৮ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন।
অপরদিকে সাবেক বিশেষ পিপি ফারুক আহম্মেদ বলেন, আইনুসারে মামলাটি চলতে কোনো বাধা নেই। পুনঃতদন্ত বাতিল চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যে রিভিশন দাখিল করেছেন তা যুক্তিসঙ্গত নয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র্যাব-৩ এর সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ইয়াসির আরাফাত বলেন, আদালতের আদেশে মামলার সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তাই মামলাটি আমরা তদন্ত করতে পারছি না।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ। সে সময় এ বিষয়ে অপমৃত্যুর মামলা করেন তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী।
পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত করার আবেদন জানান তিনি। অপমৃত্যুর মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি একসঙ্গে তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত। সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাটি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি।
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ১৯৯৭ সালের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে ওই চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত। এর পর প্রায় ১২ বছর মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে ছিল।
২০১৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতের বিচারক বিকাশ কুমার সাহার কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। এ প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সালমান শাহর মা নীলুফার চৌধুরী ছেলের মৃত্যুর বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন এবং বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেবেন বলে আবেদন করেন। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলুফার চৌধুরী ঢাকা মহানগর হাকিম জাহাঙ্গীর হোসেনের আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের নারাজির আবেদন দাখিল করেন। আদালত নারাজির আবেদন গ্রহণ করে পুনঃতদন্তের জন্য র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যাব) পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন।
নারাজি আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ১১ জন তার ছেলে সালমান শাহর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। বর্তমান মামলাটি তদন্ত করছেন র্যাব-৩ এর সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি)ইয়াসির আরাফাত।
একনজরে সালমান শাহ
নাম : শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন
বাবা : কমর উদ্দিন চৌধুরী
মা : নীলা চৌধুরী
জন্মস্থান : জকিগঞ্জ, সিলেট
জন্ম তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
পড়াশুনা : খুলনা বয়রা মডেল হাইস্কুল, এসএসসি- ১৯৮৭ সালে আরব মিশন স্কুল, ধানমন্ডি। আইকম- আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ। বিকম- মালেকা সায়েন্স কলেজ, ধানমন্ডি।
বিয়ে : ১২ আগস্ট ১৯৯২
স্ত্রী : সামিরা
প্রথম চলচ্চিত্র : কেয়ামত থেকে কেয়ামত
শেষ চলচ্চিত্র : বুকের ভেতর আগুন
প্রথম চলচ্চিত্রের নায়িকা : মৌসুমী
সর্বাধিক চলচ্চিত্রের নায়িকা : শাবনূর (১৪টি)
মোট অভিনীত চলচ্চিত্র : ২৭টি
টেলিভিশন নাটকে অভিনয় : আকাশ ছোঁয়া (১৯৮৫), দোয়েল (১৯৮৫), সব পাখি ঘরে ফেরে (১৯৮৫), সৈকত সারস (১৯৮৬), পাথর সময় (১৯৯০), ইতিকথা (১৯৯৪), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬), নয়ন (১৯৯৬)।
বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল : ইস্পাহানী গোল্ডস্টার টি (১৯৮৩), জাগুয়ার কেডস (১৯৮৪), মিল্কভিটা (১৯৮৮), কোকাকোলা (১৯৮৯), ফান্টা (১৯৯১)।
রাশি : বৃশ্চিক
উচ্চতা : ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি
প্রিয় শখ : দাবা ও ক্রিকেট খেলা
প্রিয় গায়ক : হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও আজম খান
প্রিয় নায়ক : অমিতাভ বচ্চন ও শাহরুখ খান
প্রিয় রং : কালো
প্রিয় পোশাক : জিন্স প্যান্ট ও টি-শার্ট
প্রিয় খাবার : আইসক্রিম ও ফাস্টফুড
প্লে-ব্যাক : প্রেমযুদ্ধ ও আলী কেন গোলাম
পুরস্কার : ১৯৯৫ সালে ইয়ুথ এ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের শ্রেষ্ঠ নায়কের পুরস্কার।
মৃত্যু : ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬।
সালমান শাহ অভিনীত চলচ্চিত্র
● কেয়ামত থেকে কেয়ামত – ১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ
● তুমি আমার – ১৯৯৪ সালের ২২ মে
● অন্তরে অন্তরে – ১৯৯৪ সালের ১০ জুন
● সুজন সখী – ১৯৯৪ সালের ১২ আগস্ট
● বিক্ষোভ – ১৯৯৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর
● স্নেহ – ১৯৯৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর
● প্রেমযুদ্ধ – ১৯৯৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর
● কন্যাদান – ১৯৯৫ সালের ৩ মার্চ
● দেনমোহর – ১৯৯৫ সালের ৩ মার্চ
● স্বপ্নের ঠিকানা – ১৯৯৫ সালের ১১ মে
● আঞ্জুমান – ১৯৯৫ সালের ১৮ আগস্ট
● মহামিলন – ১৯৯৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর
● আশা ভালোবাসা – ১৯৯৫ সালের ১ ডিসেম্বর
● বিচার হবে- ১৯৯৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি
● এই ঘর এই সংসার – ১৯৯৬ সালের ৫ এপ্রিল
● প্রিয়জন – ১৯৯৬ সালের ১৪ জুন
● তোমাকে চাই – ১৯৯৬ সালের ২১ জুন
● স্বপ্নের পৃথিবী – ১৯৯৬ সালের ১২ জুলাই
● সত্যের মৃত্যু নেই – ১৯৯৬ সালের ৪ অক্টোবর
● জীবন সংসার – ১৯৯৬ সালের ১৮ অক্টোবর
● মায়ের অধিকার – ১৯৯৬ সালের ৬ ডিসেম্বর
● চাওয়া থেকে পাওয়া – ১৯৯৬ সালের ২০ ডিসেম্বর
● প্রেম পিয়াসী – ১৯৯৭ সালের ১৮ এপ্রিল
● স্বপ্নের নায়ক – ১৯৯৭ সালের ৪ জুলাই
● শুধু তুমি – ১৯৯৭ সালের ১৮ জুলাই
● আনন্দ অশ্রু – ১৯৯৭ সালের ১ আগস্ট
● বুকের ভেতর আগুন – ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর
এএইচ





