লক্ষীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজারে অবস্থিত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়িসহ প্রায় শত কোটি টাকার ৩৬ একর সম্পত্তি নিয়ে দু-পক্ষের মালিকানা দাবী, সরকার বলছে খাস সম্পত্তি-হিন্দু সম্প্রদায় বলছে দেবোত্তর সম্পত্তি এ নিয়ে রহস্যের জন্ম দিয়েছে এ জমিদার বাড়ী।
সম্প্রতি হঠাৎ ওই সম্পদে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও দখলে যাওয়ার আভাস পেয়ে দেবোত্তর সম্পত্তি দাবি করে তা রক্ষার আন্দোলনে নেমেছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন।
অন্যদিকে সরকারী সম্পদ দাবি করে তা রক্ষা ও উচ্ছেদ অভিযানের নামে মাছ লুট ও মন্দিরের বিগ্রহ চুরি এবং প্রশাসনের তৎপরতায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে ওই স্থানে বসবাসকারীরা। এসব সম্পত্তি দেবোত্তর নাকি সরকারী সে বিষয়ে ধোয়াশা কাটেনি এখনো।
জানা যায়, লক্ষীপুরের অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা দালালবাজার জমিদার বাড়ি। লক্ষীপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরত্বে ঢাকা-রায়পুর সড়কের সঙ্গে অবস্থিত দালাল বাজার-সংলগ্ন জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ এখনো দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাড়িটিকে ঘিরে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।
বাজারে প্রবেশের মুহূর্তে ২২ একর জমিতে দৃষ্টি নন্দন খোয়া সাগরদিঘি। শীতকালে ওই দিঘিতে অতিথি পাখির কলতানও দৃষ্টি কাড়ে সবার।
বাজারের পাশেই ১৪ একর সম্পত্তিতে রয়েছে পরিত্যক্ত রাজ গেট, জমিদারী প্রাসাদ, অন্দরমহল, শান বাঁধানো ঘাট, জমিদার বাড়ির প্রাচীর, নির্মাণ সামগ্রী, বিশেষ করে কয়েকটন ওজনের লোহার বিম, বিরাটাকার লোহার সিন্দুক, নৃত্যশালা, বহিরাঙ্গন, তিনটি পুকুর। বাড়িটি দেখতে দূর-দূরান্তর থেকে ছুটে আসে অসংখ্য মানুষ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশ বিভক্তির পূর্বে ১৯৪৬ সালে লক্ষীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজারের জমিদার নবীন কিশোর রায় ও নরেন্দ্র কিশোর রায় প্রায় ৩৬ একর সম্পত্তি রেখে ভারতে চলে যান।
১৯৫০ সালে তৎকালীন পাক সরকার জমিদার প্রথা বিলুপ্ত করে এ সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি ঘোষণা করায় সরকারী সম্পদ হিসেবে পরিণত হয়। এর সুবাধে ১৯৬৫ সালে আব্দুল মোমেন চৌধুরী সরকারের কাছ থেকে ৭একর ৮৬ শতক জমি লিজ নেন। পরবর্তীতে চার একর ৮৬ শতক জমি আরও দুই বছরের জন্য লিজ নিয়ে বর্তমান ২০১৫ সালের ২০ জুন অর্থাৎ প্রায় ৫০বছর পর্যন্ত ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দখলে থেকে বসবাস করেছেন।
এ বিষয়ে আবদুল মোমিন চৌধুরীর ওয়ারিশ নুর আবেদিন চৌধুরী জানান, আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে ৫০ বছর যাবত এ সম্পত্তিতে বসবাস করিয়া আসিতেছি, কিন্তু প্রশাসন আমাদেরকে কোন নোটিশ ছাড়া আমাদের পুকুরের প্রায় ৩লক্ষ টাকার মাছ ও আমাদের ঘর ও আসবাবপত্রসহ প্রায় ৫০/৬০লক্ষ টাকার ক্ষতি সাধন করেছে।
এছাড়া এসব সম্পত্তির কিছু কিছু স্থানীয় প্রভাবশালীরা স্থানীয় তহসিলদার ও এসিল্যান্ডকে ম্যানেজ করে ভোগ দখল ও মার্কেট নির্মাণ করে দখলে রেখেছে।
গত ২১ জুন সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সমর কান্তির নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দখলদারদের একাংশকে উচ্ছেদ করলেও অন্য দখলদার মোজাম্মেল হকের ছেলেদেরকে রহস্যজনক কারণে উচ্ছেদ না করে রেখে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে জমিদাররা চলে যাওয়ার আগ মুহূর্তে জমিদার বাড়ির সেবায়েত হিসেবে ঋষিকেশ চক্রবর্তীকে এসব সম্পদ দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে যান বলে জানা যায়। ১৯৬৭ সালে এসব সম্পত্তি শত্রু সম্পতি নয় মর্মে নোয়াখালী সাব জজ আদালতে স্বত্ব ঘোষণামূলক মামলা করেন সেবায়েত ঋষিকেশ।
পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে ঋষিকেশের এক আবেদনের প্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট নোয়াখালী সাব জজ আদালতে এ মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পরে সেবায়েত ঋষিকেশ ভারতে চলে যান। যাওয়ার আগে নতুন সেবায়েত হিসেবে শংকর রায় নামে এক ব্যক্তিকে নিয়োজিত করে যান তিনি।
বর্তমানে স্বত্বামূলক মামলাটি লক্ষীপুর জেলা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এমতাবস্থায় লক্ষীপুরের জেলা প্রশাসক একেএম টিপু সুলতান সম্প্রতি জমিদার বাড়ি এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি ওই স্থানে বসবাসকারী লোকজনকে ১৪ জুনের মধ্যে দখল ছেড়ে দিতে মূখিক নির্দেশ দেন বলে স্থানীয়রা জানান।
গত ৬ জুন সকালে ভূমি অফিসের স্থানীয় তহসিলদার বাহার উদ্দিনসহ ১৫-২০ জন লোক মন্দির-সংলগ্ন তিনটি পুকুর থেকে চাষকৃত ৩লক্ষাধিক টাকার মাছ ধরে নিয়ে যায়। এসব মাছ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাঝে ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই দিন রাতেই গোবিন্দ জিউ মন্দিরের বিগ্রহ চুরির ঘটনা ঘটে। মন্দিরের পরোহিত সেবায়েত শংকর রায় জানান, ঘটনার দিন বিকালেও বিগ্রহ ছিল।
পরদিন সকালে সেখানে গিয়ে মন্দিরের বিগ্রহের কিছু ভাঙা অংশ পাওয়া যায়। মন্দিরের সাইনবোর্ডটিও নিয়ে গেছে। পরে মন্দিরের দরজায় আমাদের দেওয়া তালার ওপর আরও দুটি তালা লাগিয়ে যায় কে বা কারা।
এসব ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। মন্দিরের বিগ্রহ চুরি ও দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষার দাবীতে গত ১৮ জুন মানববন্ধন ও সমাবেশ করে তারা।
এতে বক্তব্য রাখেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কাজল দেবনাথ, এএলআরডি-এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের যোগসাজশে দালাল বাজার জমিদার বাড়ির প্রায় ৩৬ একর দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতাই ওই বাড়ির গোবিন্দ জিউ মন্দিরের বিগ্রহ চুরি ও মন্দিরের দরজায় তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মকান্ডে- স্থানীয় সহকারী কমিশনার ভূমি ও তহসিলদারসহ ২৬ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ করেন তারা।
এসএইচ





