পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোড থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের জন্যে সকল কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে কারাগার স্থানান্তরের শেষ পর্যায়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারকে কেন্দ্র করে চলছে রমরমা বাণিজ্য।

অভিযোগ রয়েছে কারাগারকে ঘিরে ভিতরে ও বাইরে চলে বড় অংকের টাকার ব্যবসা। তবে এই সকল অভিযোগ উড়িয়ে না দিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযোগে কারো সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে প্রসাশনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কারাগারের ভিতরে আমদানি থেকে শুরু করে সাক্ষাত, থাকা, খাওয়া, গোসল এমনকি টয়লেট নিয়েও চলে ব্যবসা।

দীর্ঘদিন কারাযাপনের পর বেরিয়ে এমনই তথ্য দিলেন মো. মমিনুর রহমান (২৫)। দীর্ঘ ৫ মাস জেলে থাকার পর গত ২৭ এপ্রিল মুক্তি পেয়েছেন তিনি।

মমিন বলেন, কোর্ট থেকে আসামীর কারাগারে যেতে যেতে রাত হয়ে যায়। ঢাকা কারাগারে প্রথমে বন্দিদের রাখা হয় আমদানি ওয়ার্ডে। যেখানে গোসল এবং টয়লেটের স্থান খুবই নোংরা। এর পাশেই রাতে ঘুমাতে হয় বন্দিদের। রাতের খাবার হিসেবে দেয়া হয় খিচুড়ি। এই খিচুড়ি জীবনে কেউ কোনদিন চোখে দেখে নি। দুর্ঘন্ধ আর হলুদে ভরা খিচুড়ি ক্ষুধার কারণে অনেকে খেলেও বেশির ভাগ না খেয়ে থাকে।

মমিন আরো বলেন, খাওয়া-দাওয়া পর্ব শুরুর আগে আমদানির ইনচার্জ (সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত বন্দি ব্যক্তি বা কয়েদি ) সবার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন, কারাগার কোন ভাল জায়গা না, খারাপ জায়গা, এখানে যেভাবেই হোক কোন কারণে আসছেন। আমরা চাই আপনারা দ্রুত বের হয়ে যান। তাই আপনাদের যাতে কষ্ট না হয় তাই কিছু ভাল ব্যবস্থা রয়েছে। ভাল থাকবেন, ভাল খাইবেন, ভাল ঘুমাইবেন, গোসলের পানি পাইবেন। এর জন্য প্রতি সাপ্তাহে আপনাদের দিতে হবে তিন হাজার ছয়শো টাকা। যারা যারা প্যাকেজে নাম লেখাবেন তারা যোগাযোগ করবেন।

আর যারা ৯০ সেলে থাকতে চান তাদের লাগবে ৬ হাজার টাকা, ১০ সেলে ৭ হাজার টাকা, যমুনা-৪ ওয়ার্ডে ৪ হাজার টাকা, কারা হাসপাতালে ২০ হাজার টাকা। এসব ওয়ার্ডে থাকলে টাকা দিয়ে উঠবেন। এছাড়া জামিনের আগে আর টাকা দিতে হবে না আর খাবার খরচ সম্পূর্ণ নিজের।

বন্দিরা খাবারের অবস্থা দেখেই বুঝে কারাগারে প্যাকেজে নাম না লেখালে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। খাবারের পর যারা পাকেজে নাম লেখায় তাদের জন্য ঘুমানোর জন্য সুন্দর ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। আর যারা নাম লেখায় না তাদের জন্য ইলিশ ফাইলে ঘুমের ব্যবস্থা। ওয়ার্ডের ৫ ভাগের ৪ভাগ হল প্যাকেজের বন্দিদের জন্য আর মাত্র সামান্য একটু জায়গায় ইলিশ ফাইল করে এক কাঁধের উপর ভর করে ঘুমানোর ব্যবস্থা। পিট লাগানোর কোন সুযোগ পাওয়া যায় না ইলিশ ফাইলে। একের পর এক ইট রাখার মত বন্দিদের ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হয়। এমন অবস্থা যে কারো হার্ট দুর্বল থাকলে অসুস্থ হয়ে যাবে। আর রাতে একবার প্রসাবের জন্য উঠলে আর ঘুমানোর স্থান পাওয়া যায় না। সারা রাত জেগেই কাটাতে হয়।

বাবুল নামের আরেক আসামী রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার হয়ে তিন মাস কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে জানান, কারাগারের ব্যবসার মূল কার্যত্রম শুরু হয় পরদিন সকাল থেকে। যারা যারা প্যাকেজে নাম লিখায় সকাল বেলায় তাদের বিক্রি করা হয় নগদ ২ হাজার ৫০০ টাকায়। হাজারে ২০০ টাকা দিয়ে নগদ টাকা আনা যায় কারাগারের ভিতরে। যারা বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্যাকেজ চালায় তােেদর বলায় হয় অমুক ভাইয়ের সংসার। তারা সংসারে বন্দিদের কিনে নিয়ে যায়। এরপর বন্দির সাক্ষাত আসলে বন্দির আত্মীয়ের মাধ্যমে টাকা আনানো হয়, প্রয়োজনে কারারক্ষীদের মাধ্যমে বাসায় ফোন করিয়ে টাকার জন্য বলা হয়। যদি টাকা না পাওয়া যায় তাহলে বন্দিকে পুনরায় ফাইলে নামিয়ে দেয়া হয়। আর সাক্ষাত করতে আসলে বেসরকারি ভাবে বন্দি খুঁজতে লাগে তিনশ টাকা। কারণ প্রথম দিন পরিবারের কেউ জানে না তার আত্মীয় কারাগারের কোন ওয়ার্ডে আছে। এছাড়া ওকালত নামা স্বাক্ষরে লাগে ৩০০ টাকা, ভোকালত নামা সাক্ষরে লাগে ৫০০ টাকা। যারা এই কাগজ নিয়ে আসে তারা এই টাকা পায়। এই কাজ মূলত কয়েদিরা করে। দণ্ডপ্রাপ্ত না হলে আসামীদের হাজতি বলে।

কারাগারের প্রত্যেকটি ওয়ার্ড অনেক বড় বড় রুম। লম্বায় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ফিট এবং প্রস্থে ৩৫ থেকে ৪০ ফিট। লম্বালম্বি মোট তিন সারিতে ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হয়। দুই পাশে ঘুমায় প্যাকেজের বন্দিরা আর মাধ্যখানে ফাইলে ঘুমায় সাধারণ বন্দিরা। এই ফাইলের নাম কেচকি ফাইল। দুই হাতের আঙুল একটির মধ্যখানে আরেকটি রেখে যেভাবে আঙুল ফোটানো হয়, ঠিক সে ভাবে এক বন্দির পা আরেক বন্দির পায়ের মধ্যখান দিয়ে কাঁধে রেখে ঘুমায়। কারাগারে কেউ চাইলেও জেগে থাকতে পারে না, সবাইকেই শুয়ে থাকতে হবে, ঘুম আসুক আর না আসুক।

প্যাকেজের বন্দিদের চাইতে ফাইলের সাধারণ বন্দি অনেক বেশি। তাই জায়গা খুবই সল্প বন্দির তুলনায়। বন্দিরা ঘুমানোর আগে লুঙ্গি কোচ দিয়ে তৈরি হয়ে থাকে। এরপর ওয়ার্ডের দায়িত্বে যারা থাকে ইনচার্জ, রাইটার, জলপরী (পানি নেয়া আনার কাজ করে), প্যাকেজের সেবক ( প্যাকেজের বন্দিদের সেবাকারী) তারা সবাই মিলে বন্দিদের থাকার ব্যবস্থা করে। প্রয়োজনে দুই পাশের বন্দির মাঝে পা দিয়ে চারি দিয়ে ফাঁকা করে আরেক জনকে ঢুকায়। না ঢুকলে পাছায় পা দিয়ে জোরে চাপ দিয়ে মাঝে শোয়নো হয়। এই অবস্থার মধ্যে প্রতিদিনই মারামারি হয় ওয়ার্ডগুলোতে।

কারাগারের যারা সংসার চালায় তাদের মধ্যে রয়েছে, রানা , হযরত আলী, জোগ্য, লেবু মেম্বারের সংসার। মুক্তি পাওয়া কয়েকজন আসামীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা কারাগারের আমদানি ওয়ার্ড ১৫ লক্ষ টাকায় ডাকে বিক্রি হয়েছে। আর কারা কেন্টিন (বাইরে থেকে খাবার পাঠানোর স্থান) বিক্রি হয়েছে ৪০ লক্ষ টাকায়।

কারাগারের ভিতরে টাকা পাঠানোর সরকারি ব্যবস্থাকে বলা হয় পিসি বা প্রিজনারস ক্যাশ বা পার্সনাল ক্যাশ। পিসিতে টাকা পাঠানো যায় কারা গেটের সামনে কারারক্ষীর মাধ্যমে সরকারি ভাবে পাঠানো যায়। কিন্তু এই টাকা নগত পায় না বন্দি, থাকে একটি কার্ডে ইস্যু করা। এই টাকা বন্দির বেশি একটা উপকারে আসে না কারণ কারাভ্যন্তরে ক্যান্টিন থাকলেও সামান্য কিছু জিনিস আর খাবার ছাড়া তেমন কিছু পাওয়া যায় না। আর কারাগারের ভিতরে খাবারের দাম বাইরের বড় বড় হোটেলের চাইতেও বেশি।

কারাগারে নগদ টাকা ঢোকানো হয় কাররক্ষীদের মাধ্যমে। ঢাকা কারাগারের সাক্ষাত কক্ষের ভিতরে সিভিল পোষাকের কারারক্ষী দাঁড়িয়ে থাকে। সাক্ষাতকারীরা বাইরে থেকে সেই কারারক্ষীর কাছে টাকা দিলে ভিতরে বন্দিকে সেই পরিমাণের টাকার স্লিপ দেয়া হয়। সেই স্লিপ সাক্ষাত কক্ষের সিঁড়ির কাছে টাকার ব্যাগ নিয়ে বসে থাকা কাররক্ষীর কাছে দিলে হাজারে দুইশো টাকা রেখে বাকি টাকা দেয়া হয়।

এই টাকা দিয়ে বন্দি তার ইচ্ছামত খাবার কিনে খেতে পারে এবং প্যাকেজে থাকার টাকা পরিশোধ করতে পারে। এদিকে কারা হাসপাতালের অবস্থা আরো খারাপ। যারা অসুস্থ বন্দি তারা থাকে ফ্লোরে আর টাকা দিয়ে হাসপাতালে আসা বন্দিরা থাকে সিটে। এছাড়া কারা-হাসপাতালের সার্টিফিকেট নিয়ে অনেক ধনী আসামী চলে আসে বাইরের বাইরের হাসপাতালে। এ বিষয়ে লেনদেনের পরিমাণ আরো ব্যাপক। আসামী বুঝে লাখের উপরে এই লেনদেন হয়। এই লেনদেন কারা হাসপাতালের ডাক্তার ও জেল প্রশাসনের মাধ্যমে করা হয়।

আর এ বিষয়ে কারারক্ষীর সাথে কথা বললে অকপটেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে সকল সত্য কথা। তিনি বলেন, সরকারি পদ্ধতি ছাড়াও পিসিতে টাকা পাঠালে নিজের মতো করে কিছু করতে পারবে না। কারণ টাকা তার কাছে থাকবে না, থাকবে জমা। যদি সরাসরি টাকা পাঠাতে চান তাহলে আপনাকে প্রতি হাজারে ২’শ টাকা করে খরচ হবে। টাকা পাঠানোর জন্যে আমরাই আপনাকে সহযোগিতা করবো। কারাগারের সামনে যাদের দ্বায়িত্ব থাকে তাদের যে কারও সাথে যোগাযোগ করলেই হবে। সঠিক নাম ঠিকানা দিয়ে দিবেন সময় মতো টাকা পেয়ে যাবে।

তবে ভেতরে ওয়ার্ডে সাধারণের থেকে একটু আলাদা থাকতে চাইলে প্রতি সাপ্তাহে ১ হাজার থেকে ১২শ টাকা, তার থেকে আরও একটু আরামে থাকতে চাইলে দিতে হবে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। এগুলোর থেকেও একটু বেশি আরামে খাটের ওপরে থাকতে চাইলে মেডিকেলে থাকতে হবে। যেখানে প্যাকেজ পদ্ধতি। প্রতি মাসে খরচে হবে ১৮ হাজার টাকা এবং খাবার বাবদ ৩ হাজার টাকা।

এ ব্যাপারে কারা মহাপরিদর্শক (ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন বলেন, আমাদের কাছে কারা বেকারির উচ্চ মূল্য এবং কারাভ্যান্তরের বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ এসেছে। তবে স্বাক্ষী-প্রমাণ না পাওয়ায় জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পারি না। তবুও দুর্নীতির অভিযোগে গত এক বছরে সারা দেশ থেকে মোট ৪০ কারারক্ষীকে বরখাস্ত করেছি। এদের মধ্যে বিভিন্ন অভিযোগে ঢাকা কারাগার থেকেও ১৩ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

ইআর/এমআইএস