মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী আতংকের কারণ হতে পারে সৌদি আরবসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্যে। সাম্প্রতিক এসব ঘটনাবলীকে স্বাভাবিকভাবে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। চারদিক থেকেই অরক্ষিত হয়ে পড়ছে দীর্ঘদিনের সুরক্ষিত সৌদি আরব।
সৌদি আরবের উত্তর সীমান্ত আগে থেকেই অনিরাপদ। সেখানে প্রায় এক বছর ধরে তৎপর ইসলামিক স্টেট (আইএস)। ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল এলাকা দখল করে ফেলেছে আইএস। তাদের দখল করা এলাকাটি সৌদি সীমান্ত থেকে খুব বেশি দূরে নয়। আইএস সৌদি আরবের জন্য হুমকিস্বরুপ।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের দক্ষিণে ইয়েমেন সীমান্ত এবার চরম উত্তেজনাময় হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনে শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী হুতি যেভাবে এগুচ্ছে তাতে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সৌদি আরবের জন্য। দেশটির রাজধানী সানা দখলে নেয়ার পর এবার প্রধান বন্দর নগরী এডেনও দখলে নেয়ার পথে শিয়া মিলিশিয়ারা। সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের সুন্নী প্রেসিডেন্ট আব্দুরাব্বু প্রথমে রাজধানী সানা থেকে পালিয়ে এডেনে আশ্রয় নেন। এরপর সেখান থেকেও প্রাণ বাঁচাতে চলে গেছেন সৌদি আরবে।
এমতাবস্থায় মরিয়া হয়ে ইয়েমেনের শিয়া মিলিশিয়াদের উপর বিমান হামলা শুরু করেছে সৌদি আরব। সিদ্ধান্ত হয়েছে আরব লীগের দেশগুলো মিলে গঠন করবে একটি যৌথ বাহিনী; যে বাহিনী ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চলমান অস্থিরতা দূর করতে কাজ করবে। কিন্তু সৌদি আরবের অব্যাহত বিমান হামলার মুখেও এডেন অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছে শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী। হুতিরা দাবি করেছে, তারা গত ছয় দিনে অন্তত ৫টি সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে, হুতিরাও শক্তিতে কম যাচ্ছে না।
এদিকে, ইয়েমেন সৌদি আরবের টানা ৬ দিনের বিমান হামলায় অর্ধশতাধিক নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। গত সোমবারও একটি শরণার্থী শিবিরে সৌদি বিমান হামলায় ৪০ জন নিহত হন। বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় সাধারণ নাগিরকদের মধ্যে সৌদি বিরোধী ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। মঙ্গলবার সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তে দুই পক্ষ ভারী গোলাবর্ষণ করেছে।
ইয়েমেনের শিয়া মিলিশিয়াদের অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে ইরান, এমন অভিযোগে ইরানের সঙ্গে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও নাজুক হয়ে পড়েছে। ইরান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইরানকে অভিযুক্ত করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বক্তব্যে ইরান ক্ষুব্ধ। এতে করে আগামী সপ্তাহে এরদোগানের সম্ভাব্য ইরান সফর বাতিল করতে পারে তেহরান। সৌদি আরব, তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নী শাসিত দেশগুলোর অভিযোগ, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। আর ইরানের এই আগ্রহকে যেকোন মূল্যে দমন করতে তৎপর সৌদি আরব। এমন অবস্থায় কূটনৈতিক সমাধানের কোন বিকল্প নেই। একদিকে, ইসলামিক স্টেট (আইএস), অন্যদিকে সিরিয়া নিয়ে সৌদি-তুরস্ক ও ইরান-হিজবুল্লাহর দ্বন্দ্ব এখন চরমে পৌঁছেছে। সিরিয়ায় জোর করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা বাশার সরকারকে সরিয়ে দিতে সোচ্চার তুরস্ক-সৌদি। এদিকে, ইরাকে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে দেখা দিল ইয়েমেন সংকট। এদিকে, গত কয়েক বছর ধরেই সৌদি আরবের আরেক ক্ষুদ্র প্রতিবেশী বাহরাইনেও চলছে অস্থিরতা। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী শিয়া হলেও ক্ষমতায় রয়েছে সুন্নীরা। শিয়ারা এবার সুন্নী শাসন মানতে নারাজ।
ইয়েমেনের উত্তরের সৌদি সীমান্ত সংলগ্ন অনেক এলাকাতে শিয়া হুতি মিলিশিয়াদের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। ফলে, সৌদি নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে রয়েছে। ইয়েমেনের হুতিদের সমর্থক আরেক শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী আনসারুল্লাহ ঘোষণা দিয়েছে, সৌদি আরবের বিমান হামলার পরিণতি হবে ভয়াবহ। তারা সৌদি রাজপ্রাসাদগুলোতে হামলার হুমকি দিয়েছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলছে এক ভয়াবহ অস্থির অবস্থা। এসব অস্থিরতার শেষ কোথায় তা বলা মুশকিল। এসব সমস্যার সমাধান শীঘ্রই করতে না পারলে মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুনে পুড়তে হবে সব পক্ষকেই।
এমএ





