বাবা, তিনি সন্তানের মাথার ওপর স্নেহচ্ছায়া বটবৃক্ষের মতো। সন্তানের ভালোর জন্য জীবনের প্রায় সবকিছুই নির্দ্বিধায় ত্যাগ করতে হয় তাকে। আদর-শাসন আর বিশ্বস্ততার জায়গা হলো বাবা। আর বাবার তুলনা বাবা নিজেই। বাবা শাশ্বত, চির আপন, চিরন্তন। সুযোগ এসেছে সেই বাবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা-ভালোবাসা প্রকাশের।

আজ বিশ্ব বাবা দিবস। বছরের এই একটি দিনকে প্রিয় সন্তানরা আলাদা করে বেছে নিয়েছেন। সারা বিশ্বের সন্তানরা পালন করবেন এই দিবস। জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্বের প্রায় ৭৪টি দেশে বাবা দিবস পালিত হয়। তৃতীয় রোববার হিসেবে এ বছর ২১ জুন পালিত হচ্ছে বাবা দিবস।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯০৮ সালে প্রথম বাবা দিবস উদযাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্টে ৫ জুলাই এই দিবস পালন করা হয়। মিসেস গ্রেস গোল্ডেন ক্লেটনের উদ্যোগেই মা দিবসের আদলে দিবসটি পালিত হয়। ১৯০৭ সালের একটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ২১০ জন বাবার স্মৃতির উদ্যোগে সেবারের দিবস। তবে তা নিয়মিত হয়নি।

তার দুই বছর পর ১৯১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনোরা স্মার্ট ডট নতুন পরিসরে বাবা দিবস পালন করে। সেনোরাকেই বাবা দিবসের উদ্যোক্তা মনে করা হয়। ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন জুন মাসের তৃতীয় রোববারকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাবা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করেন। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন প্রতি বছর জাতীয়ভাবে বাবা দিবস পালনের রীতি চালু করেন।

সাম্প্র্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তির কল্যাণে বাবা দিবস ঘটা করেই পালিত হচ্ছে। তারপরও এমন ভাবনা অনেকের মধ্যে থাকে যে, বাবার জন্য একদিন কেন! কেউ কেউ বলে থাকেন, বাবা দিবসটা ঠিক আমাদের জন্য নয়। এটি পাশ্চাত্যের। বাবার জন্য আমাদের অনুভূতি প্রতি দিনকার। প্রতি মুহূর্তের। তার জন্য আলাদা দিনের দরকার নেই। কারও কারও অভিযোগ এ ধরনের দিবসগুলো করপোরেট কিছু বিষয়কেই বিজ্ঞাপিত করে।

দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশেও নানা আয়োজন করা হয়েছে। বাবাকে শুভেচ্ছা জানাতে কার্ড, গিফট হিসেবে ফাদারস ডে মগ, টি-শার্ট ইত্যাদি তৈরি করেছে গিফট কর্নারগুলো। পাশাপাশি এ দিবসকে ঘিরে নাটক, টকশো ইত্যাদি টিভি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।  আসুন আমরা আজ এই দিনটিতে নিজেদের বাবাকে একবারের জন্য হলেও বলি ‘বাবা,  তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি’।

অন্যদিকে বাবা শব্দটার মধ্যেই যেন জড়িয়ে আছে হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার দিশা। আমাদের জীবনে বাবা বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে যান- যিনি কখনো কঠোর কখনো কোমল আর কখনো স্নেহ ভালোবাসায় সন্তানকে আগলে রাখেন। শুধু আদর ভালোবাসা বা শাসন নয় বরং বাবা তার দায়িত্ব এবং কর্তব্য নিয়ে তার সন্তানকে বড় করে তোলেন।

বাবার কথা ভাবলেই চোখে ভেসে উঠে অক্লান্ত পরিশ্রমী একজন মানুষ যিনি সারা জীবন সকল বিপদ আপদ থেকে আগলে রাখেন সন্তানকে। অনেক সমস্যায় পড়েও সন্তানকে হাসি মুখে দূরে সরিয়ে রাখেন সেই সমস্যাগুলোর জটিলতা থেকে। সমাজের যত নোংরামি থেকে যেমন রক্ষা করার আপ্রান প্রয়াস থাকে তাঁর তেমনি ভালো কাজে প্রথম উৎসাহও আসে বাবার কাছ থেকে। বাবা হলেন নারকেলের মতো, উপরে শক্ত অথচ ভেতরটা তাঁর সাদা কোমল নরম এবং মিষ্ট যা দায়িত্ব ও কর্তব্যের মূর্ত প্রতীক।

বাবা দিবস পালনে দেশ ভেদে দেখা যায় ভিন্নতা। বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে পালিত হয়ে থাকে বাবা দিবস। দিনটি পালনে সন্তানেরা বাবাকে তার পছন্দের উপহার দিতে খুব ভালোবাসে। আর বাবারাও সন্তানের কাছ থেকে উপহার পেয়ে খুব আনোন্দিত হন। অধিকাংশ দেশে ছেলেমেয়েরা তাদের বাবাদের কার্ড, ফুল কিংবা কেক উপহার দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। বাবা দিবসের উপহার হিসেবে আরও প্রচলিত আছে বাবা দিবসের মগ, টি-শার্ট, বই ইত্যাদি।

আমাদের দেশে একটি ব্যাপার লক্ষ্যনীয় যে বড় হবার সাথে সাথে মা-বাবার সাথে একটা দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা মা-বাবাকে প্রচন্ড ভালোবাসলেও তা খুব সহজে প্রকাশ করি না । মায়ের সাথে যদিওবা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকে কিন্তু বাবার সাথে বন্ধুত্ব খুব কম সন্তানেরই হয়ে উঠে। কেন এই দূরত্ব থাকবে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের মানুষটির সাথে?

আসুন সব জড়তা কাটিয়ে আজ বাবার আনন্দের জন্য কিছু করি। কিছু না হোক নিজে হাতে একটি কার্ড তৈরি করে বাবাকে দিয়ে বলি বাবা তোমাকে খুব ভালোবাসি। দেখুন বাবার মুখের প্রাঞ্জল হাসি, যে হাসি সত্যি অমূল্য এবং তুলনাহীন। বাবা দিবসে এটাই আশা করছি পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানের কাছে যে ‘বাবা’ শুধু একটা শব্দ নয় বরং হয়ে উঠুক সহজ- সাবলীল বন্ধুত্বপূর্ণ একটি নিরাপদ আশ্রয়।

এমএইচ/ এআর