চীন বৃহস্পতিবার ঘোষণা দিয়েছে, হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের জন্য এক 'অকল্পনীয়' পরিণতি অপেক্ষা করছে। চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের এই ঘোষণাটি যে দমনমূলক তা নিঃসন্দেহে বলে দেয়া যায়। হংকংয়ের গণতন্ত্রকামী বিক্ষোভকারীরা যখন সরকারি ভবন এবং চীনা কর্মকর্তাদের কার্যালয় অবরোধের ঘোষণা দিলেন তখনই চীন সরকারের পক্ষ থেকে এ হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হলো।

চীনের গোমর নিয়ে রহস্য চিরতর। চীনের ভিতরটা আসলে কেমন তা বিশ্ববাসীর কাছে বরাবরই একটা রহস্যই রয়ে গেছে। চীন এমন একটি রাষ্ট্র যে নিজেকে খুব সন্তর্পণে গুটিয়ে রেখেছে। এই গুটিয়ে রাখার মধ্যেই তারা তাদের অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটাচ্ছে। বিশ্ববাসীও দেখতে পাচ্ছে একটি উদীয়মান (রাইজিং চায়না) চীনকে। কিন্তু চীনের এই জেগে উঠার পিছনে রয়েছে অনেক অন্ধকার কাহিনী। সেই কাহিনীগুলো কেউ জানতে পারে না। কারণ ক্যামেরার লেন্সকে সেখানে ঢুকতে দেয়া হয় না।

তবে, মাঝে-মধ্যেই চীনের বিভিন্ন প্রান্তে আর্তচিৎকার শোনা যায়। সেই চিৎকার শুনে বিশ্ববাসী কিছু আঁচ করতে পারে বৈকি। জিনজিয়াং, তিব্বত, তাইওয়ানের কথা বিশ্ববাসী কমবেশি জানেন। কিন্তু হংকংয়ের মতো একটা অতি উন্নত, অতি বড়লোক মানুষগুলোও এমন একটা বিদ্রোহের ডাক দিতে পারেন তা হয়তো খোদ চীনা শাসকরাও ভাবতে পারছেন না। প্রতিবেদনটি লেখার সময় হংকংয়ের বিক্ষোভ এক সপ্তাহে পা দিতে যাচ্ছে। হংকং পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছে৷ দেশটির গণতন্ত্রপন্থী হাজারো বিক্ষোভকারী পুলিশের লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস উপেক্ষা করে রাজপথ অচল করে দিয়েছেন৷ বিষয়টি আসলেই অভাবনীয়।

হংকংয়ের এই বিক্ষোভে গোটা চীনই যেন কেমন একটু নড়েচড়ে বসেছে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে চীনের আরেক মাথাব্যথা তাইওয়ান। তাইওয়ানকে নিজেদেরই করে নিয়েছে চীন! কিন্তু তবুও তাইওয়ানবাসীরা নিজেদের চীনা মনে করেন না। তারা বরাবরই স্বাধীনতাকামী। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে চীনের আরেক সীমিত স্বায়ত্ত্বশাসন ভোগ করা অঞ্চল ম্যাকাওতেও। ওদিকে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ তিব্বতকে গায়ের জোরে দখল করে রেখেছে চীন দশকের পর দশক ধরে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুবিশাল প্রদেশ জিনজিয়াংয়ের সঙ্গে চীনের সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত কোন মিলই নেই। জিনজিয়াং হচ্ছে মূলত তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলিমদের অঞ্চল। তারা কখনোই চীনের জবরদখলকে মেনে নেয়নি।

কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক এই চীন নিজেকে শামুকের ভিতর আবদ্ধ রেখেছে। সেই শামুকের খোল অনেক শক্ত। হংকংয়ের বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ হয়তো এই শামুকের খোলে কোন আঁচড় দিতে পারবে না। কিন্তু শামুকের ভিতরের অস্থিমজ্জাকে একটু হলেও নাড়িয়ে দিতে পারে। চীনের শত্রুরাও চারদিকে বসে নেই। তারা তৎপর। কিন্তু সেই সুযোগটি তারা পাচ্ছে না। চীনের নাকের ডগায় বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি জাপান। আরেক নিকটতম প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া। এশিয়ার আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী ভারত। সমুদ্রসীমা এবং আরও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ রয়েছে ফিলিপাইন, ভিয়েতনামের সঙ্গে। আর আমেরিকা যে চীনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু তা সবারই জানা। সব দিক দেখলে চীন তার প্রতিবেশীদের মধ্যে উত্তর কোরিয়া ও পাকিস্তান ছাড়া আর কোন বন্ধু খুঁজে পাবে না।

হংকংয়ের এই বিক্ষোভ মনে করিয়ে দেয় ১৯৮৯ সালের সেই ছাত্র বিক্ষোভের কথা। গণতন্ত্রের দাবিতে চীনের ছাত্র জনতা জেগে উঠেছিল সে সময়। কিন্তু চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি সেই বিক্ষোভকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে দমন করেছিল। সেই বিক্ষোভে ঠিক কত মানুষ নিহত হয়েছিল তা আজো অজানা। হংকং বিপ্লবকেও এভাবে ট্যাংকের তলায় পিষ্ট করার আশংকা রয়েছে। বৃহস্পতিবার চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের সতর্কবার্তায় এমনটাই আভাস পাওয়া গেছে। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক খবরে জানা গেছে, চীন সরকার হংকংকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, বিক্ষোভ না থামালে এক অপ্রত্যাশিত পরিণতি অপেক্ষা করছে হংকংয়ের জন্য। সেই অপ্রত্যাশিত পরিণতিটি কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। চীন যে কিছুতেই হংকংয়ের গণতান্ত্রিক দাবি মেনে নিবে না তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। কেননা, কোন কারণে যদি হংকংয়ের দাবিকে মেনে নেওয়াও হয়, তাহলে তা চীনের কমিউনিস্ট শাসনের ভিতকে দুর্বল করে দিবে। এতে করে চীনের অন্যান্য অঞ্চলেও বিদ্রোহ দানা বাধতে শুরু করবে। তখন এসব সামাল দেয়াটা হয়ে দাঁড়াবে চীনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে, চীনের সামনে আসলেই নৃশংসতা ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ খোলা নেই বলেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে।

হংকংয়ে বিক্ষোভের শুরুটা হয়েছে অগণতান্ত্রিক একটি পদক্ষেপ থেকে। ২০১৭ সালে হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী নির্বাচন হবে। আর চীনের কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেছে, নির্বাচনে কেবল সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই অগণতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদ জানাতেই রাস্তায় নেমে এসেছেন হংকংয়ের মানুষ। পুলিশের কড়া নির্দেশ অমান্য করে আন্দোলনকারীরা রাজপথে অবস্থান নিয়েছেন৷ ফলে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড৷ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য শহরেও৷

এদিকে, চীন অন্যান্য দেশকে এই ‘অবৈধ' বিক্ষোভে মদদ না দেয়ার জন্য সতর্ক করে দিয়েছে৷ এরই মধ্যে ব্রিটিশ সরকার বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে৷ যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিক্ষোভকারীদের অধিকার রক্ষা করা হংকংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ৷ সবকিছু আইনের মধ্যে থেকে করার জন্য হংকংবাসীর প্রতি আহ্বান জানায় ব্রিটেন৷

অন্যরকম প্রতিবাদ

এমন দৃশ্য সচরাচর কোনো বিক্ষোভে দেখা যায় না৷ হংকং বিক্ষোভের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক শেয়ার হয়েছে৷ আর তাহলো পুলিশের সাথে সংঘর্ষের সময় কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার পর একজন পুলিশ কর্মকর্তা দুই বিক্ষোভকারীর চোখ পানি দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছে৷ এমনকি বিক্ষোভের কারণে যে আর্বজনা তৈরি হচ্ছে তাও এক জায়গায় স্তূপ করে রাস্তা পরিষ্কার রাখছেন বিক্ষোভকারীরা৷

এ ছাড়া বিভিন্ন কর্মীরা বিক্ষোভে অংশ নেয়া মানুষদের খাবার, পানি, ছাতা দিয়ে সহায়তা করছেন৷ যেসব রাস্তা বিক্ষোভকারীরা বন্ধ করে রেখেছেন, অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি যান চলাচলের ব্যবস্থাও আছে সেখানে৷ এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিক্ষোভের প্রচুর ছবি পোস্ট করা হচ্ছে, যেখানে লেখা আছে, ৫ লাখ মানুষ বিক্ষোভ করছে, অথচ কোনো দোকানপাট ভাংচুর হয়নি, কোনো গাড়িতে আগুন দেয়া হয়নি৷

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস, তারা যদি একতাবদ্ধ থাকে তাহলে এই অঞ্চলে পরিবর্তন আসতে বাধ্য৷ এর আগে হংকং এ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ খুব একটা দেখা যায়নি৷ কিন্তু গত কদিন ধরে তারা সংবাদ সম্মেলন, সভা সমিতি করে চলেছে৷ পুলিশ বা কর্তৃপক্ষের কোনো বাধাই তাদের কাছে কঠিন বলে মনে হচ্ছে না৷ শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে শনিবার সরকারি নৌদফতর প্রাঙ্গণে হামলা চালিয়েছে৷ আরও অনেক স্কুলে ধর্মঘট শুরু হয়েছে৷ শিক্ষার্থীরা এর মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, গত সপ্তাহের ক্লাস বর্জনের সিদ্ধান্ত এখন অনির্দিষ্ট সময় ধরে চলবে৷

হত্যার হুমকি

চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক চান কিন মান, যিনি বিক্ষোভকারীর প্রথম সারির একজন৷ চীনা ভাষায় লেখা বেশ কিছু হত্যার হুমকি দিয়ে লেখা চিঠি পেয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন৷ সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘‘আমি জানতাম এই আন্দোলনে যোগ দিলেই তারা আমার উপর হামলা চালাবে এবং আমাকে শত্রু হিসেবে ভাববে৷'' অকুপাই সেন্ট্রাল গ্রুপের সহ প্রতিষ্ঠাতা তিনি৷ এই গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠাতা বেনি তাই জানিয়েছেন তাঁকেও হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে৷

‘অকুপাই সেন্ট্রাল' মুভমেন্ট

হংকংয়ে পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ২০১৭ সালের নির্বাচনের দাবিতে চীন বিরোধীরা বেশ কিছুদিন ধরে বিক্ষোভ করছেন৷ শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে এই বিক্ষোভের নাম দেওয়া হয়েছে অক্যুপাই সেন্ট্রাল মুভমেন্ট৷

সংঘর্ষ অব্যাহত

২৫ বছর আগে তিয়ানআনমেন চত্বরে ছাত্র বিক্ষোভের পর বেইজিংয়ের জন্য এটা অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ৷ ‘এক দেশ দু ব্যবস্থা' কাঠামোর অধীন বেশকিছু স্বায়ত্তশাসন রয়েছে হংকংয়ের৷ ২০১৭ সালে পরবর্তী প্রধান নির্বাহী নির্বাচনে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার দেয়ার জন্য হংকংয়ের প্রতি প্রতিশ্রুতি রয়েছে দীর্ঘদিনের৷ কিন্তু বিক্ষোভকারীদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ রয়েছে যে, বেইজিং ভোটাধিকার সংক্রান্ত যে বিধি ঘোষণা করেছে তাতে প্রার্থীদের ওপর বেশ কড়া নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়েছে এবং তাতে করে কোন গণতন্ত্রপন্থী নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না৷ হংকংয়ের বাসিন্দারা এ সিদ্ধান্তকে ঐ অঞ্চলের ওপর কঠিন নিয়ন্ত্রণ আরোপের এক ব্যাপক চেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছে৷

শেয়ারবাজারে ধস

আন্দোলনের কারণে হংকং ডলারের মূল্য ছয় মাসের মধ্যে নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং তিন মাসের মধ্যে শেয়ারের সূচক নীচে নেমে গেছে৷ বেশ কিছু ব্যাংকের শাখা বন্ধ রয়েছে৷ বন্ধ রয়েছে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান৷

কর্মকর্তারা বলেছেন, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত পুলিশসহ ৪১ জন আহত হয়েছে এবং ৭৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে৷

আন্দোলনের ভবিষ্যত

হংকংয়ের এই আন্দোলন খুব বেশি ফলপ্রসূ হবে এমনটা ভাবা সহজ হবে না। হংকংয়ের আন্দোলনে সাবেক সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো গণচীনও তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়বে ব্যাপারটা এমন না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে, হংকংয়ের এই আন্দোলনে কিছুটা হলেও নড়ে উঠবে চীনের সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা কমিউনিস্ট সরকারের। চীনের ভিতরে যে অসন্তোষ তা সময়ে সময়ে যে মাথাছাড়া দিয়ে উঠতে পারে এটাও এর একটা প্রমাণ। চীন এসব অসন্তোষ মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদী কী ব্যবস্থা নিবে তা দেখার বিষয়। যদি, দেশটি বাস্তবসম্মত এবং জনগণের মনের ইচ্ছাকে পুরোপুরি দমন করার নীতিতে এগুতে থাকে, তাহলে যে তা খুব একটা টেকসই হবে না সেটাও সত্য। তবে, চীন সম্পর্কে চূড়ান্ত কোন মন্তব্য করে ফেলার সাহসটা কোন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকই রাখেন না এমনটা অন্তত দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের ওয়েবসাইটগুলোতে ঘুরে। কারণ, চীন আসলেই এক রহস্যময় দেশ এবং জাতি। এই রহস্যকে ভেদ করে ফেলার সময়টুকু মনে হয় এখনও আসেনি!

প্রতিবেদনটি বিবিসি, আল জাজিরা, ওয়াশিংটন পোস্ট, গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস, ইকোনমিস্ট, সিনহুয়া, রয়টার্স, ডয়চে ভেলে এবং উইকিপিডিয়া অবলম্বনে লিখিত।

এসএমএ