আমেরিকায় যাওয়ার ভিসা পাসপোর্ট সবই আছে। নির্দিষ্ট দিনে হিথ্রো এয়ারপোর্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষে চড়বেন ভার্জিন এলারলাইন্সে।

অনলাইন চেকইন করে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে নির্ধারিত সিকিউরিটি গেইট দিয়ে প্লেনে প্রবেশের আগমুহূর্তে সর্বশেষ চেকের জন্য ভার্জিন এয়ার লাইন্সের একজন কর্মচারীর হাতে পাসপোর্ট ও বোর্ডিং পাস দিলে তাকে বলা হয় তিনি যেতে পারবেন না।

লন্ডনস্থ আমেরিকান দূতাবাসের এ কর্মকর্তা বললেন, ‘আপনার আমেরিকার ভিসা বাতিল করা হয়েছে’। আজমল মাসরুরের আর আমেরিকা যাওয়া হলো না। তবে এয়ারপোর্টে তাকে আটকে দেওয়া হলেও মার্কিন স্টেইট ডিপার্টমেন্ট এখনো জানে না কেনো এই ঘটনা ঘটলো।

তবে সোমবার সন্ধ্যায় আজমল মাসরুর সাংবাদিকদের জানান, গত শুক্রবার লন্ডনের মার্কিন দূতাবাস থেকে ফোনে তাকে দেখা করার আমন্ত্রণ জানালে তিনি দূতাবাসে যান। সেখানে তিনি প্রায় ৪৫ মিনিট তিন কর্মকর্তার সাথে বৈঠক করেন। কর্মকর্তারা তাদের পরিচয় দেননি। তবে বৈঠকে তারা স্বীকার করেছেন আজমল মাসরুরের ভিসা বাতিল করেছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট। আর লন্ডনস্থ দূতাবাসের কর্মকর্তারা সেই আদেশ পালন করেছেন মাত্র। বৈঠকে আজমল মাসরুর যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের হয়রানীর ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে লাভের চেয়ে ক্ষতি হবে বেশী। কর্মকর্তা তার সমালোচনার কোন জবাব দেননি। 

আমেরিকায় আজমল মাসরুরের নিউইয়র্কে একটি মসজিদে জুমার নামাজে ইমামতি এবং আরো দুটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু লন্ডনে বৈঠকের সময় মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাকে নিশ্চিত করেছেন, তাঁর এসব অনুষ্ঠানের কারণে তার ভিসা প্রত্যাহার হয়নি। তবে ঠিক কেনো তা করা হয়েছে সেই বিষয়টি তারা এখনো জানেন না। এ নিয়ে তদন্তের পর তাকে জানানো হবে বলে জানান দূতাবাস কর্মকর্তারা।   ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির আজমল মাসরুরকে যেতে বাধার ঘটনায় চলছে সর্বত্র আলোচনা।

১৭ ডিসেম্বর তাকে কেন যেতে দেওয়া হয়নি তা পরিষ্কার করেননি আমেরিকান দূতাবাসের এই কর্মকর্তা। কিন্তু কী কারণে তার ভিসা বাতিল করা হলো- তার কোনো ব্যাখ্যাই দেয়নি আমেরিকান কর্তৃপক্ষ। এদিন বিকাল চারটায় হিথ্রো থেকে আমেরিকাগামী ফ্লাইটে এই ঘটনা ঘটে।

আজমল মাসরুর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ মূলধারার টিভি চ্যানেলগুলোতে মতামত দেয়ার জন্য তিনি বেশ পরিচিত। গতানুগতিক ড্রেসের বিপরীতে শার্ট, ট্রাউজার আর স্যুট পরতে অভ্যস্ত এই ইমাম ইসলামের শান্তির বাণী প্রচারে সকলের দৃষ্টি কাড়েন। আজমল মাসরুর লণ্ডনের একাধিক মসজিদে জুমার নামাজে ইমামতি করে থাকেন।

ব্রিটেনের পরিচিত মুখ ইমাম মাসরুরের প্রতি আমেরিকার এমন আচরণের ঘটনায় ব্রিটেনের মূলধারার গণমাধ্যমগুলো ফলাও করে সংবাদ প্রকাশ করে। এসব সংবাদে বেরিয়ে আসে শুধু আজমল মাসরুর নয় আরও বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ মুসলিমের ক্ষেত্রে একই ধরণের ঘটনা ঘটেছে। কোনো কারণ ব্যাখ্যা করা ছাড়াই তাদের বিমান থেকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে কিংবা ভিসা বাতিল করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, গণতন্ত্র আর উদারনীতির ধারক দাবিদার আমেরিকার মুসলিমদের প্রতি এ কেমন আচরণ?  

বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আজমল মাসরুর বলেন, গত ১৭ ডিসেম্বর আমেরিকার উদ্দেশে তার যাত্রা করার কথা ছিল। এর আগে বেশ কয়েকবার তিনি আমেরিকায় গিয়েছেন। আমেরিকায় যাওয়ার জন্য তাঁর প্রয়োজনী ভিসা পাসপোর্ট সবই রয়েছে। লন্ডন্থ আমেরিকান দূতাবাস সবকিছু যাচাই বাছাই করেই তাকে ভিসা দিয়েছে।

নির্দিষ্ট দিনে হিথ্রো বিমানবন্দরে চেক ইন থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বলয় পার হয়ে তিনি বিমানে ওঠার আগে এক ব্যক্তি এসে নিজেকে আমেরিকান দূতাবাসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে আজমল মাসরুরের পাসপোর্ট দেখতে চান। এরপর একপাশে নিয়ে তাকে ওই কর্মকর্তা জানান যে, তার ভিসা বাতিল (রিভোক) করা হয়েছে, তিনি ভ্রমণ করতে পারবেন না। 

ভিসা বাতিল করার কারণ জানতে চাইলে দূতাবাসের কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনি নিশ্চই কোনো অন্যায় করেছেন’। কী অন্যায় করেছেন জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা ইতস্তত হয়ে বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না, তিনি কেবল বার্তাবাহক।

আজমল মাসরুর জানেন না কী কারণে তার সাথে এমন আচরণ করা হলো। বিবিসির অনুসন্ধানের জবাবে ঘটনার সুনিদিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ না করে লন্ডনস্থ আমেরিকান দূতাবাস থেকে বলা হয়েছে, তারা তাদের ভিসা নীতি মেনেই আজমল মাসরুরের ভিসা বাতিল করেছেন। 

আজমল মাসরুর বলেন, কোনো কারণ ব্যাখ্যা ছাড়াই ভিসা বাতিলের ঘটনাটি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ডোনা? ট্রাম্প মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন তার প্রতি সহায়ক। এই ইমাম মনে করেন, একজন মুসলিম হওয়ার কারণে তার প্রতি এমন আচরণ করা হয়ে থাকতে পারে। ইসলামি উগ্রবাদ ও জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস-এর সমালোচনা করার কারণে তিনি ইতিমধ্যে উগ্রবাদীদের কাছ থেকে আজমল মাসরুর মৃত্যুর হুমকিও পেয়েছেন।

আজমল মাসরুরের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হোম অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক কমিটির চেয়ার কীথ ভাজ এমপি বলেন, এই ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। তার নিজের নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দার কাছ থেকেও একই রকম অভিযোগ পেয়েছেন জানিয়ে কীথ ভাজ বলেন, মনে হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়া ব্রিটিশ মুসলিমদের ভিসা বাতিল করার বিষয়টিকে আমেরিকা নিয়ম করে ফেলেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের আমেরিকান দূতাবাসের ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এমএ