বাংলার প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার পাতোয়াইর গ্রামে। এটি কিশোরনঞ্জ শহর থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পাতোয়াইর গ্রামের পাশেই ফুলেশ্বরী নদী। নীলগঞ্জ রেলস্টেশনের নিকটবর্তী কাচারিপাড়া গ্রামে এ মন্দিরটি অবস্থিত।
গবেষকদের মতে আজ অবধি সংগৃহীত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মহিলা কবি। মধ্যযুগের প্রখ্যাত কবি দ্বিজবংশী দাসের কন্যা এই মহিলা কবি চন্দ্রাবতী।
নয়ান ঘোষ প্রণীত পালাগান 'চন্দ্রবতী' থেকে জানা, বাল্যকালে চন্দ্রাবতীর বন্ধু ও খেলার সাথী ছিলেন জয়ানন্দ নামের এক বালক৷ সুন্দরী চন্দ্রাবতীর সাথে তাঁর বালসখা জয়ানন্দের বন্ধুত্ব গভীর প্রেমে পরিনত হয়।
তাদের বিয়ের আয়োজনও সম্পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু এমন সময় হঠাত্ জয়ানন্দ একটি মুসলমান মেয়ের রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁকেই বিবাহ করে ধর্মান্তরিত হন।
এই মর্মান্তিক খবরে চন্দ্রাবতী স্তম্ভিত হয়ে নাওয়া খাওয়া ত্যাগ করেন। পিতা মেয়ের এই অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য তাঁকে একমনে শিবের নাম করতে আর রামায়ণ লিখতে উপদেশ দিলেন। মেযের জন্য তাঁদের মনসা মন্দিরের পাশে একটি শিব মন্দিরও তৈরী করে দিলেন। চন্দ্রাবতী তাতেই মন দিলেন।
চন্দ্রাবতীর পালায় তার বর্ণনা আছেঃ
'অনুমতি দিয়া পিতা কয় কন্যার স্থানে।
শিবপুজা কর আর লেখ রামায়ণে'
কিছু কাল পর জয়ানন্দ অনুতপ্ত হয়ে আবার তার কাছে ফিরে এলেও চন্দ্রাবতী আর তার সাথে দেখা করেননি। প্রত্যাখান পেয়ে জয়ানন্দ মন্দিরের দ্বারে চন্দ্রাবতির উদ্দেশ্যে বাণী লিখে নদীতে প্রাণ বিসর্জন দিলেন। মন্দিরের ভেতরে ধ্যানমগ্না ছিলেন বলে চন্দ্রাবতী জয়ানন্দের অনুনয় বিনয় শুনতে পাননি।
১৯১৬ সালে ময়মনসিংহের কবি চন্দ্রকুমার দে প্রথম সেই এলাকার প্রচলিত পালাগান বা গাথাগুলি সংগ্রহ করেছিলেন। আচার্য দীনেশচন্দ্র সেনের ( মৈমনসিংহ গীতিকা ) উত্সাহে তা পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। সেই সঙ্গে তাঁরা পান চন্দ্রাবতীর লেখা রামায়ণ কথা এবং আরও একাধিক পালা। এই সমস্ত পালা ময়মনসিংহ গীতিকা নামেই পরিচিতি লাভ করে।
১৯৬৬ নাগাদ ক্ষিতীশ মৌলিক (প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা) এই ময়মনসিংহের পালাগুলির আরও একটি সম্পাদিত রূপ প্রকাশ করেন। চন্দ্রাবতীর রামায়ণ কে অনেকে অসমাপ্ত এবং দুর্বল সাহিত্য রচনা বলে সরিয়ে রেখেছিলেন।
শ্রদ্ধেয়া সাহিত্যিক নবনিতা দেব সেন এই রামায়ণ কথা পাঠ করে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন যে এটি দুর্বল বা অসমাপ্ত কোনোটিই নয়। এটি একজন নারীর দ্বারা রচিত কাব্য যেখানে রামের গুণগান না করে তিনি সীতার দুঃখ ও দুর্দশার দিকটাই বেশী তুলে ধরেছিলেন যা তত্কালীন পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধাচরণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। শ্রীমতী সেন এই রামায়ণের ইংরেজী অনুবাদ করেছেন।
দেশের দূরদূরান্তর থেকে বহু প্রেমিক-প্রেমিকা, কবি-সাহিত্যিক আবেগ প্রবণ হূদয়ের মানুষ মন্দিরটি পরিদর্শনে এসে স্তম্ভিত হূদয়ে মন্দির অবলোকন করেন। স্থির হয়ে নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ কেউ একান্তচিত্তে জীবনের মর্মন্তিক বিরহের স্মৃতি রোমন্থন করে সাগরের লোনাজলের মতো চোখের পানি ফেলেন।
কবি চন্দ্রাবতীর কিছু রচনা:
১. বন্দনা- 'মলুয়া' পালা
২. জলপ্লাবন ও দুর্ভিক্ষ (স্তবক ১) 'মলুয়া' পালা
৩. কেনা রামের জন্ম ও নানা কষ্ট (স্তবক ২) 'কেনারামের পালা'
ইআর





