জল্লাদ ইয়াহিয়া, টিক্কা ও তাদের দোসররা বাঙালি নিধনের নীলনকশা তৈরির জন্য আলোচনার নামে কালক্ষেপণ ও নানা নাটক শুরু করে। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলার মুক্তিকামী মানুষদের হত্যা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলে। কালক্ষেপণের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২১ মার্চ চতুর্থ দিনের মতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা ধরে বৈঠক করলেও তিনি বঙ্গবন্ধুর কোনো দাবিই মেনে নিতে সম্মত হননি। বৈঠকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এম কামারুজ্জামান ও ড. কামাল হোসেন অংশ নেন। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক সংকট সমাধানে শান্তিপূর্ণ পথে তারা এগোনোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, আমরা আমাদের স্বাধিকারের মূল দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ফর্মুলাই মেনে নেব না। আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে সরাসরি তার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে পৌঁছে এক বিবৃতিতে লাহোর প্রস্তাব দিবস উপলক্ষে ২৩ মার্চ দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সবাই সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত রয়েছে। চূড়ান্ত মুক্তি অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন-সংগ্রাম চলতেই থাকবে।’ বিকালে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে পাকিস্তান মুসলিম লীগ প্রধান মিয়া মোহাম্মদ দৌলতানা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতির বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
একাত্তরের ২১ মার্চ ঢাকায় অবস্থানকারী পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেনাসদরে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে বাংলাদেশকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করার পাশাপাশি লাখ লাখ মুক্তিকামী মানুষ হত্যার নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চূড়ান্ত করে। বাঙালি গণহত্যার এ নীলনকশাটি পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক প্রধান লে. জেনারেল টিক্কা খান ও সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল পীরজাদা প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে অবহিতও করেন। চূড়ান্ত করা হয়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ রাতে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করার পরপরই ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করা হবে। এ অপারেশনের মূল লক্ষ্যস্থল হিসেবে পিলখানা ইপিআর ব্যারাক, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাস ও আওয়ামী লীগ এবং স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিভিন্ন নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা স্থির করা হয়। এ খবর নানাভাবে বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌঁছলেও তিনি তা বিশ্বাস করতে চাচ্ছিলেন না। তার ধারণা ছিল, প্রেসিডেন্ট যেখানে তার সঙ্গে সমঝোতামূলক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন, সে মুহূর্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিশ্বাসঘাতকতা করে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর মানবতাবিরোধী আক্রমণ করতে পারে না। তারপরও বিষয়টির প্রতি নেতাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য তিনি নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধু এদিন রাতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হামলা করলে কে কী দায়িত্ব পালন করবেন, কে কে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেবেন, কে কীভাবে আত্মরক্ষা করবেন এবং কীভাবে গোপনে ভারতে গিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সাহায্য চাইবেন তারও একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেন।
২১ মার্চ আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ছাত্র ইউনিয়নের গণবাহিনী টানা ১০ দিন ট্রেনিং শেষে ডামি রাইফেল নিয়ে ঢাকার রাজপথে প্রকাশ্যে কুচকাওয়াজ করে। ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বে এ কুচকাওয়াজ ও শোভাযাত্রা নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করায় শহরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এ মিছিলে ছাত্রীরাও অংশ নেয়ায় আন্দোলনরত লাখ লাখ মানুষের মনে দারুণ রোমাঞ্চের সৃষ্টি হয়। মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের মনেও দারুণ সাহসের সঞ্চার হয়, প্রকাশ্যে ডামি রাইফেল নিয়ে এ শোভাযাত্রা দেখে। দলে দলে লোকজন বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে প্রতিদিনের মতো এই দিনেও সমবেত হয়।
বিকালে কয়েক হাজার ছাত্র-জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আলোচনার পাশাপাশি আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে এবং সবাইকেই প্রতি মুহূর্তে যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘দেহে একবিন্দু রক্ত থাকতে স্বাধিকার আন্দোলন থেকে পিছপা হবো না।’ এদিন চট্টগ্রামে এক সমাবেশে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বলেন, স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের ডাক দিয়ে শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। দেশে মুক্তিযুদ্ধও শুরু হয়ে গিয়েছে। লক্ষ কোটি বাঙালি এখন মুক্তির নেশায় জীবন মরণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বিশ্বের সব স্বাধীনতাপ্রিয় জাতির উচিত এখন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করা ও স্বীকৃতি দেয়া। তিনি শেখ মুজিবের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার জন্যও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান।
এআইজে





