আরজু আছরের নামাজের পর আমার দোকানে আসে ছেলে সাবিতকে নিয়ে। কোলে ২ বছর বয়সী তানভীর। দুটো রুটি নিয়ে বলে, "আঙ্কেল মন ভালো না। আমান তো আমারে খুব অত্যাচার করছে। যে কোনো সময় আমাকে শেষ করে দেবে। দুটো ছেলে সন্তান নিয়ে আমি কি করবো! বাবা বেঁচে নেই। আমি কোথায় যাবো?"

আরজু এভাবেই আহাজারি করে কথাগুলো বলেছিলেন বাসার নিচে দোকানের মালিক সুলতান মুন্সিকে। কিন্তু সন্ধ্যার পরেই স্ত্রী আরজু ও ছেলে সাবিতকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে আমানুল্লাহ আমান।

গত বুধবার রাতে আরজুর লাশ ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ছেলে সাবিতের লাশ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে উদ্ধার করে মিরপুর মডেল থানা পুলিশ।

হত্যার ঘটনায় স্বামী ব্যাংক কর্মকর্তা আমানুল্লাহকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পরে আমানকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে আমানের প্রেমিকা সুবর্ণাকে আটক করে পুলিশ।

অপরদিকে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪ টার দিকে ৩০২/৩৪ ধারায় নিহত আরজুর চাচা ইউনুস হাওলাদার বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামী করা হয় আমানুল্লাহ আমানকে। একই ঘটনায় সুবর্ণার সাথে পরকীয়ার সম্পর্কে দায়ী করে তাকেও গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানানো হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় প্রতিবেশীদের সূত্রে জানা গেছে, এ জোড়া খুনের নেপথ্যে কাজ করেছে আমানের পরকীয়া সম্পর্ক।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আমানুল্লাহ স্ত্রী সন্তান নিয়ে দীর্ঘ ৫ বছর ধরে মিরপুরের মধ্য পাইকপাড়ার ৬৭/এ নম্বর বাড়ির ৫ম তলার সি নম্বর ফ্ল্যাটে বসবাস করছিলেন।

এ ব্যাপারে বৃহস্পতিবার কথা হয় ৬৭/এ ৫ তলার বি ব্লকের বসবাসকারী ও নিচের দোকানের মালিক সুলতান মুন্সির সাথে। তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, আরজু আমাদের বাসায় আসতো। আমার বউ ও ছেলের বউয়ের সাথে গল্প করতো। এই সূত্র ধরে জানতে পারি যে তাদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছিল।

সুলতান মুন্সি বলেন, "আরজু অনেক অত্যাচার সহ্য করে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল।" পরকীয়ার সম্পর্কের বিষয়টা জানাজানির পর থেকে পারিবারিক মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয় বলেও জানান তিনি।

এ ব্যাপারে কথা হয় নিহত আরজুর ভাই মো. অপুর সাথে। তিনি জানান, আমানের সাথে সুবর্ণার পরকীয়ার বিষয়টি জানাজানির পর একাধিকবার পারিবারিক সালিশ হয়। কিন্তু এ ঘটনার পর থেকে আমান আমার বোনের উপর নির্যাতন চালাতে থাকে। একই বাসায় থেকেও আলাদা ঘরে থাকতো।

সম্প্রতি সুবর্ণাকে বিয়ে করতে চাওয়ায় দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে উঠে। পরকীয়ায় বাধা দেয়ায় এর আগেও কয়েকবার আরজুকে হত্যা করার চেষ্টা চালায় আমান। এরই সূত্র ধরে বোন আরজুকে হত্যা করে বলে দাবি করেন তিনি।

মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. সালাহউদ্দিন খান বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে খুন করার বিষয়টি স্বীকার করেন নি আমান। তবে তার দেয়া অসংলগ্ন কথাবার্তায় ধারণা করা হচ্ছে আমানুল্লাহ তার স্ত্রী ও সন্তানকে শ্বাসরোধে খুন করেছেন। তবে সে পরকীয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

পরিবার ও পুলিশ জানিয়েছে আমানুল্লাহ পূবালী ব্যাংকের এলিফ্যান্ট রোড শাখার সিনিয়র অফিসার পদে কর্মরত। স্ত্রীর সূত্র ধরে সুবর্ণার সাথে আমানের পরিচয়। পরে তাদের মধ্যে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠে।

নিহত আরজুর বড় বোন নিগার সুলতানা আঁখি বলেন, ২০০৩ সালে ইডেনে মাস্টার্সে পড়ার সময় আরজু ও সুবর্ণা কলেজ হোস্টেলে একই রুমে থাকত। সুবর্ণা আরজুর দুই বছরের জুনিয়র ছিল।

২০০৪ সালে পারিবারিকভাবে আরজুর সঙ্গে আমান উল্লাহর বিয়ে হয়। সুবর্ণার সঙ্গে আমানের প্রেমের বিষয়টি বিয়ের পর জানতে পারে আরজু। একপর্যায়ে সুবর্ণার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক বন্ধ করে দেয় আমান। কিন্তু বছর দেড়েক আগে পুনরায় আমান উল্লাহর সঙ্গে সুবর্ণার সাথে যোগাযোগ হয়। সুবর্ণা গুলশানের একটি বায়িং হাউসে চাকরি করে। থাকত টোলারবাগের কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে।

গত শুক্রবার জুমার নামাজের কথা বলে আমান মিরপুরে সুবর্ণার বাসায় যায়। সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে থাকেন। সন্ধ্যার পর সেখান থেকে বাসায় ফেরেন। এ নিয়ে তুমুল ঝগড়া হয় তাদের মধ্যে।

বাড়ির কেয়ারটেকার আবুল কাশেম জানান, আমান উল্লাহ ৫ বছর ধরে ওই বাসায় স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকেন। বুধবার সন্ধ্যার পরপরই আমান ছেলে সাবিদকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেন তিনি।

সুলতান মুন্সি জানান, সন্ধ্যার অন্তত আধা ঘণ্টা পর আমান উল্লাহ চিৎকার করছে, কারা আমার স্ত্রী ও ছেলেকে মেরে ফেলেছে। তার চিৎকার শুনে তিনিসহ কয়েকজন ছুটে যান আমানের বাসায়। ঘরের মধ্যে গিয়ে দেখেন, বিছানায় সাবিদ ও মা আরজু পাশাপাশি অচেতন হয়ে পড়ে আছে। ছোট ছেলে দেড় বছরের তানভীর মায়ের মাথার কাছে বসে কান্নাকাটি করছে। এরপরেই সাবিদকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যান আমান উল্লাহ।

আরজুর চাচা ইউনুস জানান, সাবিদ স্থানীয় আইকন একাডেমির কেজির ছাত্র। আরজুর বাবার নাম আব্দুর রহমান। গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে। আমান উল্লাহর গ্রামের বাড়ি গাজীপুর জেলায়। শিশু সন্তান তানভীরকে রাতে ইউনুসের দক্ষিণ পাইকপাড়ার বাসায় রাখা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, বুধবার লাশ উদ্ধার করে রাত ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত শেষে জানা যাবে কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. সালাহউদ্দিন খান বলেন, আদালতে কাল আমানকে পাঠানো হবে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে। সুবর্ণাকে আটক রাখা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সাথে সুবর্ণার কোনো ইন্ধন ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

জেইউ, এমএ