আধুনিক নার্সিংয়ের প্রবর্তক মহীয়সী সেবিকা ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের সেবাকর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার জন্মদিন ১২ মে আন্তর্জাতিক নার্স দিবস পালন করা হয় আন্তর্জাতিক নার্স দিবস। মানবসেবার মহান ব্রত নিয়ে যারা দিন রাত মানুষের সেবা করে থাকেন তারাই সেবিকা। রোগীর জন্য একজন ডাক্তারের পরামর্শের চেয়ে কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয় সেবিকার সেবা।
একজন রোগী চিকিৎসা গ্রহনের উদ্দেশ্যে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাওয়ার পর থেকে রিলিজ পেয়ে বের হয়ে আসা পর্যন্ত সর্বক্ষণ যিনিতার দেখাসুনা করেন, তিনি একজন সেবিকা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ দিবসটি পালন করা হচ্ছে।
আধুনিক নার্সিংয়ের প্রবর্তক মহীয়সী সেবিকা ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের সেবাকর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার জন্মদিন ১২ মে আন্তর্জাতিক নার্স দিবস পালন করা হয়। তিনি ১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলকে আধুনিক নার্সিংয়ের প্রবর্তক বলা হয়।
দ্যা লেডি ইউথ দ্যা ল্যাম্প নামে খ্যাত আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত, লেখক এবং পরিসংখ্যানবিদ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। তিনি তার জীবনের সবটুকু সময় ব্যয় করেছেন মানুষের সেবায়। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে আহত সৈন্যদের পরিচর্যার মাধ্যমে নার্সিং শিল্পের অগ্রদূত হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘকাল ধরে ইউরোপের আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিলো ফ্রান্স, ব্রিটেন ও কিংডম অব সার্ডিনিয়ার সাথে রাশিয়ার।
১৮৫৩ সালে সেই দ্বন্দ্বই যুদ্ধে রূপ নেয় যা ইতিহাসে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ নামে পরিচিত। তিন বছরের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবতার সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে বহু সেনা টাইফয়েড ও কলেরায় আক্রান্ত হয়েছিল। নাইটিঙ্গেল সেই সেনাদের পরম যত্নে সেবা দিয়ে তাদের অনেককে সারিয়ে তুলেছিলেন। এ কারণে বহু মনীষী তাঁকে ঈশ্বরের দূত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ১৮৫৪ সালে তুরস্কের বিরুদ্ধে রাশিয়া যুদ্ধ ঘোষনা করলো।
আত্নীয় স্বজন পরিজনের সব বাঁধা উপেক্ষা করে ফ্লোরেন্স তুরস্কের হাসপাতালে সুপারিনটেড্ন্ট পদে যোগ দেন। ফ্লোরেন্স ছিলেন এই হাসপাতালের এক সেবার প্রতিমূর্তি।দিনরাত অকাতরে তিনি সেবা করে যেতেন। রুগীরা তার নাম দিয়েছিলো দীপ হাতে রমণী। তিনি নারীমুক্তির জন্যও পূর্ণ মাত্রায় সোচ্চার ছিলেন। ফ্লেরেন্স তার জীবদ্দশায় ১৮৫৩ সাল থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত লন্ডনের ‘কেয়ার অব সিক জেন্টলওমেন ইনিস্টিটিউটের’তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে কাজ করে গেছেন। যুদ্ধের পর তিনি বহু দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির ফ্লোরেন্সে এক ধনাঢ্য ব্রিটিশ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিঙ্গেল এবং মা ফ্রান্সিস নাইটিঙ্গেল। তার ছোটবেলা কেটেছে ইংল্যান্ডের ডার্বিশায়ার অঞ্চলের তাদের পুরনো বাড়িতে। সেই সময়ের ধনী পরিবারের নারীরা ভালো বিয়ে ও সন্তান লালন-পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতেন। কিন্তু নাইটিঙ্গেল ছিলেন ব্যতিক্রম।
মেয়েকে নানা দেশের ভাষা, ছবি আঁকা, সংগীত সর্ববিদ্যায় পারদর্শী করে তুলেছিলেন বাবা। কিন্তু মেয়ে চাইলো সেবিকা হতে। এ ব্যপারটা মোটেই পছন্দ হলোনা বাবার। তথাপি একটু বড় হবার পর ফ্লোরেন্স লন্ডনের হার্লে স্ট্রিটের একটি মেয়েদের জন্য নির্মিত হাসপাতালেই যোগ দিলেন। একজন মা কিংবা স্ত্রী হওয়ার মধ্যে নিজেকে সীমিত রাখতে চাননি তিনি। কবি রিচার্ড মঙ্কটন মিলনেস নাইটিঙ্গেলের পানিপ্রার্থী ছিলন। কিন্তু নাইটিঙ্গেল তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
কারণ তিনি মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার ব্রত নিয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই কেউ অসুস্থ হলে ফ্লোরেন্স সেখানে ছুটে যেতেন সেবা করার জন্য। তিনিবিশ্বাস করতেন স্রষ্টা তাকে সেবিকা হওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন। ১৭ বছর বয়সে তিনি ডার্বিশায়ার থেকে লন্ডনে আসেন। সে সময় লন্ডনের হাসপাতালগুলোর অবস্থা ছিল খুবই করুণ। এর অন্যতম কারণ এ পেশাকে সবাই খুব ছোট করে দেখতেন। সে সময়ে কেউ সেবিকার কাজে এগিয়ে আসতেন না। কিন্তু একজন অভিজাত পরিবারের সন্তান হয়েও মা এবং বোনের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও তিনি এ কাজ বেছে নেন।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রশিক্ষিত নার্সের সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আর তা দেশের চিকিৎসাসেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারা বলছেন, বিশ্বের সব দেশে চিকিৎসকদের চেয়ে নার্সের সংখ্যা বেশি হয়ে থাকে। বাংলাদেশে তার উল্টো অবস্থা বিরাজ করছে।
প্রয়োজনের তুলনায় দেশে প্রায় দু’লাখ নার্স কম রয়েছে। কোথাও কোথাও নার্স আছেন অনুমোদিত পদের প্রায় অর্ধেক। ফলে রোগীরা মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। এ সুযোগে চিকিৎসা সেক্টরে প্রবেশ করছে অনেক ভুয়া নার্স। এসব নার্সের কারণে চিকিৎসা সেক্টরে ভুল সেবায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগও উঠছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার মান গ্রহণযোগ্য করে তুলতে যা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি শিক্ষাবর্ষে ডাক্তারি আর নার্সিং শিক্ষায় ছাত্রছাত্রী ভর্তির হার প্রায় সমান সমান। ফলে গোড়াতেই ঘাটতি শুরু হয়। নার্সের সংখ্যা বাড়াতে হলে প্রতি বছর মেডিক্যাল কলেজগুলোয় যে সংখ্যক ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হয়, নার্সিংয়ে তার চেয়ে কমপক্ষে তিন গুণ বেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সেবিকা দিবস।
এমই





