আজ রবিবার আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস। যার ইংরেজি নাম (International Day of United Nations Peacekeepers)। এদিনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী সকল পুরুষ-নারীকে শান্তি রক্ষার লক্ষ্যে সর্বোৎকৃষ্ট পেশাদারী মনোভাব বজায়, কর্তব্যপরায়ণতা, নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের আত্মত্যাগের ঘটনাকে গভীর কৃতজ্ঞতা ও যথোচিত সম্মানপূর্বক স্মরণ করা হয়।
ইউক্রেনের শান্তিরক্ষী সংস্থা এবং ইউক্রেন সরকারের যৌথ প্রস্তাবনায় ১১ ডিসেম্বর, ২০০২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী এ দিবসের রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস প্রথম উদযাপন করা হয়। ১৯৪৮ সালে সংঘটিত আরব-ইসরাইলী যুদ্ধকালীন যুদ্ধবিরতী পর্যবেক্ষণে গঠিত জাতিসংঘ ট্রুস সুপারভিশন অর্গানাইজেশন (আন্টসো) দিনকে উপলক্ষ্য করে ২৯ মে তারিখটি স্থির করা হয়েছে। জাতিসংঘ ট্রুস সুপারভিশন অর্গানাইজেশন (আন্টসো)-ই হচ্ছে প্রথম জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী।
দিবসটিকে কেন্দ্র করে নিউইউর্ক সিটিতে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দফতরে ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক বিতরণ করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও জাতিসংঘের মহাসচিব সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীকে অভিনন্দন বার্তা প্রদান এবং তাঁদের কাজের গুরুত্ব ও উপযোগিতার কথা তুলে ধরে থাকেন।
এছাড়াও, বিশ্বের সর্বত্র আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালন করা হয়। প্রায়শঃই দেশগুলোয় তাদের নিজস্ব শান্তিরক্ষীদের বহিঃর্বিশ্বে শান্তিরক্ষায় ভূমিকাকে স্মরণ করে সম্মানিত করা হয়। ঐ দেশগুলোতে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী দিবস উদযাপন, সভা-সমাবেশ, প্রদর্শনী ইত্যাদি বিষয়াদি স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন দলের সাথে আয়োজন করে থাকেন।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত শান্তিরক্ষীদের স্মরণে বাংলাদেশেও এই দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়।
দিবসটি উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ পৃথক পৃথক বাণী প্রদান করেন।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তাঁর প্রদত্ত বাণীতে বলেন, বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আজ শান্তি ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত। তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের সকল সদস্যকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। এছাড়াও বিশ্বশান্তি রক্ষার মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে সকল শান্তিরক্ষী সদস্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন রাষ্ট্রপতি তাদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের দৃষ্টান্তমূলক সেবা, কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ, নিঃস্বার্থ মনোভাব ও সাহসিকতা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে শুধু পরিচয়ই করায়নি, বরং দেশের ভাবমূর্তিকেও অনেক উজ্জ্বল করেছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ বাংলাদেশ। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা অপারেশনের (UNPSO) অংশ হিসাবে একাধিক দেশে সক্রিয় অবদান রেখেছে। ১৯৮৮ সালে সর্বপ্রথম দুটি অপারেশনে অংশগ্রহণ করে, একটি হল ইরাক-এর ( United Nations Iran–Iraq Military Observer Group) UNIIMOG এবং অন্যটি হলো নামিবিয়ায় যাকে বলা হয় (United Nations Transition Assistance Group) UNTAG। এই সময় তৎকালীন সরকার প্রধান ছিলেন, লেফটেনেন্ট জেনারেল হুসেন মুহাম্মদ এরশাদ।
উপসাগরীয় যুদ্ধ্বের সময় UNIKOM (United Nations Iraq–Kuwait Observation Mission) যান্ত্রিক পদাতিকবর্গ বাহিনীর অংশ হিসাবে কুয়েত এবং সৌদি আরব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর (আনুমানিক ২১৯৩ জন) সদস্য পাঠানো হয়েছিলো।
তারপর থেকে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসাবে প্রায় পঁচিশটি দেশে ত্রিশটিরও বেশি মিশনে অংশগ্রহণ করেছে। যে সকল দেশের মিশনে বাংলাদেশ অংশগ্রহন করেছে এর মধ্যে রয়েছে, নামিবিয়া, কাম্বোডিয়া মধ্যে, সোমালিয়া, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, মোজাম্বিক, প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়া, লাইবেরিয়া, হাইতি, তাজিকিস্তান, পশ্চিম সাহারা, সিয়েরা লিয়ন, কসোভো, জর্জিয়া, পূর্ব তিমুর, কঙ্গো, আইভরি ডি ইভয়ার এবং ইথিওপিয়া।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত শান্তিরক্ষী বাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী বাহিনী ১৯৮৮ সাল থেকে জাতিসংঘের অধীনে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। ২০১২ সালের মে মাস পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ১০টি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর ৯,১৮৭ জন এবং পুলিশ বাহিনীর ২,০৯৩ জন সদস্য নিয়োজিত আছেন। কর্মরত অবস্থায় অথবা নিরীহ মানুষকে রক্ষার্থে এ পর্যন্ত ১০৫ জন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী আত্মোৎসর্গ করেছেন। এছাড়াও, পেশাদারী দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে আহত হয়েছেন ১১৬ জন শান্তিরক্ষী।
জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষা অভিযানে বাংলাদেশের মোট অটাশি জন শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্য জীবন হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চুরাশি জন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর, ১ জন বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং তিন জন ছিলেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সদস্য ছিলেন।
নামিবিয়ায় UNTAG বাংলাদেশ বাহিনীর নেতা লেফটেনেন্ট কর্নেল মোঃ ফয়জুল করিম উইন্ডহোক, নামিবিয়া ১৯৮৯ সালে মারা যান। তিনি ছিলেন শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণকারী প্রথম বাংলাদেশী অফিসার যিনি বিদেশে মিশন যারা মারা যান।
বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশ বাহিনীর অবদানকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের একাধিক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের কমান্ডার এবং সিনিয়র সামরিক লিয়াজোঁ অফিসার হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, শান্তিরক্ষা সম্প্রদায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সফলতা ক্রমান্বয়েয বেড়েই চলছে।
বর্তমানে ১২২টি দেশের শান্তি রক্ষায় ১৭টি মিশনে বাংলাদেশের ৯ হাজার ৫৯৩ জন শান্তিরক্ষী নিয়োজিত আছেন। তাদের সততা ও আত্মত্যাগের কারণে সালের বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি পুরস্কার অর্জন করেছেছিল।
এছাড়াও জানুয়ারী ২০০৪ সালে বিবিসি জাতিসংঘে বাংলাদেশের ফোর্সকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর মজ্জ্বা হিসাবে বর্ণনা করেছে।
এমআইএস





