উত্তর কোরিয়া আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধের কথা সবারই জানা। সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া ঘোষণা দিয়েছে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আমেরিকায় পৌঁছাতে সক্ষম। আমেরিকার মূল ভূখন্ডে আঘাত হানতে পারবে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো। উত্তর কোরিয়ার এই ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বিষয়টি পেন্টাগনও স্বীকার করেছে। বিষয়টি আমেরিকার জন্য উদ্বেগজনকই বটে।

কিন্তু আমেরিকা আর উত্তর কোরিয়ার মধ্যে এই বৈরী সম্পর্কের পেছনের কারণ কী? উত্তর কোরিয়া কেন আমেরিকাকে ধ্বংস করে দিতে চায়? আমেরিকাকে আক্রমণ করা বা তাদেরকে মোকাবেলার মতো শক্তি কী আসলেই রয়েছে উত্তর কোরিয়ার? উত্তর কোরিয়া কী সত্যিই আমেরিকাকে আক্রমণ করে বসবে? আক্রমণ করলে কার কী পরিণতি হতে পারে? নাকি উত্তর কোরিয়া শুধুই বাগাড়ম্বর করে যাচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

উত্তর কোরিয়া ও আমেরিকার সম্পর্কের ইতিহাস:

আজকের উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া এক সময় একই দেশ ছিল। কিন্তু ১৯৪৮ সালে ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা বরাবর কোরিয়াকে উত্তর ও দক্ষিণ এ দু'ভাগে বিভক্ত করে ফেলা হয়। এর ইতিহাসটি অনেক দীর্ঘ। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই কোরিয়ার সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কে তিক্ততার শুরু। সে সময় কোরিয়ার সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু কোরিয়া আমেরিকার জাহাজকে কোরিয়ায় বাণিজ্য করতে নিষেধ করে দেয়। এক পর্যায়ে মার্কিন একটি জাহাজে কোরিয়ার সেনারা গুলিবর্ষণ করলে বেশ কজন আমেরিকান নিহত হয়। এটা ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। এরপর অবশ্য বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে দুদেশের সম্পর্ক আবার জোরদার হয়।

এরপর জাপানের সাম্রাজ্যের অধীন চলে যায় কোরিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোরিয়াকে মূলত ভাগ করে নেয় তখনকার দুই সুপার পাওয়ার আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত ইউনিয়ন কোরিয়ার উত্তরাংশ এবং আমেরিকা দক্ষিণাংশে অবস্থান নেয়। এরপর দুই কোরিয়ায় একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে একই সরকারের অধীনে কোরিয়াকে একীভূত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন এই গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে মেনে নেয়নি। ফলে, ১৯৪৮ সালে ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা বরাবর কোরিয়াকে স্থায়ীভাবে ভাগ করে নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা। ফলে, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের ধাঁচে গড়ে উঠে সমাজতান্ত্রিক উত্তর কোরিয়া। আর আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোর ধাঁচে গড়ে উঠে পুজিবাদী ও গণতান্ত্রিক দক্ষিণ কোরিয়া।

১৯৫০ সালে দুই কোরিয়ার মধ্যে শুরু হয় যুদ্ধ। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ মদদে এই যুদ্ধ তিন বছর স্থায়ী হয়। অবশেষে তা থামে ১৯৫৩ সালে। যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশই নিহত হয়। এর মানে উত্তর কোরিয়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই এক বা একাধিক ব্যক্তি এই যুদ্ধে নিহত হয়েছে। আর এই রক্তক্ষয়ের জন্য প্রত্যক্ষভাবেই আমেরিকা দায়ী বলে মনে করেন উত্তর কোরীয়রা। তখন থেকেই উত্তর কোরিয়ার প্রত্যেকটি ঘর আমেরিকার ঘোর বিরোধী হয়ে উঠে। আর এটিই হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার আমেরিকা বিরোধী মনোভাবের মূল প্রেরণা। তখন থেকেই আমেরিকার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার যুদ্ধংদেহী ভাব বিরাজ করছে।

উত্তর কোরিয়ার সামরিক প্রস্তুতি:

কোরীয় যুদ্ধের পর থেকেই নিজেকে সমরাস্ত্রে সজ্জিত করতে থাকে উত্তর কোরিয়া। এ লক্ষ্যেই ১৯৫৭ সালে পারমাণবিক কর্মসূচি হাতে নেয় উত্তর কোরিয়া। দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী পর ২০০৬ সালের ৯ অক্টোবর প্রথম সফল পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালায় দেশটি। এ পর্যন্ত ৩ থেকে ৫ বার পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালিয়েছে দেশটি।

তবে, সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়া ঘোষণা দিয়েছে, তাদের পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম। উত্তর কোরিয়ার এ ঘোষণার পরই আমেরিকাসহ গোটা বিশ্বের টনক নড়ে উঠে। এখন সারা বিশ্বের আলোচিত ইস্যুর মধ্যে এটি একটি। কিন্তু উত্তর কোরিয়া কী আসলেই পারবে আমেরিকায় আঘাত হানতে? আর যদি সেই সক্ষমতা অর্জন করেই থাকে তাহলে কী আমেরিকায় সত্যিই হামলা করে বসবে প্রচণ্ড একগুঁয়ে এ দেশটি।

উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা:

১,২০,৫৩৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের সীমানা। মোট সীমানার দৈর্ঘ্য ১৬৭১ কিলোমিটার। সমুদ্রসীমা রয়েছে ২৪৯৫ কিলোমিটার। উত্তর কোরিয়ার বার্ষিক গড় সামরিক বাজেট হচ্ছে ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রায় আড়াই কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত উত্তর কোরিয়ার প্রায় এক কোটি ৬৬ হাজার মানুষ যুদ্ধে যোগ দেওয়ার মতো উপযুক্ত। প্রতি বছর সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়ার মতো লোক লোক রয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১২ হাজার।

উত্তর কোরিয়ার বর্তমান সেনাবাহিনীর সক্রিয় সদস্য ৬ লাখ ৯০ হাজার। এ ছাড়া রিজার্ভ সেনা রয়েছে ৪৫ লক্ষ। দেশটির ট্যাংক রয়েছে ৬,৬০০টি। সাঁজোয়া যান (এএফভি) রয়েছে ২৫০০, স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্ত্রবাহী যান রয়েছে ১৬০০, রকেট উৎক্ষেপণ যন্ত্র রয়েছে ৭০০টি, কামানবাহী যান রয়েছে ৩৫০০টি।  

বিমান শক্তিতেও বেশ শক্তিশালী উত্তর কোরিয়া। দেশটির মোট যুদ্ধবহরে বিমান রয়েছে মোট ৯৪৩টি। এর মধ্যে সামরিক পরিবহন বিমান ৯৯টি, প্রশিক্ষণ বিমান ১৬৫টি, হেলিকপ্টার ২০৩টি, আক্রমণকারী হেলিকপ্টার ২০টি।

নৌশক্তির মধ্যে মোট যান রয়েছে ১,০৬১টি। এর মধ্যে নৌ বহর রয়েছে ৪টি, ছোট রণতরী রয়েছে ৬টি, সাবমেরিন ৭৮টি, উপকূলবর্তী প্রতিরক্ষা নৌযান ৫২৮টি, সমুদ্রে মাইন মোতায়েনকারী যুদ্ধজাহাজ ২৩টি।  

ক্ষেপণাস্ত্র ব্যব্স্থা বেশ শক্তিশালী উত্তর কোরিয়ার। ধারণা করা হয় দেশটির ১২ থেকে ২৭টি পারমাণবিক বোমা রয়েছে। আর আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ মাত্রা ৪,০০০ কিলোমিটার। ধারণা করা হয় উত্তর কোরিয়ার কাছে রাসায়নিক এবং জীবাণু অস্ত্রও রয়েছে।

আমেরিকায় হামলা করার সক্ষমতা রয়েছে কি না:

আমেরিকার সামরিক শক্তির কিছু পরিসংখ্যান দিলেই বুঝা যাবে আসলে কার কতটুকু সামরিক সামর্থ্য রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার যেখানে মাত্র ১৬৬৭টি যুদ্ধবিমান রয়েছে, সেখানে আমেরিকার রয়েছে ১৫,২৯৩টি। উত্তর কোরিয়ার সামরিক হেলিকপ্টার রয়েছে যেখানে ২৩৭টি, আমেরিকার রয়েছে ৬,৬৬৫টি।

সামরিক শক্তি বিবেচনায় উত্তর কোরিয়ার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। উত্তর কোরিয়া কেবল তার নিজের ভূমিতেই সীমাবদ্ধ। যা করার নিজেদের ভূখন্ড থেকেই করতে হবে। উত্তর কোরিয়া কেবল আমেরিকার মাটিতে পৌঁছাতে পারবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে। কিন্তু বিমান নিয়ে বা রণতরী নিয়ে আমেরিকার ভূখন্ডে আঘাত করার মতো সক্ষমতা উত্তর কোরিয়ার নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়ার নাকের ডগাতেই রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। দক্ষিণ কোরিয়য়া জাপান ও ফিলিপাইনে রয়েছে মার্কিন ঘাঁটি। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ গুয়াম, পাপুয়া নিউগিনি, মার্শাল আইল্যান্ডেও রয়েছে মার্কিন ঘাঁটি। এসব ঘাঁটি থেকে খুব সহজেই উত্তর কোরিয়াকে তছনছ করে দিতে পারবে আমেরিকা। তবে, উত্তর কোরিয়া এসব মার্কিন ঘাটিতে হামলা চালাতে পারে; সেই সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এ ছাড়া এই অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে পারে উত্তর কোরিয়া।

তাছাড়া উত্তর কোরিয়ার একমাত্র মিত্র রয়েছে চীন। তবে, চীনের যে নীতি তাতে তারা সামরিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তবে, আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, উত্তর কোরিয়া যা করছে তা কেবলমাত্র হাকডাক ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু, সমস্যাটা হচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার একমাত্র মিশন-ভিশন হচ্ছে আমেরিকাকে আঘাত করা। তাদের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তি এ উদ্দেশ্যেই কেবল সাজানো হয়েছে দশকের পর দশক ধরে। তাই, উত্তর কোরিয়া যদি আমেরিকার ঘাঁটিগুলোতে হঠাৎ করেই আক্রমণ করে বসে তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। উত্তর কোরিয়া হয়তো একটি যু্দ্ধ শুরু করতে পারবে, কিন্তু এর শেষটি করতে পারবে বলে মনে হয় না। খুব দ্রুতই যুদ্ধের মোড় ঘুরে যাবে আমেরিকার দিকে। উত্তর কোরিয়া আমেরিকার ক্ষতি করতে পারবে খুব সামান্যই। তবে, মাঝখানে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে। আর উত্তর কোরিয়া হয়তো একটি চিরপঙ্গু দেশে পরিণত হবে। আর এই যুদ্ধে যদি চীন ও রাশিয়া নাক গলাতে আসে, তাহলে তা যে খুবই ভয়াবহ হবে এবং আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনিও শুনতে পাবে বিশ্ববাসী।  

প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউট, গ্লোবালফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স, এফএএস,  গ্লোবাল রিসার্চ, উইকিপিডিয়া অবলম্বনে।

এসএমএ