আদি-অস্ট্রেলীয় (প্রোটো-অস্থেলীয়) জনগোষ্ঠীর উত্তর পুরুষ ওঁরাও নামের আদিবাসীরা। এদের গায়ের রং কালো, নাক চ্যাপটা, চুল কালো ও কুঞ্চিত, উচ্চতা মাঝারি। ভাষার দিক থেকেও এরা সবাই একই অস্ট্রিক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। কারো কারো মতে কুরুথ ভাষার বিভাজিত একটি অংশের টোটেম রুপে ওঁরাও কথাটা এসেছে।

বাংলাদেশের কিছু কিছু এলাকায় ওঁরাও আদিবাসীরা বাস করে। গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায়ও কিছু ওঁরাও আদিবাসীর বসবাস দেখা যায়। নানা প্রতিকুল অবস্থার মধ্যেও টিকে আছে এই সম্প্রদায়ের লোকজন। তবে হতদরিদ্র ওঁরাও পরিবারগুলোর দিনকাল এখন আর ভাল নেই। অশিক্ষা, কুসংস্কার, সীমাহীন দারিদ্র এবং কর্মসংস্থানের অভাবে ভুমিহীন এই আদিবাসীদের অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে।

জানা যায়, গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ২শ' ৫০ ওঁরাও পরিবার বাস করে। এর মধ্যে সাদুল্যাপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নে ৩০টি এবং গোবিন্দগঞ্জের কামদিয়া, রাজাহার, সাখাহার, সাপমারা, গুমানীগঞ্জ ইউনিয়নে ২শ' ২০টি পরিবার তাদের আদি সংস্কৃতি আকঁড়ে বসবাস করছেন।

গাইবান্ধার ওঁরাও পরিবারগুলো মূলত কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল। তারা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে। এছাড়া কৃষি শ্রমিক এবং দিনমজুরী তাদের পেশা। পরিবারের নারী পুরুষ উভয়েই কর্মঠ এবং শ্রমজীবি পেশাকে আকঁড়েই জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মতো পূজা পার্বনে বিশ্বাসী হলেও এদের ধর্মীয় উৎসবগুলোতে ভিন্নতা রয়েছে।

বৈশাখ মাসে এরা বসুন্ধরা ব্রত ও উৎসব, ভাদ্র মাসে ভাদু উৎসব, অঘ্রানে সেঁজুতি, ফাল্গুনে ইতু এবং চৈত্র মাসে ওঁরাওরা বসন্ত উৎসব পালন করে থাকে। বর্ষাকালে কদম ফুল ফোঁটার মৌসুমে এরা কদম গাছ এবং পাতা, ডাল ও ফুল নিয়েও পুজা অর্চনা করে থাকে। এই পুজা পার্বনের মূল উদ্দেশ্য হলো জমি ও ফসলের উর্বরতা শক্তি ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা।

এই গোষ্ঠির সামাজিক জীবন ও ধর্মচর্চায় উজ্জ্বল রঙিন ফুলের কদর অনেক বেশি। পুজা পার্বন এবং উৎসব পরবে ওঁরাও মেয়েরা রংগীন শাড়ি পড়ে চুলে রঙিন ফুল গুঁজে নাচে গানে উৎসব পালন করে থাকে। স্ত্রী পুরুষ উভয়েই সামাজিক রীতি হিসেবে শরীরে উল্কি আঁকে। ওঁরাও স্ত্রী পুরুষের এক সংগে দুই স্ত্রী বা স্বামী রাখার বিধান নেই।

পুরুষ ওঁরাওদের চেয়ে মেয়েরা বেশি পরিশ্রম করে এবং কৃষিকাজেও তারা অত্যন্ত দক্ষ। বেশি কাজ করেও নারী শ্রমিকরা পুরুষের চেয় কম মজুরী পায়। সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে এবং নারী বলে বিচার পায় না।

স্থানীয়রা জানান, ওঁরাও জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সরকারি ত্রাণ সহায়তা থেকে প্রতিনিয়তই বঞ্চিত। অথচ দেখার কেউ নেই। নানা প্রতিকুলতা দারিদ্র এবং বঞ্চনার শিকার হয়েও আদিবাসী ওঁরাওরা।

এখনও যে এ জেলায় ওঁরাওরা আদি সংস্কৃতি এবং একান্ত নিজস্ব জীবন যাপন পদ্ধতিকে উপজিব্য করেই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে অস্তিত্বকে ধারণ করে রেখেছে সেটাও বা কম কিসের।

টিএই/ এআর