'একটি সভ্যতার জন্য প্রথম আবশ্যক ন্যায়বিচার।' এটাকে আমরা তুলনা করতে পারি সভ্যতার খুঁটির সঙ্গে। প্রাগৈতিহাসিককালে মানুষের মধ্যে বিচার ব্যবস্থা ছিল না বলেই এটাকে আমরা বলি বুনো সমাজ। যে সমাজে ন্যায়বিচারের কাঠি যত সূক্ষ্ম, সে সমাজ ততো বেশি সভ্য।
আমাদের সমাজের সাথে উপরের উক্তির লেখক সিগমুয়েন্ড ফ্রয়েডের এর ধারণা এবার মিলিয়ে দেখাযাক।
স্বামীহারা কোহিনুর বেগম (৩০) ও তার মা ছাহেরা বেগম (৫৫) বসবাস করতেন ব্রহ্মপুত্র নদ বিচ্ছিন্ন কীর্তনতারি চরের সরকারি খাস জমিতে। তাদের নিজস্ব কোনো জমি নেই। ওই চরের এক দাপুটে ইউপি সদস্য তারা মিয়া দের ঘর ভেঙে দিয়ে ওই স্থানে তাঁর এক আত্মীয়কে ঘর তুলে দেন।
ঘর ভেঙে দেওয়ার সময় চরের অসংখ্য মানুষ প্রত্যক্ষ করলেও মেম্বারের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়নি কেউ। মা-মেয়ে চরের মাতব্বর ও চেয়ারম্যানের কাছে বিচার চাইলে কেউ বিচার করেননি। উপায়ান্তর না দেখে তাঁরা একই চরের গুচ্ছগ্রামে ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছেন। কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলায় এ ঘটনা।
কোহিনুর বেগমের পিতার নাম আহের আলী। কোহিনুরের বিয়ে হওয়ার পরই তাঁর পিতা মারা যান। ১০ হাজার টাকা যৌতুকের জন্য কোহিনুরকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় স্বামী। এরপর আরেকটি বিয়ে করেন স্বামী মহল আলী। এ অবস্থায় কোহিনুর তার সন্তানকে নিয়ে মা ছাহেরা বেগমের ঘরে আশ্রয় নেন।
এরপরের অত্যাচার আরো করুণ। এখন অত্যাচার আর জুলুম শুরু করেন চরের মেম্বার। কোহিনুর বেগম বলেন, "ঘর ভাইঙ্গা দেওয়ার পর চরের মাতাব্বগর নিকট বিচার চাইলাম। তারা মেম্বরের বিরুদ্ধে কথা কবার চায় না। গেলাম চেয়ারম্যানের কাছে। উনি আইজ না কাইল এবা কইরা খালি ঘুরায়। পরে গুচ্ছগ্রামে ভাঙ্গা ঘর নিয়া তুইলা আছি। গরিব মাইনসের দুনিয়াত কেউ নাই। কত মাইনসের কাছে বিচার চাইছি কেউ বিচার করে নাই।"
কোহিনুর বেগমের মা ছাহেরা বেগম বলেন, "যহন তারা মেম্বর আমগর ঘর ভাইঙ্গা দেয়। তহন মালা মাইনসে চাইয়া চাইয়া দেখছে। কেউ কিছুই কয় না। বাইত্তে ম্যালা গাছ আছিল। ওগুলান তারা দখল করে নিছে। পরে আমার ঘরে ওই মেম্বর তাগর আত্মীয়রে বাড়ি কইরা দিছে। এ দুনিয়াত বিচার নাই।"
শুধু কী কীর্তনতারিতে। এ ঘটনা এখন সব যায়গায়। সমাজের নিম্ন স্তরের সালিশ বিচার থেকে দেশের উচ্চ আদালতের বিষয়ে অভিযোগ এর অন্ত নেই। প্রতিটি আদালতের বিষয়ে রয়েছে অসচ্ছতা আর অবহেলার নাজির।
তার পরও একের পর এক রায় দিয়েই যাচ্ছে আদালত। নিজেদের কাজের কোন সংশোধন এর ধারে কছে নেই।
এমন একটি সময় পালন হচ্ছে আন্তর্জাতিক সামাজিক ন্যায়বিচার দিবস। দিবসটি এলেই আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সামাজিক ন্যায়বিচারের বিকল্প নেই। কোনো জাতি বা সমাজের উন্নতির জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো ন্যায়বিচার। আর শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ সমাজ পেতে প্রয়োজন সামাজিক ন্যায়বিচার। এ দিনটি গোটা পৃথিবীতে একযোগে পালিত হয়। যদিও বাংলাদেশে এ দিনটির বিশেষ আয়োজন চোখে পড়ে না।
তবে সমাজবদ্ধ মানুষকে নিরুপদ্রব ও স্বচ্ছন্দ রাখে সামাজিক ন্যায়বিচার। এর ঘাটতিতে দেখা দেয় সামাজিক অসমতা। ফলে গাঢ় হয় সংকট ও দুর্নীতি।
দিবসটির ইতিহাস 'কোপেনহেগেন ঘোষণা' ও জাতিসংঘ জড়িত। ১৯৯৫ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে সামাজিক উন্নয়নের ওপর এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে ১০০টি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যোগ দেন। সেখানে তারা দারিদ্র্য দূর এবং সবাইকে যথোপযুক্ত কাজের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দেন।
প্রসঙ্গত, সামাজিক উন্নয়ন ও সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য। ২০০৭-এ কোপেনহেগেন ঘোষণা ও জাতিসংঘের মূল লক্ষ্যের ভিত্তিতে বিশ্ব সামাজিক ন্যায়বিচার পালনের ঘোষণা দেয় জাতিসংঘ। এ জন্য বেছে নেয়া হয়েছে ২০ ফেব্রুয়ারিকে। আরো একটু বিরতি দিয়ে ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো পালন করা হয় দিবসটি।
বৈধ ও ন্যায়ের পথে জীবন চালানোর মানসিকতা গড়ে তোলা উচিত প্রত্যেকের। সামাজিক ন্যায়বিচার অর্জনে আমাদের সদিচ্ছার বিকল্প নেই। পরিবার থেকে, শিক্ষা থেকে আমরা যে ন্যায়বিচারের ধারণা পাই, তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা উচিত। প্রতিনিয়ত এর চর্চা করা উচিত। অর্থাৎ সর্বসাধারণের মঙ্গল হয়_ এমন কাজ করে যেতে হবে আমাদের। শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, একটি দেশের স্বাধীনতার অর্থ ও রূপ ফুটে ওঠে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এর সঙ্গে দরকার অর্থনৈতিক সাম্য। সব সরকারের উচিত জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ ব্যবস্থার কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে কাজ করা।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে দরকার আইনের প্রতি আস্থাশীল হওয়া। মানুষ আইনের প্রতি আস্থাশীল হলে তবেই ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করা যায়, কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, তিক্ততা আর না পাওয়ার ইতিহাসের জলে সেই আস্থা আজ ক্রমেই ডুবে যাচ্ছে। যেখানে ন্যায়বিচার মানুষকে দেবে স্বস্তি সেখানে আইনের আশ্রয় নিতে গিয়ে অনেক সময় জড়িয়ে যেতে হয় নানা বিড়ম্বনায়, এ চিত্র পৃথিবীর অনেকাংশেই দৃশ্যমান। আইনের প্রতি আস্থা হারানোর অন্যতম আরেকটি কারণ আইনের প্রতি নেতিবাচক সামাজিক প্রেষণা।
সামাজিক ন্যায় বিচার শব্দটির পরিসর অত্যন্ত ব্যাপক। আর এ ন্যায় বিচার ও সমতার বীজ বপন করে দিতে হয় একবারে শৈশব থেকে, এতে মানুষের মন ও বিশ্বাসের জগতের পরিধি ব্যাপক হয়। শৈশব থেকে শিশু যদি প্রতিনিয়ত সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি বৈষম্যের শিকার হয় তবে কখনো তার মনে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা থাকবে না। প্রত্যেকে নিজ অবস্থানে থেকে নিজ দায়িত্ব পালন করলে সামাজিক ন্যায়বিচার সক্রিয়ভাবেই প্রতিষ্ঠা পাবে, আর এ আত্মদায়িত্বের উপলব্ধি ব্যক্তি মনে প্রতিষ্ঠা না পেলে যতই সংবিধানে তা থাকুক না কেন ফলাফল শূন্য। সামাজিক ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠা পাবে যখন মানুষ তার দায়িত্বকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বুঝতে পারবে।
ফ্রান্সেস বেকন বলেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অত্যাচার আইনের ওপর অত্যাচার। আর এর উদাহরণ এ দেশে ভূরি ভূরি। এ দেশে প্রতিনিয়ত সেসব ছোট-বড় অপরাধ হচ্ছে যেমন_ স্বামী-স্ত্রীর অত্যাচার, দাম্পত্য কলহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, পারিবারিক বা সামাজিক নির্যাতন, ব্যভিচার বা নারী সম্পর্কীয় স্পর্শকাতর বিষয়েও ধরনা দিচ্ছে পাড়ার মাতুব্বর, বড় ভাই, এলাকার নামকরা-নামছাড়া ব্যক্তিদের কাছে। বিপত্তিটা ঘটে ওখানেই।
এসব কবিরাজি বিচারশালায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার আসে না, বরং প্রভাবশালী মহলের প্রভাবই বড় হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া এ দেশের সিংহভাগ মানুষই আইন-আদালত, বিচার ইত্যাদি সম্পর্কে অজ্ঞ ও ভীত। ফলে আইনের দীর্ঘ মই পাড়ি দেওয়ার পরিবর্তে তারা এসক সালিশি বৈঠকের আশ্রয় নেয়। যত দিন না পর্যন্ত মানুষকে সত্যিকার অর্থে আইনের আশ্রয় ও প্রক্রিয়া তাদের হাতের কাছে সহজলভ্য না হবে ততদিন সামাজিক ন্যায়বিচার আশা করা যায় না।
বাংলাদেশে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম বাধা আইনের অনাধুনিকতা ও আইনের আশ্রয় প্রার্থীর নিরাপত্তার অভাব। আইনের নানা জটিলতার ৭ সাগর পাড়ি দিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়নি বিচার ব্যবস্থাকে আধুনিক করা। বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের যুগ। ঘরে বসেই আমরা জানতে পারি, যোগাযোগ করতে পারি বিশ্বের সঙ্গে। সুতরাং এখন ভাবনার সময় এসেছে নতুন করে, আইন বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদির বিষয়ে ভাবনার। অপরাধ বিজ্ঞান বা ক্রিমোনলজির ক্ষেত্র এখন অনেক প্রসারিত। সুতরাং আইনের বা বিচারের নামে হয়রানি এ যুগে আর কারোর কাম্য নয়। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হলেই আমরা পাব বৈষম্যমুক্ত অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সুশৃঙ্খল সোনার বাংলাদেশ।
এএইচ





