আজকের কথিত সভ্যজগত যখন শুধু তাকিয়ে দেখছে তখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুটি সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে অসম লড়াই করে সেই দুই শক্তিকে পায়ের কাছে নত করতে সক্ষম হয়েছে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার অকুতোভয় যোদ্ধার দল হামাস। হামাস শক্ত হাতে কমান্ড করে অমানবিকতার দুই ভিলেনকে এতোটাই কোণঠাসা করেছে যে, তারা এখন কায়রোয় হামাসের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়েছে।

হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জাদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেডের দৃঢ়-সংকল্পের কমান্ডার মুহাম্মদ দেইফ এখন আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে গাজা উপত্যকার স্বায়ত্তশাসন আদায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছেন। একইসঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনের জাতীয় বিজয় অর্জনেরও দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু কে এই দৃঢ়-সংকল্পের মুহাম্মাদ দেইফ?

এবারের গাজা যুদ্ধে ইহুদিবাদী ইসরাইলের এত সেনা-ক্ষয়ের নায়ক মুহাম্মদ দেইফকে ইসরাইলের জনগণের কাছে অনেকটা আড়াল রেখেছে তেল আবিবের কঠোর শাসনে থাকা গণমাধ্যমগুলো। যার কারণে এত বড় পরাজয়ের মুখে সেই কমান্ডার মুহাম্মাদ দেইফকে ছায়াচ্ছন্ন করে রেখেছে যুদ্ধবাজ ইসরাইল। বড় জোর তাকে অপরিচিত এক ব্যক্তি বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। তারপরেও কি থেমে থাকে সবকিছু? সত্য প্রকাশ হয়ে পড়ে সময়ের ব্যবধানে। যেমনি প্রকাশ হতে শুরু করেছে মুহাম্মাদ দেইফের পরিচয়।

ফিলিস্তিনের জনগণের কাছে চ্যাম্পিয়ন এই কমান্ডারের পরিচয় তিনি একজন সামরিক পণ্ডিত, যার আরেক পরিচয় 'গেরিলা যুদ্ধের ছাত্র’। আসুন তার সম্পর্কে এবার একটু বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি।

হামাসের এই কমান্ডারের ওপর পাঁচবার বোমা হামলা চালিয়েছে ইহুদিবাদী ইসরাইল। তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি প্রতিবারই বেঁচে গেছেন। যতবার জীবন ফেরত পেয়েছেন ততবারই যেন আরো বেশি শক্তিশালী হয়েছেন আর মধ্যপ্রাচ্যের দাম্ভিক সামরিক শক্তি ইসরাইলকে উপেক্ষা করেছেন প্রবল পরাক্রমে। ইসরাইলের হামলা-ই যেন হামাসকে উপহার দিল এক চৌকষ কমান্ডার, যার নাম মুহাম্মাদ দেইফ।

এবারের যুদ্ধে ইসরাইল যতই শক্তি নিঃশেষ করে দেয়ার জন্য হামাসকে সতর্ক করেছে, যতই বলেছে রকেট ও টানেল ধ্বংস করা হবে ততই বর্বর শক্তির হুঁশিয়ারিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছেন মুহাম্মাদ দেইফ। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, গাজা উপত্যকার ওপর থেকে আট বছরের অবরোধ তুলে না নিলে যুদ্ধবিরতি হবে না।

১৯৬৫ সালে গাজার খান ইউনুস শহরের এক উদ্বাস্তু শিবিরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই বীর কমান্ডার। কিন্তু কে জানতেন এই শিশুই একদিন ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনে এত বড় বীরের ভূমিকা পালন করবেন!

গত ২০ বছর ধরে এ বীর যোদ্ধা হামাসের সামরিক অভিযানের সঙ্গে জড়িত। তার নেতৃত্বে বহু হামলা হয়েছে ইসরাইলের ওপর। বহু হামলার পরিকল্পনা তিনিই করেছেন। ইসরাইলের সেনা অপহরণের নেতৃত্ব কিংবা পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কাজ করেছেন, হাতে নিয়েছেন গাজার অভ্যন্তরে টানেল নির্মাণের এক কঠিন প্রকল্প যাতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে রকেট হামলা চালানো যায় সহজেই।

সময়ের ব্যবধানে ২০০২ সালে হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জাদিন আল-কাসসাম ব্রিগেডের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় দেইফকে। ইসরাইলের হাতে পূর্বসুরি সালাহ শেহাদের’র শাহাদাতের পর তিনি এ দায়িত্ব পান।

এ দায়িত্ব পাওয়ার আগে থেকেই দীর্ঘদিন ধরে মুহাম্মাদ দেইফ গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছেন। তারও আগে ১৯৮০’র দশকে তিনি ইসলামি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। জীববিজ্ঞানের এ ছাত্র ইখওয়ানুল মুসলিমিনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং গাজার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রধান হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

বলা হয়ে থাকে, ২০০০ সালে যখন দ্বিতীয় ইন্তিফাদা (ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলন) শুরু হয় তখন তিনি ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে পরিচালিত কারাগার থেকে মুক্তি পান অথবা কারা ভেঙে বের হতে সক্ষম হন। এ ঘটনায় অনেক বেশি ক্ষুব্ধ হয় মানবতার শত্রু ইসরাইল। অথচ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মুহাম্মদ দেইফের ওপর শকুনের মতো তীক্ষ্ণ নজর ছিল ইসরাইলের। হামাসের সামরিক শাখার প্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরপরই ইসরাইল পঞ্চমবারের মতো হামলা চালিয়েছিল দেইফের ওপর। ওই গুপ্ত হামলার লক্ষ্য ছিল চিরদিনের মতো দেইফকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া।

কিন্তু এবারের হামলাও ব্যর্থ হলো। অবশ্য, পঞ্চমবারের হামলায় মুহাম্মদ দেইফ মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। হামলার পর গুজব ছড়িয়ে পড়ে তার পা ও দেহের নীচের অংশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে যদিও তা কখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এরপর তিনি একদমই গোপন কোথাও চলে গেছেন; জনসমক্ষে আর দেখা যায়নি। তার জীবন সম্পর্কেও তেমন বিস্তারিত কিছু জানা যায় না।

পরে শোনা যায় দেইফ তার প্রতিনিধিত্ব দিয়েছেন তারই সহযোগী আহমাদ জাবারিকে। শত্রুদের মধ্যে তার নাম রয়েছে “ক্যাট উইথ নাইন লাইভস”। ধীরে ধীরে গাজার অভ্যন্তরে তার সুনাম-সুখ্যাতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেক শক্তভাবে।

অতি সম্প্রতি মুহাম্মদ দেইফের কয়েকটি ছবি পাওয়া গেছে যা ২০ বছর আগের; খানিকটা অস্পষ্টও বটে। এ থেকেই জানা গেল তার অস্তিত্ব। তবে তিনি কোথায় থাকেন তা সাধারণ লোকজন তো বটেই বিশিষ্টজনদেরও অনেকে জানেন না। বলা হয় তিনি ছদ্মবেশ ধারণ করার বিষয়ে এতটাই পারদর্শী যে, মুহূর্তেই জনতার মধ্যে মিশে যেতে পারেন। রহস্যময় এ কমান্ডার কোনো প্রযুক্তির সঙ্গে থাকেন না; ব্যবহার করেন না কোনো মোবাইল ফোন বা অন্য কিছু। কারণ একটাই; শত্রু ইসরাইলের যেকোনও ধরনের ফাঁদ এড়িয়ে চলা যাতে কোনোভাবেই তার চিহ্ন না পায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হামাস কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গত ক’দিন আগে এই তথ্য জানিয়েছিল বার্তা সংস্থা এএফপি।

সম্ভবত তিনি এ কৌশল ও সতর্কতা অবলম্বন করেন তারই বিজ্ঞ পরামর্শদাতা ইয়াহহিয়া আইয়াশের শাহাদাতের কারণে। আইয়াশ শহীদ হয়েছিলেন ১৯৯৬ সালে। মোবাইল ফোন ট্রাক করে ইসরাইলের গুপ্ত সংস্থা ফাঁদে ফেলে তাকে শহীদ করে।

যে দেইফ নিয়ে এতক্ষণ এত কথা হলো সেই দিয়েফের পুরো নাম কিন্তু জানা হলো না। তার পুরো নাম মুহাম্মাদ দিয়াব আল-মাসরি এবং তিনি পরে গেরিলা নাম ধারণ করে দিয়েফ যার আরবি অর্থ হচ্ছে মেহমান বা অতিথি। হামাসের এই জাঁদরেল কমান্ডারের স্বাভাবিক অভ্যাস হচ্ছে- ক্ষণে ক্ষণে অবস্থান পরিবর্তন করা।

নাম প্রকাশে হামাসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মুহাম্মাদ দেইফ হচ্ছেন “অতিশয় বিনয়ী মানুষ, বিচক্ষণ এবং খুব নরম সুরে কথা বলেন।” তার পরম ভালোবাসার বিষয় হচ্ছে ‘সামরিক কৌশল’। দিনের বেশিরভাগ সময় কাটান তিনি সামরিক কৌশল নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে।

রহস্যের জালে ঘেরা এই কমান্ডারের কোনো বক্তব্য-বিবৃতিও পাওয়া দুর্লভ বিষয়। ২০১২ সালে ইহুদিবাদী ইসরাইলকে ‘পিলার অব ডিফেন্স’ নামে সামরিক অভিযান চালানোর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তিনি। গাজা থেকে হামাসের রকেট হামলা ঠেকানোর নামে ইসরাইল ওই অভিযান চালায়।

১৯৯৬ সালে ইয়াহহিয়া আইয়াশ শাহাদাতবরণ করার পর মুহাম্মাদ দেইফ নিজেই ইজ্জাদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেডের ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্ব পালন করা শুরু করেন। আইয়াশ নিজেও ছিলেন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। ইসরাইল মনে করে- মুহাম্মাদ দেইফের কারণেই হামাস বহু হামলায় সফলতা পেয়েছে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত ইসরাইলের অভ্যন্তরে যেসব হামলা হয়েছে তার মূল পরিকল্পনাকোরী ছিলেন হামাসের এই কমান্ডার।

হামাসের কৌশলগত উন্নয়নে তিনিই বড় ভূমিকা রেখেছেন বলে মনে করে ইসরাইল। ইসরাইলের সামরিক কর্মকর্তারা আরো মনে করেন- হামাসের কাসসাম রকেটের আবষ্কিারক হলেন কমান্ডার মুহাম্মাদ দেইফ। বলা হয়- ইরান উন্নত রকেট প্রযুক্তি দেয়ার আগ পর্যন্ত এই রকেটের পাল্লা ছিল ৮ কিলোমিটার। সূত্র: আইআরআইবি

ঢাকা, ১১ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএমএ